পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬০০

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


(?ዒbr রবীন্দ্র-রচনাবলী কোনোপ্রকার সম্বন্ধ হতেই পারে না ; এ অবস্থায় ব্ৰহ্মজ্ঞান-নামক পদার্থটাতে জ্ঞানই সমস্ত, ব্ৰহ্ম কিছুই নয় বললেই হয় । একদিন নিরর্থক কৰ্মই চূড়ান্ত ছিল ; জ্ঞান ও হৃদাবৃত্তিকেসে লক্ষ্যই করে নি, তার পরে যখন জ্ঞান বড়ো হয়ে উঠল তখন সে আপনার অধিকার থেকে হৃদয় ও কর্ম উভয়কে নির্বাসিত করে দিয়ে নিরতিশয় বিশুদ্ধ হয়ে থাকবার চেষ্টা করলে । তার পরে ভক্তি যখন মাথা তুলে দাড়ালো তখন সে জ্ঞানকে পায়ের তলায় চেপে ও কর্মকে রসের স্রোতে ভাসিয়ে দিয়ে একমাত্র নিজেই মানুষের পরম স্থানটি সম্পূর্ণ জুড়ে বসল, দেবতাকেও সে আপনার চেয়ে ছোটাে করে দিলে, এমন-কি, ভাবের আবেগকে মথিত করে তোেলবার জন্যে বাহিরে কৃত্রিম উত্তেজনার বাহ্যিক উপকরণগুলিকেও আধ্যাত্মিক সাধনার অঙ্গ করে নিলে । এইরূপ গুরুতর আত্মবিচ্ছেদের উচ্ছঙ্খলতার মধ্যে মানুষ চিরদিন বাস করতে পারে না । এই অবস্থায় মানুষ কেবল কিছুকাল পর্যন্ত নিজের প্রকৃতির একাংশের তৃপ্তিসাধনের নেশায় বিহ্বল হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু তার সর্বাংশের ক্ষুধা একদিন না জেগে উঠে থাকতে পারে না । সেই পূর্ণ মনুষ্যত্বের সর্বাঙ্গণ আকাঙক্ষাকে বহন করে এ দেশে রামমোহন রায়ের আবির্ভাব হয়েছিল। ভারতবর্ষে তিনি যে কোনো নূতন ধর্মের সৃষ্টি করেছিলেন তা নয় ; ভারতবর্ষে যেখানে ধর্মের মধ্যে পরিপূর্ণতার রূপ চিরদিনই ছিল, যেখানে বৃহৎ সামঞ্জস্য, সেখানে শান্তংশিবমদ্বৈতম, সেইখানকার সিংহদ্বার তিনি সর্বসাধারণের কাছে উদঘাটিত করে দিয়েছিলেন । সত্যের এই পরিপূর্ণতাকে, এই সামঞ্জস্যকে পাবার ক্ষুধা যে কিরকম প্রবল, এবং তাকে আপনার মধ্যে কিরকম করে গ্রহণ ও ব্যক্ত করতে হয়, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সমস্ত জীবনে সেইটেই প্ৰকাশ হয়েছে । তীর স্নেহময়ী দিদিমার মৃত্যুশোকের আঘাতে মহৰ্ষির ধর্মজীবন প্রথম জাগ্রত হয়ে উঠেই যে-ফুধার কান্না কেঁদোছে, তার মধ্যে একটি বিস্ময়কর বিশেষত্ব আছে । শিশু যখন খেলবার জন্যে কঁদে তখন হাতের কাছে যে-কোনো একটা খেলনা পাওয়া যায়। তাই দিয়েই তাকে ভুলিয়ে রাখা সহজ, কিন্তু সে যখন মাতৃস্তন্যের জন্য কঁদে তখন তাকে আর-কিছু দিয়েই ভোলাবার উপায় নেই। যে-লোক নিজের বিশেষ একটা হৃদয়া বেগকে কোনো একটা কিছুতে প্রয়োগ করবার ক্ষেত্ৰমাত্ৰ চায়, তাকে থামিয়ে রাখবার জিনিস জগতে অনেক আছে- কিন্তু কেবলমাত্র ভাবসম্ভোগ যার লক্ষ্য নয়, যে সত্য চায়, সে তো ভুলতে চায় না, সে পেতে চায় । কাজেই, সত্য কোথায় পাওয়া যাবে এই সন্ধানে তাকে সাধনার পথে বেরোতেই হবে- তাতে বাধা আছে, দুঃখ আছে, তাতে বিলম্ব ঘটে, তাতে আত্মীয়েরা বিরোধী হয়, সমাজের কাছ থেকে আঘাত বৰ্ষিত হতে থাকে- কিন্তু উপায় নেই, তাকে সমস্তই স্বীকার করতে হয় । এই-যে সত্যকে পাবার ইচ্ছা এ কেবল জিজ্ঞাসা মাত্র নয়, কেবল জ্ঞানে পাবার ইচ্ছা নয়, এর মধ্যে হৃদয়ের দুঃসহ ব্যাকুলতা আছে- তীব্র ছিল সত্যকে কেবল জ্ঞানরূপে নয়, আনন্দরূপে পাবার বেদনা। এইখানে তার প্রকৃতি স্বভাবতই একটি সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যকে চাচ্ছিল। আমাদের দেশে এক সময়ে বলেছিল ব্ৰহ্মসাধনার ক্ষেত্রে ভক্তির স্থান নেই এবং ভক্তিসাধনার ক্ষেত্রে ব্রহ্মের স্থান নেই, কিন্তু মহর্ষি ব্ৰহ্মকে চেয়েছিলেন জ্ঞানে এবং ভক্তিতে, অর্থাৎ সমস্ত প্রকৃতি দিয়ে সম্পূর্ণ করে তঁাকে চেয়েছিলেন- এইজন্যে ক্ৰমাগত নানা কষ্ট নানা চেষ্টা নানা গ্ৰহণবর্জনের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে যতক্ষণ তীর চিত্ত র্তার অমৃতময় ব্ৰহ্মে, তার আনন্দের ব্রহ্মে গিয়ে না ঠেকেছিল ততক্ষণ এক মুহুর্ত তিনি থামতে পারেন নি । এই কারণে তার জীবনে ব্ৰহ্মজ্ঞান একটি বিশেষত্ব লাভ করেছিল এই যে, সে জ্ঞানকে সর্বসাধারণের काछ मां थल डिनि कांड श्न नेि । জ্ঞানীর ব্ৰহ্মজ্ঞান কেবল জ্ঞানীর গণ্ডির মধ্যেই বদ্ধ থাকে । সেইজন্যেই এ দেশের লোকে অনেক সময়েই বলে থাকে, ব্ৰহ্মজ্ঞানের আবার প্রচার কী । কিন্তু ব্ৰহ্মকে যিনি হৃদয়ের দ্বারা উপলব্ধি করেছেন তিনি এ কথা বুঝেছেন- ব্ৰহ্মকে পাওয়া যায়, হৃদয়ের মধ্যে প্ৰত্যক্ষ পাওয়া যায়- শুধু জ্ঞানে জানা যায় তা নয়, রসে পাওয়া যায়, কেননা সমস্ত রসের সার তিনি ; রিসো বৈ সৈঃ । যিনি হৃদয় দিয়ে ব্ৰহ্মকে পেয়েছেন, তিনি উপনিষদের এই মহাবাক্যের অর্থ বুঝেছেন- যতো বাচো নিবর্তন্তে অপ্ৰাপ্য মনসা সহ আনন্দং ব্ৰহ্মণো বিদ্বানান বিভৌতি কুতশচন ।