পাতা:মাধবীকঙ্কণ - রমেশচন্দ্র দত্ত.pdf/২৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

হইছে। নদীর বিশাল বহল শান্ত বিস্তীর্ণ ও উজ্জ্বল, ক্ষুদ্র মানবের সুখ বা দুঃখ, জয় বা পরাজয়ে বিচলিত হয় না।

 ক্রমে রজনী গভীর হইল, চন্দ্র উদিত হইল, তাহার নির্মল নিষ্কলঙ্ক কিরণে মানবের কলঙ্কের কথা প্রকাশ করিতে লাগিল। প্রতিদ্বন্দ্বী ভ্রাতৃগণ পরস্পরের শোণিতপাণে লোলুপ হইয়া এই যুদ্ধানল প্রজ্বলিত করিয়াছে; শৃগাল, ব্যাঘ্র, ভল্লুকও স্বজাতির উপর হিংসা করে না। সেই চন্দ্রলোকে দুইজন রাজপুত কোন বন্ধুর অনুসন্ধানে যুদ্ধক্ষেত্রে আসিয়াছিল। একস্থানে কতকগুলি শব পড়িয়াছিল, তাহার মধ্য হইতে যেন বেদনসূচক স্বর বহির্গত হইল। রাজপুত সেনাদ্বয় দেখিল, একজন যুবক মুমূর্ষু অবস্থায় পড়িয়া শব্দ করিতেছে। হৃদয়ে আঘাত পাইয়াছে ও সেই ক্ষতস্থান হইতে অনবরত শোণিত নির্গত হওয়ায় সে প্রায় অচেতন হইয়াছে, কিন্তু মৃত্যুর আশু সম্ভাবনা নাই।

 যুবকের আকৃতি দেখিয়া রাজপুত দুইজন বিস্মিত হইল। বয়ঃক্রম অতিশয় অঙ্গ, বোধহয় অষ্টাদশ বৎসরের অধিক নহে। মুখমণ্ডল অতিশয় সুন্দর ও উজ্জ্বল, যেরূপ সৌন্দর্য ও উজ্জ্বল স্ত্রীলোকের সম্ভবে, পুরুষের প্রায় সম্ভব না। চিন্তা অথবা বয়সের একটি রেখাও এ পর্যন্ত ললাটে অঙ্কিত হয় নাই, ললাট পরিস্কার ও উন্নত। সমস্ত বদনমণ্ডল দেখিলে যোদ্ধা বলিয়া বোধ হয় না, বালক বলিয়া বোধ হয়, বাল্যাবস্থাতেই হতভাগ্য স্বজন ও স্বদেশ হইতে বহু দূরে আসিয়া আজি প্রাণ হারাইতে বসিয়াছে।

 রাজপুতসেনা দুইজনেরই যুদ্ধব্যবসায়ে হৃদয়ের স্বাভাবিক দয়া অনেক হ্রাস হইয়াছে, বালককে দেখিয়া তাহারা হাস্য করিয়া এইরূপে কথোপকথন করিতে লাগিল,—

 প্রথম সেনা। এ বালক। এই বয়সেই যুদ্ধ করিতে আসিয়াছে?

 দ্বিতীয় সেনা। দেখিতেছি সুজার পক্ষের সেনা। বালক যুদ্ধে পরান্মুখ নহে, আমাদের রেখা পর্যন্ত আসিয়া যুদ্ধ করিয়াছে। এ কোন্ দেশের লোক?

 প্রথম সেনা। জানি না।

 দ্বিতীয় সেনা। আমার বোধ হয়, বঙ্গদেশের হিন্দু। মোগল বা পাঠান হইলে এরূপ বেশ হইত না।

 প্রথম সেনা। হা হা হা। সুজা এই বাঙালী শিশু লইয়া মহারাজ জয়সিংহ ও সুলাইমানের সহিত যুদ্ধ করিতে আসিয়াছিলেন? পুনরায় যখন আসিবেন, আমরা যুদ্ধে না আসিয়া আমাদের বালকদিগকে পাঠাইয়া দিব। চল. এখানে আর কেন? আমাদের বন্ধুর অন্বেষণ করি।

 দ্বিতীয় সেনা। এ লোকটা জীবিত আছে, একটু সাহায্য করিলে বোধ হয় বাঁচিবে, ইহাকে ত্যাগ করিয়া যাইব?

২৫