পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২৭২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রজনী পৃথিবীতে দুল্লভ । আমি উভয়ই স্বীকার করিলাম-- তথাপি বলিলাম যে, "না, তোমাকে বিবাৰ করিব না ।” - তখন হীরালাল বড় ক্রুদ্ধ হইল। বলিল, "কাণাকে কে বিবাহ করিতে চাহে ?” এই বলিয়৷ নীরব হুইল । উভয়ে নীরব রহিলাম—এইরূপে রাত্রি কাটিতে লাগিল । তাহার পর শেষ-রাত্রে, হীরালাল অকস্মাৎ মাঝিদিগকে বলিল, “এইখানে ভিড়ে। " মাঝিরা নৌকা লাগাইল-নৌকাতলে ভূমি স্পর্শের শব্দ শুনিলাম । হীরালাল আমাকে বলিল, “নাম—আসিয়াছি ”—সে আমার হাত ধরিয়া নামাইল। আমি কুলে দাড়াইলাম । তাহার পরে শব্দ শুনিলাম, যেন হীরালাল আবার নৌকায় উঠিল । মাঝিদিগকে বলিল,"দে, নৌকা খুলিয়া দে, নৌকা খুলিয়া দে।” আমি বলিলাম, “সে কি ? আমাকে নামাইয়া দিয়া নৌকা খুলিয়া দাও কেন ?” হীরালাল বলিল, “আপনার পথ আপনি দেখ * মাঝির নৌকা খুলিতে লাগিল, দাড়ের শব্দ শুনিলাম । আমি তখন কাতর হইয়া বলিলাম, "তোমার পায়ে পড়ি, আমি অন্ধ—ষদি একান্তই আমাকে ফেলিয়া যাইবে, তবে কাহারও বাড়ী পর্য্যস্ত আমাকে রাখিয়া দিয়া যাও। আমি ত এখানে কখনও আসি নাই —এখানকার পথ চিনিব কি প্রকারে ?” হীরালাল বলিল, “আমাকে বিবাহ করিতে সম্মত আছে ?” - আমার কান্না আসিল । ক্ষণেক রোদন করিলাম, রাগে হীরালালকে বলিলাম, “তুমি যাও । তোমার কাছে কোন উপকার পাইতে নাই—রাত্রি প্রভাত হইলে তোমার অপেক্ষা দয়ালু শত শত লোকের সাক্ষাৎ পাইব । তাহারা অন্ধের প্রতি তোমার অপেক্ষা দয়া করিবে ” হীরা । দেখা পেলে ত? এ যে চড়া ; চারিদিকে জল । আমাকে বিবাহ করিবে ? হীরালালের নৌকা তখন কিছু বাহিরে গিয়াছিল, শ্রবণশক্তি আমার জীবনাবলম্বন—শ্রবণই আমার চক্ষের কাজ করে । কেহ কথা কহিলে—কত দূরে কোন দিকে কথা কহিতেছে, তাহ, অমুভব করিতে পারি। হীরালাল কোন দিকে কত দূর থাকিয়া কথা কহিল, তাহ মনে মনে অনুভব করিয়া জলে নামিয়া সেই দিকে ছুটিলাম—ইচ্ছা, নৌকা ধরিব। গলাজল অবধি নামিলাম। নৌকা পাইলাম না । নৌকা আরও বেশী জলে । নৌকা ধরিতে গেলে ডুবিয়া মরিব । `ව তালের লাঠি তখনও হাতে ছিল। আবার ঠিক করিয়া শব্দানুভব করিয়া বুঝিলাম, হীরালাল এই দিকে এত দূর হইতে কথা কহিতেছে। পিছু হটিয়া কোমরজলে উঠিয়া, শব্দের স্থানামুভব করিয়া, সবলে সেই তালের লাঠি নিক্ষেপ করিলাম । চীৎকার করিয়া হীরালাল নৌকার উপর পড়িয়৷ গেল ।–“খুন হইয়াছে—খুন হইয়াছে!” বলিয়া মাঝির নৌকা খুলিয়া দিল । বাস্তবিক সেই পাপিষ্ঠ খুন হয় নাই। তখনই তাহার মধুর কণ্ঠ শুনিতে পাইলাম—নৌকা বাহিয়া চলিল। সে উচ্চৈঃস্বরে আমাকে গালি দিতে দিতে চলিল—অতি কদৰ্য্য অশ্রাব্য ভাষায় পবিত্র গঙ্গা কলুষিত করিতে করিতে চলিল। আমি স্পষ্ট শুনিতে পাইলাম যে, সে শাসাইতে লাগিল যে, আবার খবরের কাগজ করিয়া আমার নামে আর্টিকেল লিখিলে । অষ্টম পরিচ্ছেদ সেই জনহীন রাত্রিতে, আমি অন্ধ যুবতী এক সেই দ্বীপে দাড়াইয়া গঙ্গার কলকল জলকল্লোল শুনিতে লাগিলাম । হায়, মানুষের জীবন ! কি অসার তুই ! কেন আসিস–কেন থাকিস—কেন ষাস? এ দুঃখময় জীবন কেন ? ভাবিলে জ্ঞান থাকে না। শচীশ্র বাবু এক দিন তাহার মাতাকে বুঝাইতেছিলেন, সকলই নিয়মাধীন । মামুষের এই জীবন কি কেবল সেই নিয়মের ফল ? যে নিয়মে ফুল ফুটে, মেঘ ছুটে, চাদ উঠে—যে নিয়মে জলবুদবুদ ভাসে, হাসে.মিলায় ; ষে নিয়মে ধুলা উড়ে, তৃণ পুড়ে, পাতা খসে, সেই নিয়মেই কি এই সুখদুঃখময় মনুষ্যজীবন আবদ্ধ, সম্পূর্ণ, বিলীন হয় ? ষে নিয়মের অধীন হইয়া ঐ নদীগর্ভস্থ কুম্ভীর শীকারের সন্ধান করিতেছে—ষে নিয়মের অধীন হইয়া এই চরে ক্ষুদ্র কীট সকল অঙ্গ কীটের সন্ধান করিয়া বেড়াইতেছে, সেই নিয়মের অধীন হইয়া আমি শচীন্দ্রের জন্ত প্রাণত্যাগ করিতে বসিয়াছি ? ধিক্ প্রাণত্যাগে ! ধিক প্রণয়ে । ধিক্ মনুষ্যজীবনে ? কেন এই গঙ্গাজলে ইহা পরিত্যাগ করি না ? জীবন আসার—মুখ নাই বলিয়া অসার, তাহ নহে । শিমুলগাছে শিমুল ফুলই ফুটিৰে ; তাছা বলিয় তাহাকে আসার বলিব না। দুঃখময় জীবনে দুঃখ আছে বলিয়া তাহাকে আসার বলিব না । কিন্তু