পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫৯৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন (ሱ ዒ¢ কেননা সেই ত্যাগ বলতে তো রিক্ততা বোঝায় না। পাকা ফলের ডাল ছেড়ে মাটিতে পড়াকে তো ব্যৰ্থতা বলতে পারি। নে । মাটিতে তার চেষ্টার আকার এবং ক্ষেত্র-পরিবর্তন হয়, সেখানে সে নিশ্চেষ্টতার মধ্যে পলায়ন করে না। সেখানে বৃহত্তর জন্মের উদ্যোগপর্ব, সেখানে অজ্ঞাতবাসের পালা। সেখানে বাহির হতে ভিতরে প্রবেশ । আমাদের দেশে বলে : পঞ্চাশোধৰ্ব্বং বনং ব্ৰজেৎ । কিন্তু সে বন তো আলস্যের বন নয়, সে-যে তপোবন । সেখানে মানুষের এতকালের সঞ্চায়ের চেষ্টা দানের চেষ্টার ক্ষেত্রে প্রবেশ করে । করার আদর্শ মানুষের একমাত্র আদর্শ নয়, হওয়ার আদর্শই খুব বড়ো জিনিস। ধানের গাছ যখন রৌদ্রবৃষ্টির সঙ্গে সংগ্ৰাম করতে করতে বাড়ছিল। সে খুব সুন্দর, কিন্তু ফসল ফলে যখন তার মাঠের দিন শেষ হয়ে ঘরের দিন আরম্ভ হয় তখন সেও সুন্দর। সেই ফসলের মধ্যে ধানখেতের সমস্ত রৌদ্রবৃষ্টির ইতিহাস নিবিড়ভাবে নিস্তব্ধ হয়ে আছে বলে কি তার কোনো অগীেরব আছে ? মানুষের জীবনকেও কেবল তার খেতের মধ্যেই দেখব, তার ফসলের মধ্যে দেখব না, এমন পণ করলে সে জীবনকে নষ্টই করা হয় । তাই বলছি, মানুষের জীবনে এমন একটি সময় আসে যখন তার থামার সময় । মানুষের কাজের সময়ে আমরা মানুষের কাছ থেকে যে জিনিসটা আদায় করি, তার থামার সময়েও আমরা যদি সেই জিনিসটাই দাবি করি, তা হলে কেবল যে অন্যায় করা হয় তা নয়, নিজেকে বঞ্চিত করাই হয় । থামার সময় মানুষের কাছে আমরা যেটা দাবি করতে পারি, সেটা করার আদর্শ নয়- সেটা হওয়ার আদর্শ । যখন সমস্তই কেবল চলছে, কেবলই ভাঙাগড়া এবং ওঠাপড়া, তখন সেই হওয়ার আদশটিকে সম্পূর্ণভাবে স্থিরভাবে আমরা দেখতে পাই নে— যখন চলা শেষ হয় তখন হওয়াকে আমরা দেখতে পাই । মানুষের এই সমাপ্ত ভাবটি, এই স্থিররূপটি দেখারও প্রয়োজন আছে। খেতের চারা এবং গোলার ধান আমাদের দুইই চাই । কেজো লোকেরা কাজকেই একমাত্র লাভ বলে মনে করে- এইজন্য মানুষের কাছ থেকে তার অন্তিমকাল পর্যন্ত কেবল কাজ আদায় করবারই চেষ্টা করে । যে সমাজে যেরকম দাবি সেই দাবি অনুসারেই মানুষের মূল্য । যেখানে সমাজ যুদ্ধ দাবি করে সেখানে যোদ্ধারই মূল্য বেশি, সুতরাং সকলেই আর-সমস্ত চেষ্টাকে সংহরণ করে যোদ্ধা হবার জন্যেই প্ৰাণপণে চেষ্টা করে । যেখানে কাজের দাবি অতিমাত্র, সেখানে অন্তিম মুহুর্ত পর্যন্ত কেজো ভাবেই আপনাকে প্রচার করার দিকে মানুষের একান্ত প্ৰয়াস । সেখানে মানুষের দাড়ি নেই বললেই হয়, সেখানে কেবলই অসমাপিকা ক্রিয়া । সেখানে মানুষ যে জায়গায় থামে সে জায়গায় কিছুই পায় না, কেবল লজ্জা পায় ; সেখানে কাজ একটা মদের মতো, ফুরোলেই অবসাদ ; সেখানে স্তব্ধতার মধ্যে মানুষের কোনো বৃহৎ ব্যঞ্জনা নেই ; সেখানে মৃত্যুর রূপ অত্যন্তই শূন্য এবং বিভীষিকাময় এবং জীবন সেখানে নিরস্তর মথিত, ক্ষুব্ধ, পীড়িত ও শতসহস্ৰ কলের কৃত্রিম তাড়নায় গতিপ্ৰাপ্ত । সামঞ্জস্য এই বিশ্বচরাচরে আমরা বিশ্বকবির যে লীলা চারিদিকেই দেখতে পাচ্ছি। সে হচ্ছে সামঞ্জস্যের লীলা । সুর, সে যত কঠিন সুরই হােক, কোথাও ভ্ৰষ্ট হচ্ছে না ; তাল, সে যত দুরূহ। তালই হােক, কোনো জায়গায় তার শ্বলনমাত্র নেই। চারি দিকেই গতি এবং স্মৃর্তি, স্পন্দন এবং নর্তন, অথচ সর্বত্রই অপ্ৰমত্ততা । পৃথিবী প্রতি মুহুর্তে প্রবলবেগে সূর্যকে প্ৰদক্ষিণ করছে, সূৰ্য প্রতি মুহুর্তে প্রবলবেগে কোনো-এক অপরিজ্ঞাত লক্ষ্যের অভিমুখে ছুটে চলেছে, কিন্তু আমাদের মনে ভাবনামাত্র নেই- আমরা সকালবেলায় নিৰ্ভয়ে জেগে উঠে তুচ্ছতম কাজটুকুও সম্পন্ন করবার জন্যে মনোযোগ করি এবং রাত্রে এ কথা নিশ্চয় জেনে শুতে যাই brivo)