পাতা:বিদ্যাসাগর জননী ভগবতী দেবী.pdf/৮৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৭৬
ভগবতী দেবী

কোন প্রকার শাস্ত্র বা লোকাচার প্রথায় আবদ্ধ ছিল না। বীরসিংহ ও তন্নিকটবর্ত্তী গ্রামসমূহের অধিবাসিদের উপর তাঁহার দয়াপ্রবণ হৃদয়ের করুণাাবারি সতত বর্ষিত হইত। তাঁহার সেই উন্নত হৃদয়, রোগার্ত্তের সেবা, ক্ষুধার্তকে অন্নদান, শোকাতুরের শোকে শোক ও সহানুভূতি প্রকাশ করিতে সতত ব্যস্ত থাকিত।

 ভগবতী দেবী সর্ব্বদাই গ্রামস্থ অভুক্ত লোকদিগকে ভোজন করাইতেন। স্থানীয় প্রতিবাসিগণ পীড়িত হইলে, সর্ব্বদাই তাহাদের তত্ত্বাবধান করিতেন। বিদেশীয় যে সকল রোগিগণ চিকিৎসার জন্য বাটীতে আসিয়া অবস্থিতি করিত, তিনি স্বয়ং তাহাদের আবশ্যক দ্রব্যাদি পাক করিয়া দিতেন। যে সকল দরিদ্র প্রতিবেশীর বস্ত্র না থাকিত, সময়ে সময়ে তাহাদিগকে যথেষ্ট বস্ত্র ক্রয় করিয়া দিতেন, এবং সময়ে সময়ে অনেকের আপদ বিপদে যথেষ্ট অর্থ প্রদান করিতেন। ভগবতী দেবীর দানের জন্য যখন যাহা আবশ্যক হইত, বিদ্যাসাগর মহাশয় অবিলম্বে তাহা পাঠাইয়া দিতেন। তিনি যাহাতে সন্তুষ্ট থাকেন, বিদ্যাসাগর মহাশয় সেই কার্য্য অবিলম্বে সম্পন্ন করিতেন। প্রতি বৎসরেই বিদ্যাসাগরকে অনুরোধ করিয়া অনেক দীন দরিদ্রের কর্ম্ম করিয়া দিতেন। বৎসরের মধ্যে নূতন নূতন অনেক কুটুম্ব ও গ্রামস্থ অনাথগণের মাসহারা করাইয়া দিতেন। গ্রামে বিদ্যালয় সংস্থাপনের পূর্ব্বে গ্রামস্থ প্রায় সকল লোকেই দরিদ্র ছিল। কেহ লেখাপড়া জানিত না। কেহ চাকরী করিত না। সকলেই সামান্য কৃষিবৃত্তি অবলম্বন করিয়া দিনপাত করিত। সংবৎসরের পরিশ্রমলব্ধ সমস্ত ধান্য পৌষ মাসেই মহাজনগণ বলপূর্ব্বক এক কালেই লইয়া যাইতেন। গ্রামের প্রায় অনেক লোক এক সন্ধ্যা আহার করিয়া অতি কষ্টে দিনপাত করিত। ভগবতী দেবী গ্রামস্থ অনেককেই টাকা ধার দিতেন, কিন্তু কাহারও নিকট পাইবার আশা রাখিতেন না।

 কেহ দেনা শোধ করিতে অক্ষম হইলে, তিনি তাহার নিকট হইতে আসল টাকা পযত লইতেন না। তিনি বলিতেন, “উহাদের অভাব দূর করিবার জন্যই ত টাকা ধার দেওয়া; অর্থ সঞ্চয় করা ত আমার উদ্দেশ্য নহে।” তিনি এমনই দয়াবতী ছিলেন যে, অক্ষম অধমণগণকে ক্রন্দন করতে দেখিলে, তাহাদিগকে সান্ত্বনাবাক্যে বলিতেন, ‘অবস্থা ভাল হয়, দিবি। না হয় না দিবি, তার জন্য কাঁদিস কেন?”

 অর্থের প্রয়োজন হইলে, মধ্যে মধ্যে তিনি এইরূপ টাকা আদায় করিতে বাহির। হইতেন। কেহ বা তখন হলুদ বাটিয়া; তাঁহাকে মাখাইয়া দিত। কেহ বা তাঁহার অঞ্চলে মুড়ি কিম্বা অন্য কোন খাদ্যদ্রব্য বাঁধিয়া দিত। দয়াবতী ভগবতী দেবী তাহাদের যত্নে টাকা আদায়ের কথা ভুলিয়া যাইতেন। এবং গৃহে প্রত্যাগমনকালে তাহাদিগকে বলিয়া আসিতেন, ‘“আজ তোরা আমাদের বাটীতে প্রসাদ পাস্”। এইরূপে টাকা আদায়ের পরিবর্ত্তে গৃহে গৃহে নিমন্ত্রণ করিয়া অবশেষে স্বীয় ভবনে প্রত্যাগত হইতেন। বাটির সকলের আহার শেষ হইলে, যদি কোন