পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫৯৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন ¢ዓ S মাতৃশ্ৰাদ্ধ আমি কোনো ইংরেজি বইয়ে পড়েছি যে, ঈশ্বরকে যে পিতা বলা হয়ে থাকে, সে একটা রূপকমাত্র । অর্থাৎ পৃথিবীতে পিতার সঙ্গে সন্তানের যে রক্ষণপালনের সম্বন্ধ, ঈশ্বরের সঙ্গে জীবের সেই সম্বন্ধ আছে বলেই এই সাদৃশ্য অবলম্বনে তঁাকে পিতা বলা হয়। কিন্তু এ কথা আমরা মানি নে । আমরা তাকে রূপকের ভাষায় পিতা বলি নে । আমরা বলি পিতামাতার মধ্যে তিনিই সত্য পিতা মাতা। তিনিই আমাদের অনন্ত পিতামাতা, সেইজন্যেই মানুষ তার পৃথিবীর পিতামাতাকে চিরকাল পেয়ে আসছে। মানুষ যে পিতৃহীন হয়ে মাতৃহীন হয়ে পৃথিবীতে আসে না তার একমাত্র কারণ, বিশ্বের অনন্ত পিতামাতা চিরদিন মানুষের পিতামাতার মধ্যে আপনাকে প্ৰকাশ করে আসছেন । পিতার মধ্যে পিতাররূপে যে-সত্য সে তিনি, মাতার মধ্যে মাতারূপে যে-সত্য সে তিনি । পিতামাতাকে যদি প্রাকৃতিক দিক থেকে দেখাই সত্য দেখা হত, অর্থাৎ আমাদের মর্তজীবনের প্রাকৃতিক কারণমাত্র যদি তারা হতেন, তা হলে এই পিতামাতা সম্ভাষণকে আমরা ভুলেও অনন্তের সঙ্গে জড়িত করতুম না । কিন্তু মানুষ পিতামাতার মধ্যে প্রাকৃতিক কারণের চেয়ে ঢের বড়ো জিনিসকে অনুভব করেছেপিতামাতার মধ্যে এমন একটি পদার্থের পরিচয় পেয়েছে যা অন্তহীন, যা চিরন্তন, যা বিশেষ পিতামাতার সমস্ত ব্যক্তিগত সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে ; পিতামাতার মধ্যে এমন একটা কিছু পেয়েছে যাতে দাড়িয়ে উঠে চন্দ্ৰসূৰ্যগ্ৰহতারাকে যিনি অনাদি-অনন্তকাল নিয়মিত করছেন, সেই পরম শক্তিকে সম্বোধন করে বলে উঠেছে ; পিতা নোহসি- তুমি আমাদের পিতা । এ কথা যে নিতান্তই হাস্যকর প্রলাপবাক্য এবং স্পর্ধার কথা হত। যদি এ কেবলমাত্রই র্যাপক হত । কিন্তু মানুষ এক জায়গায় পিতামাতাকে বিশেষভাবে অনন্তের মধ্যে দেখেছে এবং অনন্তকে বিশেষভাবে পিতামাতার মধ্যে দেখেছে, সেইজন্যেই এমন দৃঢ়কণ্ঠে এতবড়ো অভিমানের সঙ্গে বলতে পেরেছে ‘পিতা নোহসি । মানুষ পিতামাতার মধ্য থেকে যে-অমৃতের ধারা লাভ করেছে সেইটেকে অনুসরণ করতে গিয়ে দেখেছে কোথাও তার সীমা নেই, দেখেছে যেখান থেকে সূর্যনক্ষত্র তাদের নিঃশেষহীন আলোক পাচ্ছে, জীবজন্তু যেখান থেকে অবসানহীন প্ৰাণের স্রোতে ভেসে চলে আজ পর্যন্ত কোনো শেষে গিয়ে পৌঁছল না, সেই জগতের অনাদি আদিপ্রস্রবণ হতেই ঐ অমৃতধারা প্রবাহিত হয়ে আসছে ; অনন্ত ঐখানে আমাদের কাছে যেমনি ধরা পড়ে গেছেন, অমনি আমরা সেই দিকেই মুখ তুলে বলে উঠেছি “পিতা নোেহাঁসি- বলেছি, “যাকেই পিতা বলে ডাকি-না কেন, তুমিই আমাদের পিতা । “তুমি যে আমাদেরই অনন্তকে এমন কথা বলতে শিখলুম। এইখান থেকেই। “তোমার বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডে অসংখ্য কারবার নিয়ে তুমি আছ, সে কথা ভাবতে গেলেও ভয়ে মরি- কিন্তু ধরা পড়ে গেছ। এইখানেইদেখেছি তোমাকে পিতার মধ্যে, দেখেছি তোমাকে মাতার মধ্যে- তাই তুমি যত বড়েই হও-না কেন, পৃথিবীর এই এক কোণে দাড়িয়ে বলেছি : তুমি আমাদের পিতা । পিতা নোহসি। আমাদের তুমি আমাদের। আমার তুমি আমার ।” এমন করে যদি তাকে না পেতুম তবে তাকে খুঁজতে যৌতুম কোন রাস্তায় ? সে রাস্তার অন্ত-পেতুম কবে এবং কোনখানে ? যত দূরেই যৌতুম তিনি দূরেই থেকে যেতেন। কেবল তাকে অনির্বচনীয় বলতুম, অগম্য অপাের বলতুম | কিন্তু সেই অনির্বচনীয় অগম্য অপাের তিনিই আমার পিতা, আমার মাতা, তিনিই আমার- মানুষকে এই একটি অদ্ভুত কথা তিনি বলিয়েছেন। অনধিগম্য, এক মুহুর্তে এত আশ্চর্য সহজ হয়েছেন। একেবারে আমাদের মানবজন্মের প্রথম মুহুর্তেই। মারি কোলে মানুষের জন্ম, এইটেই মানুষের মন্ত কথা এবং প্রথম কথা । জীবনের প্রথম মুহুর্তেই তার অধিকারের আর অন্ত নেই ; তার জন্যে প্রাণ দিতে পারে এতবড়ো স্নেহ তার জন্যে অপেক্ষা করে আছে, জগতে এত তার মূল্য । এ মূল্য তাকে উপার্জন করতে হয় নি, এ মূল্য সে একেবারেই পেয়েছে। মাতাই শিশুকে জানিয়ে দিলে, বিশাল বিশ্বজগৎ তার আত্মীয়, নইলে মাতা তার আপনি হত না । মাতাই