পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৩৯৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রক্তকরবী VSA নন্দিনীর দ্রুত প্ৰবেশ নন্দিনী । সর্দার । সর্দার ! ও কী ! ও কারা ! সর্দার । কী গো নন্দিনী, তোমার কুঁদফুলের মালা পরব যখন ঘোর রাত হবে । অন্ধকারে যখন আমার বারো-আনাই অস্পষ্ট হয়ে উঠবে তখন হয়তো ফুলের মালায় আমাকেও মানাতে পারে । নন্দিনী । চেয়ে দেখো, ও কী ভয়ানক দৃশ্য ! প্ৰেতপুরীর দরজা খুলে গেছে নাকি ! ঐ কারা চলেছে প্রহরীদের সঙ্গে ? ঐ-যে বেরিয়ে আসছে রাজার মহলের খিড়কি-দরজা দিয়ে ? সর্দার । ওদের আমরা বলি রাজার ঐটাে” । নন্দিনী । মানে কী ? সর্দার । মানে একদিন তুমিও বুঝবে, আজ থাক । নন্দিনী । কিন্তু এ-সব কী চেহারা ! ওরা কি মানুষ ! ওদের মধ্যে মাংসমজ্জা মনপ্ৰাণ কিছু কি আছে! সর্দার । হয়তো নেই । নন্দিনী । কোনোদিন ছিল ? সর্দার । হয়তো ছিল । নন্দিনী । এখন গেল কোথায় ? সর্দার । বস্তুবাগীশ, পার তো বুঝিয়ে দাও, আমি চললুম। [প্ৰস্থান নন্দিনী । ও কী, ঐ-সব ছায়াদের মধ্যে যে চেনা মুখ দেখছি। ঐ তো নিশ্চয় আমাদের অনুপ আর উপমনু । অধ্যাপক, ওরা আমাদের পাশের গায়ের লোক । দুই ভাই মাথায় যেমন লম্বা গায়ে তেমনি শক্ত, ওদের সবাই বলে তাল-তমাল । আষাঢ়-চতুর্দশীতে আমাদের নদীতে বাচ খেলতে আসত। মরে যাই ! ওদের এমন দশা কে করলে ? ঐ-যে দেখি শকুলু, তলোয়ারখেলায় সব্বার আগে পেত মালা। অনু-প, শকুলু-, এই দিকে চেয়ে দেখো, এই আমি, তোমাদের নন্দিন, ঈশানীপাড়ার নন্দিন। মাথা তুলে দেখলে না, চিরদিনের মতো মাথা হেঁট হয়ে গেছে । ওকি, কন্ধু যে ! আহা, আহা, ওর মতো ছেলেকেও যেন আখের মতো চিবিয়ে ফেলে দিয়েছে। বড়ো লাজুক ছিল ; যে-ঘাটে জল আনতে যৌতুম, তারই কাছে ঢালু। পাড়ির পরে বসে থাকত, ভান করত যেন তীর বানাবার জন্য শর ভাঙতে এসেছে। দুষ্টমি করে ওকে কত দুঃখ দিয়েছি। ও কন্ধু, ফিরে চা আমার দিকে । হায় রে, আমার ইশারাতে যার রক্ত নেচে উঠত, সে আমার ডাকে সাড়াই দিলে না । গেল গো, আমাদের গায়ের সব আলো নিবে গেল ! অধ্যাপক, লোহাটা ক্ষয়ে গেছে, কালো মরচেটাই বাকি ! এমন কেন হল ! অধ্যাপক । নন্দিনী, যে দিকটাতে ছাই, তোমার দৃষ্টি আজ সেই দিকটাতেই পড়েছে। একবার শিখার দিকে তাকাও, দেখবে তার জিহবা লকলক করছে। নন্দিনী । তোমার কথা বুঝতে পারছি নে । অধ্যাপক। রাজাকে তো দেখেছ ? তার মূর্তি দেখে শুনছি। নাকি তোমার মন মুগ্ধ হয়েছে ? নন্দিনী । হয়েছে বৈকি। সে-যে অদ্ভুত শক্তির চেহারা। অধ্যাপক। সেই অদ্ভুতটি হল যার জমা, এই কিভূতটি হল তার খরচ। ঐ ছােটােগুলো হতে থাকে ছাই, আর ঐ বড়োটা জ্বলতে থাকে শিখা । এই হচ্ছে বড়ো হবার তত্ত্ব । ” নন্দিনী । ও তো রাক্ষসের তত্ত্ব । অধ্যাপক । তত্ত্বর উপর রাগ করা মিছে । সে ভালোও নয়, মন্দও নয় । যেটা হয় সেটা হয়, তার বিরুদ্ধে যাও তো হওয়ারই বিরুদ্ধে যাবে । নন্দিনী । এই যদি মানুষের হওয়ার রাস্ত হয়, তা হলে চাই নে আমি হওয়া- আমি ঐ ছায়াদের সঙ্গে চলে যাব, আমাকে রাস্তা দেখিয়ে দাও । অধ্যাপক । রাস্তা দেখাবার দিন এলে এরাই দেখাবে, তার আগে রাস্তা বলে কোনো বালাই নেই।