পাতা:মুর্শিদাবাদ কাহিনী.djvu/৩৫

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।

জগৎশেঠ

 গৌরব কিরীটভূষিতা অমিতৈশ্বর্যশালিনী সৌভাগ্য-লক্ষীর আশীর্মাল্য যাঁহাদের মস্তকে নিপতিত হয় সমগ্র জগতীতলে তাঁহারাই বরণীয় হইয়া থাকেন। তখন সদ্যঃপ্রকাশিত অরুণালোকের নিকট অমারজনীর গাঢ় তমোরাশির অপসরণের ন্যায় তাঁহাদের গৌরবপ্রভায় দুর্ভাগ্যের ঘনীভূত অন্ধকার দূরদূরান্তরে বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়ে। ক্রমে সেই আলোকপ্রবাহ তরঙ্গায়িত হইতে হইতে দিগ্‌দিগন্তে চলিয়া যায়, এবং যাহাকে সম্মুখে পায়, তাহাকেই আলোকময় করিয়া তুলে। ঐন্দ্রজালিকের মত তাঁহাদের করস্পর্শে ধূলিমুষ্টি স্বর্ণমুষ্টিতে পরিণত হয়,—সামান্য উপলখণ্ড মহামূল্য হীরকের আকার ধারণ করে। তাঁহাদের প্রতি পদবিক্ষেপে মরুভূমিতে অযুত কুসুম ফুটিয়া উঠে,— মহাশ্মশানে চন্দনের গন্ধ অনুভূত হয়। জগতের সমস্ত পদার্থ তাঁহাদের নিকট মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় অবস্থিতি করে। কি জড়জগৎ, কি জীবজগৎ, উভয়ই তাঁহাদের আজ্ঞাবহ হইয়া উঠে। তাঁহাদের অঙ্গুলিসঙ্কেতে নীলাকাশের বিরাটবক্ষোবাসিনী সৌদামিনী রাজপথে সমস্ত রজনী প্রহরীর কার্যে নিযুক্ত থাকে এবং সলিলগর্ভে লুক্কায়িত বাষ্পলহরী সহস্ৰ সহস্ৰ মত্তমাতঙ্গের বল ধারণ করিয়া শকটবহনকার্যে নিযুক্ত হয়। আবার সামান্য পশুপক্ষী হইতে জগতের প্রত্যেক মনুষ্য, প্রত্যেক জাতি তাঁহাদের নিকট কৃতাঞ্জলিপুটে দণ্ডায়মান থাকে। সহস্ৰ সহস্র রাজরাজেশ্বরের মণিমাণিক্যখচিত মুকুটমালা তাঁহাদের পদতলে বিলুণ্ঠিত হয় এবং তাঁহাদের ইঙ্গিতমাত্রে কত কত নবাব-বাদশাহের সিংহাসন পর্যন্ত টলিয়া যায়। যাঁহারা সৌভাগ্যলক্ষীর প্রকৃত বরপুত্র, তাঁহাদের মোহিনী শক্তিতে জগতে এমন কোন কার্যই নাই যাহা সম্পাদিত হইতে না পারে। ঐন্দ্রজালিকের মায়ায় পদার্থের বাস্তব পরিণতি ঘটে না; কিন্তু ভাগ্যলক্ষীর বরপুত্রের শক্তিতে প্রতিনিয়ত সেই পরিণতি সংগঠিত হয়। পৃথিবীর যে-যে জাতি ও যে-যে ব্যক্তি ভাগ্যলক্ষীর অনুগ্রহভাজন হইয়াছেন, তাঁহাদের গৌরবপ্রভায় বসুন্ধরা চিরপ্রভাময়ী থাকিবেন এবং অনন্তকাল ধরিয়া তাঁহাদের যশোগাথা দিগন্তহৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হইবে।

 ভাগ্যদেবীর অনুগ্রহের পাত্রবিচার নাই; তিনি যাহাকে ইচ্ছা তাহাকেই জয়মাল্য পরাইয়া থাকেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর বাঙ্গলার ধনকুবের শেঠবংশীয়গণ প্রথমে দারিদ্র্যের কঠোর-চক্রে নিষ্পেষিত হইয়া, আপনাদিগের নিবাসস্থান পরিত্যাগ করিয়া বাঙ্গলারাজ্যে উপস্থিত হইলে, তাঁহাদের উপর সৌভাগ্য-লক্ষীর করুণা-দৃষ্টি নিপতিত হয়। সেই অনুগ্রহবলে তাঁহারা অষ্টাদশ শতাব্দীতে সমগ্র ভারতবর্ষে এক অভাবনীয় কাণ্ডের অবতারণা করিয়া গিয়াছেন। বাদশাহ-নবাব হইতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজা-জমিদার পর্যন্ত তাঁহাদের অজস্র অর্থবৃষ্টিতে অভিষিক্ত হইয়া উঠিতেন। বৈদেশিক ইংরেজ-ফরাসীগণ তাঁহাদের বিনা অনুগ্রহে বাণিজ্যকার্যপরিচালনে সমর্থ হইতেন না; মুর্শিদাবাদের নবাবগণ সর্বদাই তাঁহাদের মুখাপেক্ষা করিতেন এবং