পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২৬৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


tր বঙ্কিমচন্দের গ্রন্থাবলী - পিতা উত্তর করিলেন, “স্থির বৈ কি ? আমন বড়মানুষ লোকে কথা দিলে কি আর নড়চড় আছে ? অার আমার মেয়ের দোষের মধ্যে অন্ধ, নহিলে আমন মেয়ে লোকে তপস্যা করিয়া পায় না ।” ম। তা পরে এত করবে কেন ? পিতা । তুমি বুঝতে পার না ধে, ওরা অামাদের মত টাকার কাঙ্গালী নয়—হাজার দুই হাজার টাকা ওর টাকার মধ্যে ধরে না । যে দিন রজনীর সাক্ষাতে রামসদয় বাবুর স্ত্রী বিবাহের কথা প্রথম পাড়িলেন, সেই দিন হইতে রজনী তাহার কাছে প্রত্যহ যাতায়াত আরম্ভ করিল । তিনি ছেলেকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, টাকায় কি কাণার বিয়ে হয় ? ইহাতে অবশু মেয়ের মনে আশা-ভরসা হইতে পারে যে, বুঝি ইনি দয়াবতী হইয়া টাকা খরচ করিয়া আমার বিবাহ দিবেন। সে দিন হইতে রজনী নিত্য যায় আসে। সেই দিন হইতে নিত্য যাতায়াত দেখিয়া লবঙ্গ বুঝিলেন যে, মেয়েটি বিবাহের জন্য বড় কাতর হয়েছে—না হবে কেন, বয়স ত হয়েছে । তাতে আবার ছোট বাবু টাকা দিয়া হরনাথ বসুকে রাজি করিয়াছেন । গোপালও রাজি হুইয়াছেন । হরনাথ বসু রামসদয় বাবুর বাড়ীর সরকার, গোপাল তাহার পুত্র । গোপালের কথা কিছু কিছু জানিতাম ! গোপালের বয়স ত্রিশ বৎসর—একটি বিবাহ আছে, কিন্তু সন্তানাদি হয় নাই । গৃহধৰ্ম্মার্থে তাহার গৃহিণী আছে—সস্তানার্থ অন্ধ পত্নীতে র্তাহার আপত্তি নাই । বিশেষ লবঙ্গ তাহাকে টাকা দিবে। পিতামাতার কথায় বুঝিলাম, গোপালের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ স্থির হইয়াছে—টাকার লোভে সে কুড়ি সৎবরের মেয়েও বিবাহ করিতে প্রস্তুত । টাকায় জাতি কিনিবে । পিতা-মাতা মনে করিলেন, এ জন্মের মত অন্ধ কন্য। উদ্ধারপ্রাপ্ত হইল । তাহারা আহলাদ করিতে লাগিলেন । আমার মাথায় আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল । তার পরদিন স্থির করিলাম, আর আমি লবঙ্গের কাছে যাইব না—মনে মনে তাহাকে শতবার পোড়ারমুখী বলিয়া গালি দিলাম । লজ্জায় মরিয়া যাইতে ইচ্ছা হইতে লাগিল । রাগে লবঙ্গকে মারিতে ইচ্ছা করিতে লাগিল । দুঃখে কান্না আসিতে লাগিল । আমি লবঙ্গের কি করিয়াছি যে, সে আমার উপর এত অত্যাচার করিতে উদ্যত ? ভাবিলাম, যদি বড়মানুষ বলিয়া অত্যাচার করিয়াই সুখী হয়, তৰে জন্মান্ধ দুঃখিনী ভিন্ন আর কি অত্যাচার করিবার পাত্র পাইল না ? মনে করিলাম, ন, আর এক দিন বাইব, তাহাকে এমনই করিয়া তিরস্কার করিয়া আসিব —তার পর আর যাইব না—আর ফুল বেচিব না—আর তাহার টাকা লইব না—ম। যদি তাহাকে ফুল দিয়া মুল্য লইয়া আসেন, তবে তাহার টাকায় অন্ন ভোজন করিব না—না খাইয়। মরিতে হয়, সে-ও ভাল । ভাবিলাম, বলিব, বড়মানুষ হইলেই কি পরপীড়ন করিতে হয় ? বলিব, আমি অন্ধ, অন্ধ বলিয়৷ কি দয়া হয় না ? বলিব, পৃথিবীতে যাহার কোন মুখ নাই, তাহাকে নিরপরাধে কষ্ট দিয়া তোমার কি মুখ ? যত ভাবি, এই এই বলিব, তত আপনার চক্ষের জলে আপনি ভাসি। মনে এই ভয় হইতে লাগিল, পাছে বলিবার সময় কথাগুলি ভুলিয়া যাই । যথাসময়ে আবার রামসদয় বাবুর বাড়ী চলিলাম । ফুল লইব না মনে করিয়াছিলাম—কিন্তু শুধু হাতে যাইতে লজ্জা করিতে লাগিল—কি বলিয়া গিয়া বসিব ? পূৰ্ব্বমত কিছু ফুল লইলাম। কিন্তু আজি মাকে লুকাইয়া গেলাম । ফুল দিলাম—তিরস্কার করিব বলিয়া লবঙ্গের কাছে বসিলাম । কি বলিয়া প্রসঙ্গ উত্থাপন করিব ? হরি ! হরি ! কি বলিয়া আরম্ভ করিব ? গোড়ার কথা কোনটা ? যখন চারিদিকে আগুন জলিতেছে, আগে কোন দিক্ নিভাইব ? কিছুই বলা হইল না । কথা পাড়িতেই পারিলাম না । কান্না আসিতে লাগিল । ভাগ্যক্রমে লবঙ্গ আপনি প্রসঙ্গ তুলিল, “কাণি— তোর বিয়ে হবে ।" আমি জলিয়া উঠিলাম ; বলিলাম, “ছাই হবে ।” লবঙ্গ বলিল, “কেন, ছোট বাবু বিবাহ দেওয়াইবেন—হবে না কেন ?” আরও জলিলাম, বলিলাম, "কেন, আমি তোমা" দের কাছে কি দোষ করেছি ?” লবঙ্গও রাগিল । বলিল, “আঃ মলো ! কি বিয়ের মন নাই না কি ?” আমি মাথা নাড়িয়া বলিলাম, “না ।” লবঙ্গ আরও রাগিল, বলিল, “পাপিষ্ঠ। কোথাকার! বিয়ে কবি মা কেন ?” আমি বলিলাম, "খুসি " লবঙ্গের মনে বোধ হয় সন্দেহ হইল—আমি এষ্টা—নহিলে বিবাহে অসম্মত কেন ? সে বড় রাগ করিয়া বলিল, “অtঃ মলো ! বেরো বলিতেছি— নহিলে খেগুরা মারিয়া বিদায় কৱিৰ ।” তোর