পাতা:বিদ্যাসাগর জননী ভগবতী দেবী.pdf/১৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
জন্ম ও বাল্যজীবন

স্বামীর অনুগত থাকিয়া সতত তাঁহার আজ্ঞা প্রতিপালন করিতেন। এইরূপে হিন্দুর এক একটি একান্নবর্ত্তী পরিবার সংসারভূমির মধ্যে এক একটি মরূদ্যান ছিল, এক একটি শান্তিনিকেতন ছিল। সেই জন্য মনে হয়, বহু শতাব্দীব্যাপিনী পরাধীনতা ও কুশিক্ষায় বঙ্গসমাজকে তখন যদিও হীনবীর্য্য ও মৃতকল্প করিয়াছিল, কিন্তু প্রাণহীন বা হৃদয়বিহীন করিতে পারে নাই। কারণ, তখন দেশে ত্যাগস্বীকার ছিল, কর্ত্তব্য ও দায়িত্ব বুদ্ধিতে দেশ প্রবুদ্ধ ছিল। আলস্য ও জড়তার মস্তকে পদাঘাত করিয়া আত্মপ্রত্যয় ও আত্মনির্ভর বলে দেশের কল্যাণের জন্য সকলে প্রাণপণে চেষ্টা করিতেন। জীবনধারণ করা ‘আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ’ এই মহামন্ত্র জ্বলন্ত অক্ষরে হৃদয়ে হৃদয়ে মুদ্রিত ছিল এবং স্বার্থত্যাগী হইয়া নিজের ও অপরের কল্যাণসাধনে যত্নবান্‌ হইতেন। ফলতঃ স্বার্থশূন্যতাই তাঁহাদের জীবনের প্রধান ধর্ম্ম ছিল। ফলের দিকে দৃষ্টি না রাখিয়া কর্ত্তব্যবুদ্ধিতে লোক-হিতের জন্য নিরন্তর কর্ম্ম করিতে হইবে,— এইরূপ কর্ম্মে যদি প্রাণ যায়, তাহাও পরম সৌভাগ্যের বিষয়, এইভাব তখন দেশের মধ্যে প্রবল ছিল এবং সকলে ইহাকে ধর্ম্মের প্রধান অঙ্গ বলিয়া মনে করিতেন। কিন্তু হায় সেকাল আর একাল! এখন দেশে সে স্বার্থত্যাগ কোথায়? সে ধর্ম্মভাব কোথায়? হিন্দুর সেই একান্নবর্ত্তী পরিবার সহানুভূতি ও ধর্ম্মভাবের অভাবে শতধা বিভক্ত হইয়া ক্রমশঃ শক্তিহীন ও হীনবীর্য্য হইয়া পড়িতেছে!

 বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বরচিত আত্মচরিতে তাঁহার মাতুলালয়ের যে উজ্জ্বল চিত্র অঙ্কিত করিয়াছেন, যে হৃদয়স্পর্শী বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়াছেন, তৎপাঠে সকলে অবগত হইতে পারিবেন, কিরূপে হিন্দুর একান্নবর্ত্তী পরিবার গার্হস্থ্যধর্ম্ম প্রতিপালন করিয়া আত্মীয় স্বজন ও সমাজের প্রভূত কল্যাণসাধন করিতেন। তিনি লিখিয়াছেনঃ - “সচরাচর দেখিতে পাওয়া যায়, একান্নবর্ত্তী ভ্রাতাদের, অধিক দিন, পরস্পর সদ্ভাব থাকে না; যিনি সংসারে কর্ত্তৃত্ব করেন, তাঁহার পরিবার যেরূপ সুখে ও স্বচ্ছন্দে থাকেন, অন্য অন্য ভ্রাতাদের পরিবারের পক্ষে সেরূপ সুখে ও স্বচ্ছন্দে থাকা, কোনও মতে, ঘটিয়া উঠে না। এজন্য, অল্প দিনেই, ভ্রাতাদের পরস্পর মনান্তর ঘটে; অবশেষে, মুখ দেখাদেখি বন্ধ হইয়া, পৃথক হইতে হয়। কিন্তু, সৌজন্য ও মনুষ্যত্ব বিষয়ে চারি জনেই সমান ছিলেন। এজন্য, কেহ, কখনও, ইঁহাদের চারি সহোদরের মধ্যে, মনান্তর বা কথান্তর দেখিতে পান নাই। স্বীয় পরিবারের কথা দূরে থাকুক, ভগিনী, ভাগিনেয়ী, ভাগিনেয়ীদের পুত্রকন্যাদের উপরেও, তাঁহাদের অণুমাত্র বিভিন্ন ভাব ছিল না। ভাগিনেয়ীরা, পুত্রকন্যা লইয়া, মাতুলালয়ে গিয়া, যেরূপ সুখে সমাদরে, কালযাপন করিতেন কন্যারা, পুত্র কন্যা লইয়া, পিত্রালয়ে গিয়া, সচরাচর সেরূপ সুখ ও সমাদর প্রাপ্ত হইতে পারেন না।

 “অতিথির সেবা ও অভ্যাগতের পরিচর্য্যা, এই পরিবারে, যেরূপ যত্ন ও শ্রদ্ধা