পাতা:বিশ্বকোষ ঊনবিংশ খণ্ড.djvu/৩৮৪

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
[৩৮৪]
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বঙ্কাটক (পুং) পর্ব্বতভেদ। (কথাসরিৎসা° ৪৮ǀ৪৯)

বঙ্কর (পুং) নদীর বাঁক।

বঙ্কসেন (পুং) অগস্তিবৃক্ষ। বকবৃক্ষ।

বঙ্কা (স্ত্রী) বঙ্ক-টাপ্। বল্‌গ্রাগ্রভাগ। পল্যয়ন। চলিত পালান।

“বঙ্কঃ পর্য্যাণভাগে নদীপাত্রে চ ভঙ্গুরে” (মেদিনী)
‘পর্য্যাণস্যাগ্রভাগঃ’ ইতি ত্রিকাণ্ডশেষঃ।

বঙ্কালকাচার্য্য, প্রাচীন জ্যোতির্ব্বিদ্‌ভেদ।

বঙ্কালা (স্ত্রী) নগরভেদ। (রাজতর° ৩.৪৮০) বাঙ্গালার প্রাচীন রাজধানী।

বঙ্কিণী (স্ত্রী) কোলনাসিকা নামক ক্ষুপভেদ। (হারাবলী)

বঙ্কিম (ক্লী) বঙ্ক-ইমনিচ্। ১ বক্র। ২ ঈষৎ বাঁকা।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়—বঙ্গের প্রতিভাশালী অদ্বিতীয় ঔপন্যাসিক, চিন্তাশীল কবি এবং একজন প্রধান দার্শনিক। ১৮৩৮ খৃষ্টাব্দে ২৭এ জুন, নৈহাটী ষ্টেসনের পার্শ্বস্থ কাঁটালপাড়া গ্রামে সাহিত্যরথী বঙ্কিমচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। (কোষ্ঠীঅনুসারে শকাব্দা ১৭৬০ǀ২ǀ১২ǀ৩৯ǀ৩০ তাঁহার জন্মকাল।)

 বঙ্কিমচন্দ্রের পিতা যাদবচন্দ্র লর্ড হার্ডিঞ্জের শাসনকালে ডিপুটি-কলেক্টর ছিলেন। তাঁহার চারিপুত্র—শ্যামাচরণ, সঞ্জীবচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র ও পূর্ণচন্দ্র।

 বাল্যকাল হইতেই বঙ্কিমচন্দ্রের মেধা ও প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। পঞ্চম বর্ষ বয়ঃক্রম কালে একদিনেই তাঁহার বর্ণজ্ঞান জন্মিয়াছিল! কাঁটালপাড়ার পাঠশালায় তাঁহার প্রথম শিক্ষা। তাঁহার যখন অষ্টবৰ্ষ বয়ঃক্রম, সেই সময়ে তাঁহার পিতা মেদিনীপুরের ডেপুটি কলেক্টর। বঙ্কিমচন্দ্রের পিতা পুত্রকে কাছে রাখিয়া লেখাপড়া শেখান, এই তাঁহার বরাবর ইচ্ছা ছিল। তিনি বঙ্কিমচন্দ্রকে মেদিনীপুরের ইংরাজী স্কুলে দিলেন। এ সময়ে বঙ্কিমচন্দ্র যেরূপ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়াছিলেন, তাহাও অসাধারণ। প্রতিবর্ষে দুইবার তিনি উচ্চ শ্রেণিতে উঠিতেন, অথচ সর্ব্বোচ্চ স্থান অধিকার করিতেন। মেদিনীপুর জেলার কাঁথি মহকুমার অন্তর্গত শোভন নদীতটের দৃশ্যাবলী—স্বচ্ছ, বিরলতরু, সিকতাভূমির নির্জ্জন স্বভাব-সম্পৎ বঙ্কিমচন্দ্রের হৃদয়ে চিরদিন অঙ্কিত ছিল, তাঁহার অপূর্ব্ব কপালকুণ্ডলার দৃশ্যাবলীতে সেই আলেখ্যের ছায়া সুস্পষ্টভাবে পতিত হইয়া তাহা পরম সুন্দর করিয়া তুলিয়াছে।

