পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/১৩

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।


প্রাক্‌কথন ২

জেনেছি তাকে’, এই প্রাচীন উচ্চারণ মেধাবী প্রত্যয়ে আজও মর্মরিত হয়, প্রাণিত করে আমাদের। কিন্তু সময়ের নিষ্করুণ প্রহারে ছিন্নভিন্ন হতে হতে আমরা কি তেমনভাবে দ্বিধা ও সংশয় পেরিয়ে যেতে পারি! সাহসী উচ্চারণ থেকে কতখানি বিচ্ছুরিত হয় উদ্‌ভাসনী আলো? আসলে আমাদের জিজ্ঞাসা পূর্ণাঙ্গ নয় কেননা আমরা আজও নিজেদের জিজ্ঞাসাকে নির্মাণ করতে শিখি নি। তাই প্রত্যুত্তরযোগ্যতাও অর্জিত হয়নি কী ব্যক্তিপরিসরে কী সামাজিক পরেসরে। অথচ জীবন নামক সমাপ্তিবিহীন নির্মাণের আয়োজনে জিজ্ঞাসার যথাথ গ্রন্থনাই সব কিছু।

 মিখায়েল মিখায়েলোভিচ বাখতিন জীবনতত্ত্ব ও জীবনপ্রয়োগের শ্রেষ্ঠ চিন্তাশিল্পী। হাঁ, ইদানীং মনে হয়, এই চিন্তা শুরু প্রকৃতপক্ষে চিন্তাকে শিল্পে রূপান্তরিত করেছেন। জীবন নামক প্রয়োগশালায় একটি মুহূর্তের সঙ্গে অপর মুহূর্তের, একটি অবস্থানের সঙ্গে অপর অবস্থানের, একটি অস্তিত্বের সঙ্গে অপর অস্তিত্বের দ্বিবাচনিকসম্পর্ক স্বতঃসিদ্ধ ও স্বয়ংদীপ্ত— এই পাঠই তো দিয়েছেন তিনি। জীবনে শেষ কথা বলে কিছু নেই, কোনো পূর্বধার্য সমাপ্তিবিন্দুও নেই কোথাও— এই বোধে দীক্ষিত হয় যখন, আমাদের হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে বুঝে নিই অন্তহীন সম্ভাবনার পরিসর হিসাবে।

 বাখতিন অনন্য উপন্যাসতাত্ত্বিক নিশ্চয়, কিন্তু তার চেয়েও বেশী হলো তিনি জীবন নামক স্থাপত্যের বিশ্বকর্মা। যত পড়ি তাকে, ততই নতুন নিষ্কর্য আবিষ্কার করি। উপন্যাসের পাঠকৃতি আর জীবনের বয়ানের যুগলবন্দি হয়ে ওঠে একই সত্যের ভিন্নভিন্ন প্রকাশ। ভিন্নতার পথে ঐক্যের সন্ধান আবার ঐক্যের পথে বিভিন্নতার খোজ: অনেকার্থদ্যোতক এই প্রকরণ। বহুঘরে বহুমাত্রায় তার বিন্যাসও প্রতিন্যাস। এই সন্দর্ভে নান্দনিক ব্যকরণের বিধি আছে নিশ্চয়, কিন্তু সেইসব বিধি পেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতায় ঐ খোজ অনন্য। তিনি শুধ প্রতীচ্যের ছিলেন না কখনও, তিনি সর্বমানবের চিন্তাগুরু। সব কালে ও সব পরিসরে তাকে বহুবার বারবার পুনরাবিষ্কার করে যেতে হবে আমাদের।

 তাই বাখতিন চর্চা আমাদের বৌদ্ধিক কৃত্য নয় কেবল, জীবনের প্রতি আনখশির তৃতীয় নিমগ্ন থেকে জীবন-পুনর্নির্মাণের আর্তি প্রতিষ্ঠার জরুরি আয়োজন। দ্বিরালাপই অস্তিত্বের সারসত্য এই বোধে উদ্দীপ্ত হওয়ার জন্যে নিজেকে জানাতে হয়: ‘জেনেছি