পাতা:বঙ্গদর্শন নবপর্যায় তৃতীয় খণ্ড.djvu/১৬২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।

চতুর্থসংখ্যা। ] নৌকাডুবি । 3の守 একটা ক্ষমতা । আশাতীত উপহার আমি যে কেমন করিয়া গ্রহণ করিলাম, অস্তৰ্যামী ছাড়া তাহ আর কেহ জানিতে পারিবে না । দান চোখে দেখা যায়, কিন্তু আদান হৃদয়ের ভিতরে লুকানো ! ইতি। চিরঞ্চণী ।” এই লিখনটুকু হেমনলিনীর হাতে পড়িল । তাহার পরে এ সম্বন্ধে উভয়ের মধ্যে আর কোন কথাই হইল না । বর্ষাকাল ঘনাইয়া আসিল । বৰ্ষাঋতুটা মোটের উপরে সহরে মনুষ্যসমাজের পক্ষে তেমন সুখকর নহে—ওটা আরণ্যপ্রকৃতিরই বিশেষ উপযোগী । সহরের বাড়ীগুলা তাহার রুদ্ধ বাতায়ন ও ছাদ লইয়া, পথিক তাহার ছাতা লইয়া, ট্র্যামগাড়ি তাহার পর্দা লইয়া বর্ষাকে কেবলি নিষেধ করিবার ব্যর্থ চেষ্টায় ক্লেদাক্ত পঙ্কিল হইয়া উঠিতেছে । নদী, পৰ্ব্বত, অরণ্য, প্রাস্তর বর্ষাকে সাদর কলরবে বন্ধু বলিয়া আহবান করে । সেইখানেই বর্ষার যথার্থ সমারোহ— সেখানে শ্রাবণে ছ্যলোকভুলোকের আনন্দসন্মিলনের মাঝখানে কোন বিরোধ নাই । কিন্তু নুতন ভালবাসায় মানুষকে অরণ্যপৰ্ব্বতের সঙ্গেই একশ্রেণীভুক্ত করিয়া দেয় । অবিশ্রাম বর্ষায় অন্নদাবাবুর পাকযন্ত্র দ্বিগুণ বিকল হইয়া গেল, কিন্তু রমেশ-হেমনলিনীর চিত্তস্ফূৰ্ত্তির কোন ব্যতিক্রম দেখা গেল না । মেঘের ছায়া, বক্সের গর্জন, বর্ষণের কলশব্দ তাহাদের দুইজনের মনকে যেন ঘনিষ্ঠতর করিয়া তুলিবা । মাটিনে আর কোনমতেই চলিল ল । সাহিত্যও অার অবাধে অগ্রসর হয় না, মাঝে মাঝে নানা বাজে কথা আসিয়া পড়ে । বৃষ্টির উপলক্ষ্যে রমেশের আদালতযাত্রায় প্রায়ই বিঘ্ন ঘটিতে লাগিল । একএকদিন সকালে এমনি চাপিয়া বৃষ্টি আসে যে, হেমনলিনী উদ্বিগ্ন হইয়া বলে, *রমেশবাবু, এ বৃষ্টিতে আপনি বাড়ী যাইবেন কি করিয়া ?” রমেশ নিতান্ত লজ্জার খাতিরে বলে, “এইটুকু বই ত নয়, কোনরকম করিয়া যাইতে পারিব।” হেমনলিনী বলে, “কেন ভিজিয়া সদি করিবেন ? এইখানেই খাইয়া যান না ।” সর্দির জন্ত উৎকণ্ঠ রমৃেশের কিছুমাত্র ছিল না ; অল্পেই যে তাহার সর্দি হয়, এমন কোন লক্ষণও তাহার আত্মীয়- “ বন্ধুর দেখে নাই, কিন্তু বর্ষণের দিনে হেমুনলিনীর শুশ্রুষাধীনেই তাহাকে কাটাইতে হইত,— দুইপামাত্র চলিয়াও বাসায় যাওয়া অন্তীয় দুঃসাহসিকতা বলিযু গণ্য হইত। কোনদিন বাদলার একটু বিশেষ লক্ষণ দেখা দিলেই হেমনলিনীদের ঘরে প্রাতঃকালে রমেশের খিচুড়ি এবং অপরাহ্লে ভাজাভুজি থাইবার নিমন্ত্রণ জুটিত । বেশ দেখা গেল, হঠাৎ সর্দি লাগিবার সম্বন্ধে ইহাদের আশঙ্কা যত অতিরিক্ত প্রবল ছিল, পরিপাকের বিভ্ৰাটসম্বন্ধে ততটা ছিল না । "এমনি করিয়া দিন কাটিতে লাগিল । এই আত্মবিশ্বত হৃদয়াবেগের পরিণাম কোথায়, সে কথা রমেশ স্পষ্ট করিয়া ভাবে নাই । কিন্তু অন্নদণবাৰু ফ্লাবিতেছিলেন এবং তাহাদের সমাজের আরো পাচজন আলোচনা করিতেছিল। অন্নদীবাবু মনে মনে তাহার কন্যার উপর একটু বিরক্ত হইতেছিলেন ; ভাবিতেছিলেন, হেমনলিনীর7 উচিত, এই চা-পান ও খিচুড়িসেবনকে সুকৌশলে বিবাহের নিমন্ত্রণযজ্ঞের মধ্যে