পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫৭৮

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


(GV রবীন্দ্র-রচনাবলী হাত মুক্ত হয়েছে- তীদের নেবার শক্তি এবং দেবার শক্তি পূর্ণতালাভ করেছে- তারা কেবলমাত্র চলেন তা নয়, তারা কর্তা, তঁরা সৃষ্টিকর্তা । r যে সৃষ্টিকর্তা সে আপনাকে সর্জন করে ; আপনাকে ত্যাগ করেই সে সৃষ্টি করে। এই ত্যাগের শক্তিই হচ্ছে সকলের চেয়ে বড়ো শক্তি । এই ত্যাগের শক্তির দ্বারাই মানুষ বড়ো হয়ে উঠেছে। যে পরিমাণেই সে আপনাকে ত্যাগ করতে পেরেছে সেই পরিমাণেই সে লাভ করেছে। এই ত্যাগের শক্তিই সৃষ্টিশক্তি । এই সৃষ্টিশক্তিই ঈশ্বরের ঐশ্বর্য। তিনি বন্ধনহীন বলেই আনন্দে আপনাকে নিত্যকাল ত্যাগ করেন। এই ত্যাগই র্তার সৃষ্টি ; আমাদের চিত্ত যে পরিমাণে স্বর্থবর্জিত হয়ে মুক্ত আনন্দে তীর সঙ্গে যোগ দেয়, সেই পরিমাণে সেও সৃষ্টি করে, সেই পরিমাণেই তার চিন্তা, তার কর্ম সৃষ্ট হয়ে ওঠে। র্যারা সংসার থেকে উচ্চ হয়ে উঠে ব্ৰহ্মের মধ্যে মাথা তুলে সঞ্চারণ করতে শিখেছেন, তাদের এই ত্যাগের শক্তিই মুক্তিলাভ করেছে। এই আসক্তিবন্ধনহীন আত্মত্যাগের অব্যাহত শক্তি দ্বারাই আধ্যাত্মিকলোকে তারা শ্রেষ্ঠ অধিকার লাভ করেন । এই অধিকারের জোরে সর্বত্রই তারা রাজা । এই অধিকারই মানুষের পরম অধিকার । এই অধিকারের মধ্যেই মানুষের চরম স্থিতি । এইখানে মানুষকে ‘পারি না বললে চলবে না ; চিরজীবন সাধনা করেও এই চরম গতি তাকে লাভ করতে হবে, নইলে সে যদি সমস্ত পৃথিবীরও সম্রাট হয় তবু তার মহতী বিনষ্টিঃ । যে ব্ৰহ্মের শক্তি আমার অন্তরে বাহিরে সর্বত্রই নিজেকে উৎসর্জন করছে, যিনি “আত্মদা, আমি জলে-স্থলে-আকাশে সুখে-দুঃখে সর্বত্র সকল অবস্থায় তঁর মধ্যেই আছি, এই চেতনাকে প্রতিদিনের চেষ্টায় সহজ করে তুলতে হবে। এই সাধনার ধ্যানই হচ্ছে গায়ত্রী । এই সাধনাই হচ্ছে তার মধ্যে দাড়াতে এবং চলতে শেখা। অনেকবার টলতে হবে, বার বার পড়তে হবে, কিন্তু তাই বলে ভয় করলে হবে না। তবে বুঝি পারব না' ! পারবই, নিশ্চয়ই পারব । কেননা অস্তরের মধ্যে এই দিকেই মানুষের একটা প্রেরণা আছে— এইজন্যে মানুষ দুঃসাধ্যতাকে ভয় করে না, তাকে বরণ করে নেয়- এইজন্যেই মানুষ এতবড়ো একটা আশ্চর্য কথা বলে জগতের অন্য-সকল প্রাণীর চেয়ে বড়ো হয়ে উঠেছে, ভূমৈব সুখং নাৱে সুখমস্তি । জন্মোৎসব বক্তার জন্মদিনে বোলপুর ব্রহ্মবিদ্যালয়ের বালকদিগের নিকট কথিত আজ আমার জন্মদিনে তোমরা উৎসব করে আমাকে আহবান করেছ— এতে আমার অনেকদিনের স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলেছে। জন্মদিনে বিশেষভাবে নিজের জীবনের প্রতি দৃষ্টি করবার কথা অনেকদিন আমার মনে জাগে নি । কত ২৫শে বৈশাখ চলে গিয়েছে, তারা অন্য তারিখের চেয়ে নিজেকে কিছুমাত্র বড়ো করে আমার কাছে প্রকাশ করে নি । 轴 বস্তুত, নিজের জন্মদিন বৎসরের অন্য ৩৬৪ দিনের চেয়ে নিজের কাছে কিছুমাত্র বড়ো নয়। যদি অন্যের কাছে তার মূল্য থাকে। তবেই তার মূল্য। যেদিন আমরা এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছিলুম, সেদিন নুতন অতিথিকে নিয়ে যে উৎসব হয়েছিল, সে আমাদের নিজের উৎসব নয় । অজ্ঞাত গোপনতার মধ্য থেকে আমাদের সদ্য আবির্ভাবকে র্যারা একটি পরমলাভ বলে মনে করেছিলেন, উৎসব তাদেরই। আনন্দলোক থেকে একটি আনন্দ-উপহার পেয়ে তারা আত্মার আত্মীয়তার ক্ষেত্ৰকে বড়ো করে উপলব্ধি করেছিলেন, তাই তঁদের উৎসব। এই উপলব্ধি চিরকাল সকলের কাছে সমান নবীন থাকে না । অতিথি ক্রমে পুরাতন হয়ে আসেসংসারে তার আবির্ভাব-যে পরমরহস্যময় এবং সে-যে চিরদিন এখানে থাকবে না, সে কথা ভুলে যেতে হয় । বৎসরের পর বৎসর সমভাবেই প্রায় চলে যেতে থাকে- মনে হয়, তার ক্ষতিও নেই বৃদ্ধিও নেই, সে