পাতা:বিদ্যাসাগর জননী ভগবতী দেবী.pdf/৪১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
শিশুচর্য্যা ও সন্তানশিক্ষা
৩১

 এ পর্য্যন্ত সন্তানের উপর মাতার প্রভাব এবং তৎকালীন আদর্শ হিন্দু, পরিবারের অনুষ্ঠানগত ধর্ম্ম ও নৈতিক শিক্ষার বিষয় কথিত হইল। পথেই বলিয়াছি, তখন দ্বিবিধ শিক্ষা ছিল—অনুষ্ঠানগত এবং চরিত্রগত শিক্ষা। ভগবতী দেবীর চরিত্রগত শিক্ষা কি কি ছিল, সে সম্বন্ধে অনুসন্ধান দ্বারা আমরা যত দূর অবগত হইতে পারিয়াছি, সেই সময়ের উল্লেখ করিয়া আমরা এই অধ্যায়ের উপসংহার করিব।

 তাঁহার চরিত্রের এই এক বিশেষত্ব দেখিতে পাওয়া যায় যে, তিনি অসত্যকে সত্যরূপে প্রতীয়মান করিতে অতিশয় ঘৃণা বোধ করিতেন। অনেক জননীকে এূরপ দেখা যায় যে, রোরুদ্যমান শিশু সন্তানগণকে শান্ত করিবার মানসে, কিম্বা অবাধ্য সন্তানদিগকে বাধ্য করিবার অভিপ্রায়ে তাঁহারা তাহাদিগকে ‘জুজুর ভয়’ দেখাইয়া

    সতত উন্মুখ হইয়া থাকিবে। যে ব্যক্তি বিদ্যামদে বা ধনমদে মত্ত হইয়া মাতাপিতাকে অবহেলা করে, সে সর্ব্বধর্ম্ম বহিষ্কৃত হইয়া ঘোর নরকে গমন করে। যদি প্রাণ কণ্ঠাগত হয়, তথাপি গৃহস্থগণ মাতা, পিতা, পুত্র, ভার্ষ্যা, অতিথি ও সহোদর ইহাদিগকে না দিয়া কদাপি স্বয়ং ভোজন করিবে না। যে ব্যক্তি মাতা পিতা ভ্রাতা বন্ধুবান্ধব প্রভৃতি জনগণকে দিয়া স্বকীয় উদর পূরণার্থে ভোজন করে, সে ইহলোকে অতীব নিন্দিত হয়, এবং পরলোকেও ঘোর নরকে পতিত হইয়া থাকে। গৃহস্থগণের কর্ত্তব্য্য এই যে, ভার্ষ্যার রক্ষণাবেক্ষণ করিবে; পুত্রগণকে বিদ্যাশিক্ষা করাইবে; স্বজন ও বন্ধুবান্ধবগণের ভরণপোষণ করিবে। ইহাই তাহাদিগের সনাতন ধর্ম্ম। জননী দ্বারা দেহের পুষ্টিসাধন হয়, জন্মদাতা জনক হইতে দেহের উৎপত্তি হয়, এবং জনগণ প্রীতিবশত শিক্ষা প্রদান করিয়া থাকে; সুতরাং যে ব্যক্তি ইহাদিগকে পরিত্যাগ করে, সে নরাধম (তাহাতে সন্দেহ নাই)। মহেশানি! গুরুজন ও আত্মীয়-স্বজনগণের নিমিত্ত শত শত কষ্ট স্বীকার করিয়াও নিরন্তর শক্তি অনুসারে ইহাদের সকলের সন্তোষসাধন করিবে। ইহাই সনাতন ধর্ম্ম। যে ব্যক্তি ব্রহ্মনিষ্ঠ ও সত্যপ্রতিজ্ঞ হইয়া কর্ম্ম করে পৃথ্বীতলে সেই মহাপুরুষই ধন্য, সেই মহাপুরুষই কৃতী এবং সেই মহাপুরুষই পরমার্থ জ্ঞান লাভে সমর্থ হইয়া থাকে। ভার্য্যা যদি পতিব্রতা ও সাধ্বী হয়, তাহা হইলে গৃহস্থ কদাপি তাহাকে প্রহার করিবে না, অধিকন্তু নিরন্তর মাতার ন্যায় পরিপালন করিবে এবং ঘোর কষ্টে পতিত হইলেও তাহাকে কখনই পরিত্যাগ করিতে পারিবে না।
     * * * * *
     প্রাজ্ঞ ব্যক্তি *** কোন স্ত্রীকে অযুক্ত কথা বলিবে না; এবং স্ত্রীলোকের উপরি শৌর্য্য প্রদর্শনও করিবে না। ধন-প্রদান, বসন-প্রদান, প্রেম-প্রদর্শন, শ্রদ্ধা-প্রকাশ, অমৃততুল্য মধুর বচন প্রয়োগ প্রভৃতি দ্বারা নিরন্তর ভার্য্রযা সন্তোষসাধন করিবে; কদাপি কোন বিষয়ে তাহার অপ্রিয়াচরণ করিবে না। সুবুদ্ধি ব্যক্তি উৎসবে, লোকযাত্রায়, তীর্থে এবং পরগৃহে পত্র অথবা আত্মীয় কাহাকেও সমভিব্যাহারে না দিয়া কদাপি একাকিনী পত্নীকে প্রেরণ করিবে না। মহেশানি! যে পুরুষের প্রতি পতিব্রতা ভার্য্যা পরিতুষ্টা থাকে, সে নিখিল ধর্ম্মকর্ম্মকরণজনিত ফল লাভ করিয়া থাকে, এবং তোমার প্রীতিভাজন হয়। পিতা চারি বৎসর বয়স পর্য্যন্ত পুত্রের লালনপালন করবে, পরে যোড়শ বৎসর বয়স পর্য্যন্ত বিদ্যা ও (দয়া দাক্ষিণ্য,