পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৪৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


82. র্তাহার দৃষ্টান্তের অনুবর্তী হইয়া শত সওয়ার তাহার সঙ্গে সঙ্গে সেই রন্ধ্রপথে প্রবেশ করিল। রাজসিংহ পৰ্ব্বতশিখর হইতে এ সকল দেখিতে লাগিলেন। যতক্ষণ মোগলেরা ক্ষুদ্র পথে একে একে প্রবেশ করিতেছিল, ততক্ষণ কাহাকেও কিছু বলিলেন না । পরে তাহার রন্ধ্রপথ মধ্যে নিবদ্ধ হইলে পঞ্চাশত অশ্বারোহী রাজপুত লইয়া বঞ্জের ন্যায় উদ্ধ হইতে তাহাদের উপর পড়িয় তাহাদিগকে নিহত করিপে লাগিলেন । সহসা উপর হইতে আক্রাস্ত হইয়া মোগলের বিশৃঙ্খল হইয়া গেল। তাহাদের মধ্যে অধিকাংশ এই ভয়ঙ্কর রণে প্রাণত্যাগ করিল ৷ উপর হইতে ছুটিয়া আসিয়া অশ্ব সহিত মোগল সওয়ারগণের উপর পড়িল ৷ নীচে যাহারা ছিল, তাহারা চাপেই মরিল। পাচ সাত দশ জনমাত্র এড়াইল । মবারক তাহাদের লইয়া ফিরিলেন। রাজপুতেরা তাহাদের পশ্চাদ্বন্তী হইল না । মবারকের সঙ্গে মোগল সওয়ারের বেশধারী মাণিকলালও বাহির হইয়া আসিল । আসিয়াই এক জন মৃত সওয়ারের অশ্বে আরোহণ করিয়াই সেই শৃঙ্খলাশূন্ত মোগলসেনার মধ্যে কোথায় লুকাইল, কেহ তাহ দেখিতে পাইলেন না । যে মুখে মোগলের সেই পাৰ্ব্বত্যপথে প্রবেশ করিয়াছিল, মাণিকলাল সেই পথে নির্গত হুইল । যাহারা তাহাকে দেখিল, তাহার। ভাবিল, সে পলাইতেছে। মাণিকলাল গলি হইতে বাহির হইয়। তীরবেগে ঘোড়া ছুটাইয়া রূপনগরের গড়ের দিকে চলিল । মবারক প্রস্তরখণ্ড পুনরুল্লঙ্ঘন করিয়া ফিরিয়া আসিয়া আজ্ঞা দিলেন, “এই পাহাড়ে চড়িতে কষ্ট নাই ; সকলেই ঘোড়া লইয়া এই পাহাড়ের উপরে উঠ। দস্থ্য অল্পসংখ্যক। তাহাদের সমুলে নিপাত করিব।” তখন পাঁচ শত মোগল সেনা দান্‌! দৗম্!” শব্ব করিয়া অশ্ব সহিত বামদিকের সেই পৰ্ব্বতশিখরে আরোহণ করিতে লাগিল ৷ মবারক অধিনায়ক। মোগলদিগের সঙ্গে দুইটা তোপ ছিল । একটা ঠেলিয়া তুলিয়া পাহাড়ে উঠাইতে লাগিল । আর একটা ছোট তোপ, সেটাকে মোগলের টানিয়া, শিকলে বাধিয়া হাতী লাগাইয়া, যে বৃহৎ শিলাখণ্ডের দ্বারা পাৰ্ব্বত্যরন্ধ্র বন্ধ হইয়াছিল, তাহার উপর উঠাইয়া স্থাপিত করিল। বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী চতুর্থ পরিচ্ছেদ জয়শীলা চঞ্চলকুমারী তখন "দীন দীমূ!” শব্দে পঞ্চশত অশ্বারোহী কালান্তক যমের ন্যায় পৰ্ব্বতে আরোহণ করিল। পৰ্ব্বত অনুচ্চ, ইছা পূৰ্ব্বেই কথিত হইয়াছে—শিখর দেশে উঠিতে তাহাদের বড় কালবিলম্ব হইল না। কিন্তু পৰ্ব্বতশিখরে উঠিয়া দেখিল ষে, কেহ ত পৰ্ব্বতেপরি নাই । ষে রন্ধ্রপথমধ্যে প্রবেশ করিয়া তিনি নিজে পরাভূত হইয়া ফিরিয়া আসিতেছিলেন, এখন মবারক বুঝিলেন যে, সমুদায় দক্ষ্য—মবারকের বিবেচনায় তাহার রাজপুত দস্থ্য ভিন্ন আর কিছুই নহুে-সমুদায় দস্থ্য সেই রন্ধ্রপথে আছে । তাহার দ্বিতীয় মুখ রোধ করিয়া তাহাদিগের বিনাশসাধন করিবেন, মবারক এইরূপ মনে মনে স্থির করিলেন । হাসান আলি অপর মুখে কামান পাতিয়া বসিয়া আছেন, এই ভাবিয়া তিনি সেই রন্ধের ধীরে ধারে সৈন্য লইয়া চলিলেন । ক্রমে পথ প্রশস্ত হইয়া আসিল ; তখন মবারক পাহাড়ের ধারে আসিয়া দেখিলেন—চল্লিশ জনের অনধিক রাজপুত শিবিকা সঙ্গে রুধিরাক্ত-কলেবরে সেই পথে চলিতেছে। মবারক বুঝিলেন যে, অবশ্য ইহারা নির্গমপথ জানে ; ইহাদের উপর দৃষ্টি রাখিয়া ধীরে ধীরে চলিলে রন্ধদ্বারে উপস্থিত হইব । তাহ হইলে যেরূপ পথে রাজপুতেরা পৰ্ব্বত হইতে নামিয়াছিল, সেইরূপ অন্ত পথ দেখিতে পাইব । রাজপুতেরা যে আগে উপরে ছিল, পরে নামিয়াছে, তাহার সহস্র চিহ্ন দেখা যাইতেছিল । মবারক রাজপুতদিগের উপর দৃষ্টি রাথিয় ধীরে ধীরে চলিতে লাগিলেন । কিছু পরে দেখিলেন, পাহাড় চালু হইয়া আসিতেছে, সম্মুখে নিগমের পথ । মবারক অশ্ব-সকল তীরবেগে চালাইয়া পৰ্ব্বততলে নামিয় রন্ধমুখ বন্ধ করিলেন । রাজপুতের রন্ধের বঁাক ফিরিয়া যাইতেছিল— সুতরাং তাহার আগে রন্ধ্র-মুখে পৌঁছিতে পারিল না । মোগলেরা পথরোধ করিয়া রন্ধমুখে কামান বসাইল এবং আগতপ্রায় রাজপুতগণকে উপহাস করিবার জন্য তাহার বঞ্জনদি একবার শুনাইল— “দন! দীম্‌!” শব্দের সঙ্গে পৰ্ব্বতে সেই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হইল। শুনিয়া উত্তরস্বরূপ রন্ধের অপর মুখে হাসান আলিও কামানের আওয়াজ করিলেন ; আবার পর্বতে পৰ্ব্বতে প্রতিধ্বনি বিকট ডাক ডাকিল। রাজপুতগণ শিহরিল—তাহাদের কামান ছিল না । -