 ১৮৫১ খৃষ্টাব্দে যাদবচন্দ্র ২৪ পরগণায় বদলি হইলেন। বঙ্কিমচন্দ্র এ সময়ে হুগলীকলেজে প্রবেশ করিলেন। কলেজেও তাঁহার গবেষণা ও শিক্ষার পরিচয় পাইয়া অধ্যাপকমণ্ডলী বিস্মিত হইতেন! তিনি কেবল পাঠ্য পুস্তক পাঠ করিয়া তৃপ্তিবোধ করিতেন না। কলেজের পুস্তকালয়ে গিয়া সর্ব্বদাই
তিনি ভাল পুস্তক লইয়া পাঠ করিতেন। হুগলীকলেজ হইতে তিনি সিনিয়র-স্কলারসিপ্ পরীক্ষায় বিশেষ প্রশংসার সহিত উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন। এই সময়ে তিনি কোন অধ্যাপকের নিকট চারিবৎসর কাল সংস্কৃতগ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। কলেজে পাঠকালে তাঁহার প্রশংসা সকল অধ্যাপকের মুখেই শুনা যাইত। সাহিত্য বলিয়া নহে, অঙ্কশাস্ত্রেও তাঁহার অসাধারণ ব্যুৎপত্তি হইয়াছিল।

 হুগলীকলেজে অধ্যয়ন শেষ করিয়া তিনি কলিকাতায় আসিয়া প্রেসিডেন্সি কলেজে আইন পড়িতে আরম্ভ করেন। এই সময় ১৮৫৮ খৃষ্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বি, এ, পরীক্ষা প্রচলিত হয়। তখন বঙ্কিমচন্দ্রের বয়স ২০ বর্ষ। তিনি আইন পড়িতে পড়িতেই বি, এ, পরীক্ষা দিলেন এবং বিশেষ প্রশংসার সহিত উত্তীর্ণ হইলেন। তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বৎসরের বি, এ। বি, এ উপাধি তখন এ দেশে এমন অপূর্ব্ব সামগ্রী বলিয়া গণ্য হইয়াছিল যে বঙ্কিমবাবুকে দেখিবার জন্য বহু ক্রোশ পর্য্যটন করিয়া লোকজন আসিত, এবং বঙ্কিমবাবু শিক্ষিতমণ্ডলীর মুখোজ্জ্বল “বি, এ বঙ্কিম” বলিয়া সর্ব্বত্র পরিচিত হইয়াছিলেন।

 বঙ্কিমচন্দ্রের বি, এ পাশ করিবার অব্যবহিত পরেই ছোটলাট হ্যালিডে সাহেব তাঁহাকে ডেপুটি মাজিষ্ট্রেট করিয়া পাঠাইলেন। কাজেই তাঁহার আইন পাশ দেওয়া হইল না।

 স্বদেশের প্রতি তাঁহার বরাবর অনুরাগ ছিল। পরের জিনিষ হইতে যে ঘরের জিনিষ ভাল, এ কথা তিনিই সর্ব্বপ্রথম শিক্ষিতসম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচার করেন। উচ্চ রাজকার্য্যে নিযুক্ত হইয়াও তিনি মাতৃভাষার সেবাই জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ লক্ষ্য বলিয়া গণ্য করিয়াছিলেন।

 বালককাল হইতে তাঁহার বঙ্গভাষার প্রতি অনুরাগ লক্ষিত হয়। তিনি ঈশ্বরগুপ্তের কবিতামালা আনন্দের সহিত পাঠ করিতেন। ত্রয়োদশবর্ষ বয়ঃক্রমকালে তিনি “মানস ও ললিত” নামধেয় কবিতা রচনা করেন। ঈশ্বরগুপ্ত তাঁহার কবিতা শুনিয়া বড়ই প্রীতিলাভ করেন এবং প্রভাকরে প্রকাশ করিয়া তাঁহাকে উৎসাহিত করেন। সেই দিন হইতে বঙ্কিমচন্দ্র ঈশ্বর গুপ্তের শিষ্য হইলেন।

 ১৮৬১ খৃষ্টাব্দে তাঁহার প্রথম উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী বিরচিত ও তৎপর বর্ষে প্রকাশিত হইল। যদিও ইংরাজী আদর্শ লইয়া দুর্গেশনন্দিনী রচিত হইয়াছিল বটে, কিন্তু তাঁহার এই প্রথম উদ্যমেই তিনি বঙ্গভাষার উপর অসাধারণ আধিপত্য ও চরিত্রচিত্রণে অপূর্ব্ব দক্ষতা দেখাইয়াছেন, উপন্যাস লিখিয়া কাহারও ভাগ্যে এরূপ সাফল্যলাভ ঘটে