পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৩৪৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


WStr রবীন্দ্ৰ-রচনাবলী স্বপ্নে বহুদূরের আভাস আসে, মনে হয় এই সুর চিরদিনের চেনা । রাতের পরে রাত গোল । অন্ধকারে তরুতলে যে মানুষ ছায়ার মতো নাচে তাকে চোখে দেখে না, তাকে হািদয়ে দেখা যায়যেমন দেখা যায় জনশূন্য দেওদার বনের দোলায়িত শাখায় দক্ষিণসমুদ্রের হাওয়ার হাহাকার-মূর্তি । এ কী হল রাজমহিষীর । কোন হতাশের বিরহ তার বিরহকে জাগিয়ে তোলে ! মাটির প্রদীপ-শিখায় সোনার প্রদীপ জ্বলে উঠল বুঝি । রাতজাগা পাখি নিস্তব্ধ নীড়ের পাশ দিয়ে হুহু করে উড়ে যায়, তার পাখার শব্দে ঘুমন্ত পাখির পাখা উৎসুক হয়ে ওঠে যে । বীণায় বাজতে থাকে কেদারা, বেহাগ, বাজে কালাংড়া । আকাশে আকাশে তারাগুলি যেন তামসী তপস্বিনীর নীরব জপমন্ত্র । রাজমহিষী বিছানার পরে উঠে বসে । স্ৰান্ত তার বেণী, ত্ৰান্ত তার বক্ষ । বীণার গুঞ্জরণ আকাশে মেলে দেয় এক অন্তহীন অভিসারের পথ । রাগিণী-বিছানো সেই শূন্যপথে বেরিয়ে পড়ে তার মন । কার দিকে । দেখার আগে যাকে চিনেছিল তারই দিকে । একদিন নিমফুলের গন্ধ অন্ধকার ঘরে অনির্বচনীয়ের আমন্ত্রণ নিয়ে এসেছে। মহিষী বিছানা ছেড়ে বাতায়নের কাছে এসে দাড়ালো । নীচে সেই ছায়ামূর্তির নৃত্য, বিরহের সেই উৰ্মি-দোলা । মহিষীর সমস্ত দেহ কম্পিত । ঝিল্লিঝংকৃত রাত, কৃষ্ণপক্ষের চাদ দিগন্তে । অস্পষ্ট আলোয় অরণ্য স্বপ্নে কথা কইছে । সেই বোবা বনের ভাষাহীন বাণী লাগল রাজমহিষীর অঙ্গে অঙ্গে । কখন নাচ আরম্ভ হল। সে জানে না । এ নাচ কোন জন্মান্তরের, কোন লোকান্তরের । গেল। আরো দুই রাত । অভিসারের পথ একান্তই শেষ হয়ে আসছে। এই জানলারই কাছে । সেদিন বীণায় পরিজের বিহবল মিড় । কমালিকা আপন মনে নীরবে বলছে, “ওগো কাতর, ওগো হতাশ, আর ডেকো না । আমার আর দেরি নেই ।” কিন্তু যাবে কার কাছে । চোখে না দেখেছিল যাকে তারই কাছে তো ? কেমন করে হবে । দেখা-মানুষ আজ না-দেখা মানুষকে ছিনিয়ে নিয়ে