পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৩৮১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রক্তকরবী VVV নটবালকের মতো আকাশে আকাশে নেচে বেড়াচ্ছে। সেই নাচের ছন্দেই নন্দিনী, তুমি এমন সহজ হয়েছ, এমন সুন্দর। আমার তুলনায় তুমি কতটুকু, তবু তোমাকে ঈর্ষা করি । নন্দিনী । তুমি নিজেকে সবার থেকে হরণ করে রেখে বঞ্চিত করেছ; সহজ হয়ে ধরা দাও না কেন । নেপথ্যে । নিজেকে গুপ্ত রেখে বিশ্বের বড়ো বড়ো মালখানার মোটা মোটা জিনিস চুরি করতে বসেছি। কিন্তু যে দান বিধাতার হাতের মুঠির মধ্যে ঢাকা, সেখানে তোমার চাপার কলির মতো আঙুলটি যতটুকু পৌঁছয়, আমার সমস্ত দেহের জোর তার কাছ দিয়ে যায় না। বিধাতার সেই বদ্ধ মুঠো। আমাকে খুলতেই হবে । নন্দিনী । তোমার এ-সব কথা আমি ভালো বুঝতে পারি নে, আমি যাই । নেপথ্যে । আচ্ছা যেয়ো- কিন্তু জানলার বাইরে এই হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি, তোমার হাতখানি একবার এর উপর রাখো । নন্দিনী । না না, তোমার সবখানা বাদ দিয়ে হঠাৎ একখানা হাত বেরিয়ে এলে আমার ভয় করে । নেপথ্যে । কেবল একখানা হাত দিয়ে ধরতে চাই বলেই সবাই আমার কাছ থেকে পালিয়ে যায় । কিন্তু সব দিয়ে যদি তোমাকে ধরতে চাই, ধরা দেবে কি, নন্দিন । নন্দিনী । তুমি তো আমাকে ঘরে যেতে দিলে না, তবে কেন এ-সব বলছি। নেপথ্যে । আমার অনবকাশের উজান ঠেলে তোমাকে ঘরে আনতে চাই নে। যেদিন পালের হাওয়ায় তুমি অনায়াসে আসবে সেইদিন আগমনীর লগ্ন লাগবে । সে হাওয়া যদি ঝড়ের হাওয়া হয় সেও ভালো । এখনো সময় হয় নি । নন্দিনী । আমি তোমাকে বলছি। রাজা, সেই পালের হাওয়া আনবে রঞ্জন। সে যেখানে যায় ছুটি সঙ্গে নিয়ে আসে । নেপথ্যে । তোমার রঞ্জন যে ছুটি বয়ে নিয়ে বেড়ায় সেই ছুটিকে রক্তকরবীর মধু দিয়ে ভরে রাখে কে, আমি কি জানি নে । নন্দিন, তুমি তো আমাকে ফাঁকা ছুটির খবর দিলে, মধু কোথায় পাব । নন্দিনী । আজ আমি তবে যাই । নেপথ্যে । না, এই কথাটার জবাব দিয়ে যাও । নন্দিনী । ছুটি কী করে মধুতে ভরে, তার জবাব রঞ্জনকে চোখে দেখলেই পাবে। সে বড়ো সুন্দর। নেপথ্যে । সুন্দরের জবাব সুন্দরই পায় । অসুন্দর যখন জবাব ছিনিয়ে নিতে চায়, বীণার তার বাজে না, ছিড়ে যায় । আর নয়, যাও তুমি চলে যাও— নইলে বিপদ ঘটবে। নন্দিনী । যাচ্ছি, কিন্তু বলে গেলুম, আজ আমার রঞ্জন আসবে, আসবে, আসবে- কিছুতে তাকে ঠেকাতে পারবে না । [প্ৰস্থান ফাগুলাল খোদাইকর ও তার শ্ৰীচন্দ্রার প্রবেশ ফাগুলাল । আমার মদ কোথায় লুকিয়েছ চন্দ্ৰা, বের করে । চন্দ্ৰা । ওকি কথা । সকাল থেকেই মন্দ ? ফাগুলাল। আজ ছুটির দিন । কাল ওদের মারণচণ্ডীর ব্ৰত গেছে। আজ ধ্বজপূজা, সেইসঙ্গে চন্দ্ৰা । বল কী । ওরা কি ঠাকুরদেবতা মানে ! ফাগুলাল । দেখ নি। ওদের মদের ভাড়ার, অন্ত্রশালা আর মন্দির একেবারে গায়ে গায়ে ? চন্দ্ৰা । তা ছুটি পেয়েছ বলেই মদ ? গায়ে থাকতে পার্বণের ছুটিতে তো- . ফাগুলাল। বনের মধ্যে পাখি ছুটি পেলে উড়তে পায়, ধাচার মধ্যে তাকে ছুটি দিলে মাথা ঠুকে মরে । যক্ষপুরে কাজের চেয়ে ছুটি বিষম বালাই । চন্দ্ৰা..। কাজ ছেড়ে দাও-না, চলো-না ঘরে ফিরে ।