পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬১৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন s\ তাই বলছিলুম কর্মকে ত্যাগ করা নয়, কিন্তু আমাদের প্রতিদিনের কর্মকেই চিরদিনের সুরে ক্রমশ বেঁধে তোেলবার সাধনাই হচ্ছে সত্যের সাধনা, ধর্মের সাধনা। এই সাধনারই মন্ত্র হচ্ছে: যদযৎ কর্ম প্ৰকুবীত তদব্ৰহ্মণি সমৰ্পয়েৎ । যে যে কর্মকরবে। সমস্তই ব্ৰহ্মাকে সমৰ্পণ করবে। অর্থাৎ, সমস্ত কর্মের দ্বারা আত্মা আপনাকে ব্ৰহ্মে নিবেদন করতে থাকবে । অনন্তের কাছে নিত্য এই নিবেদন করাই আত্মার গান, এই হচ্ছে আত্মার মুক্তি । তখন কী আনন্দ যখন সকল কর্মই ব্ৰহ্মের সঙ্গে যোগের পথ, কর্ম যখন আমাদের নিজের প্ৰবৃত্তির কাছেই ফিরে ফিরে না আসে, কর্মে যখন আমাদের আত্মসমৰ্পণ প্রতিদিন একান্ত হয়ে ওঠে- সেই পূর্ণতা, সেই মুক্তি, সেই স্বৰ্গ- তখন সংসােরই তো আনন্দনিকেতন। কর্মের মধ্যে মানুষের এই-যে বিরাট আত্মপ্ৰকাশ, অনন্তের কাছে তার এই-যে নিরন্তর আত্মনিবেদন, ঘরের কোণে বসে একে কে অবজ্ঞা করতে চায় ! সমস্ত মানুষে মিলে রৌদ্রে বৃষ্টিতে দাড়িয়ে কালে কালে মানবমহােষ্মের যে অভ্ৰভেদী মন্দির রচনা করছে কে মনে করে সেই সুমহৎ সৃষ্টিব্যাপার থেকে সুদূরে পালিয়ে গিয়ে নিভৃতে বসে আপনার মনে কোনো-একটা ভােবরসসম্ভোগই মানুষের সঙ্গে ভগবানের মিলন, এবং সেই সাধনাই ধর্মের চরম সাধনা ! ওরে উদাসীন, ওরে আপনার মাদকতায় বিভোর বিহবল সন্ন্যাসী, এখনই শুনতে কি পােচ্ছ না। ইতিহাসের সুদূরপ্রসারিত ক্ষেত্রে মনুষ্যত্বের প্রশস্ত রাজপথে মানবাত্মা চলেছে, চলেছে মেঘমন্দ্রগর্জনে আপনার কর্মের বিজয়রন্থে, চলেছে বিশ্বের মধ্যে আপনার অধিকারকে বিস্তীর্ণ করতে । তার সেই আকাশে আন্দোলিত জয়পতাকার সম্মুখে পর্বতের প্রস্তররাশি বিদীর্ণ হয়ে গিয়ে পথ ছেড়ে দিচ্ছে, বন-জঙ্গলের ঘনছায়াচ্ছন্ন জটিল চক্রান্ত সূর্যালোকের আঘাতে কুহেলিকার মতো তার সম্মুখে দেখতে দেখতে কোথায় অন্তর্ধন করছে ; অসুখ অস্বাস্থ্য অব্যবস্থা পদে পদে পিছিয়ে গিয়ে প্রতিদিন তাকে স্থান ছেড়ে দিচ্ছে ; অজ্ঞতার বাধাকে সে পরাভূত করছে, অন্ধতার অন্ধকারকে সে বিদীর্ণ করে ফেলছে । তার চারি দিকে দেখতে দেখতে শ্ৰীসম্পদ কাব্যকলা জ্ঞানধর্মের আনন্দলোক উদঘাটিত হয়ে যাচ্ছে। বিপুল ইতিহাসের দুৰ্গম দুরত্যয় পথে মানবাত্মার এই-যে বিজয়রথ অহােরাত্র পৃথিবীকে কম্পান্বিত করে চলেছে তুমি কি অসাড় হয়ে চোখ বুজে বলতে চাও তার কেউ সারথি নেই ? তাকে কেউ কোনো মহৎ সার্থকতার দিকে চালনা করে নিয়ে যাচ্ছে না ? এইখানেই, এই মহৎ সুখদুঃখ বিপৎসম্পদের পথেই কি রখীর সঙ্গে সারথির যথার্থ মিলন ঘটছে না ? রথ চলেছে, শ্রাবণের অমারাত্রির দুৰ্যোগও সেই সারথির অনিমেষ নেত্রকে আচ্ছন্ন করতে পারছে না, মধ্যাহ্নসূর্যের প্রখর আলোকেও তার ধ্রুবসৃষ্টি প্রতিহত হচ্ছে না ; আলোকে অন্ধকারে চলেছে। রথ, আলোকে অন্ধকারে মিলন রখীর সঙ্গে সেই সারথির- চলতে চলতে মিলন, পথের মধ্যে মিলন, উঠবার সময় মিলন, নামবার সময় মিলন, রাধীর সঙ্গে সারথির । ওরে, কে সেই নিত্য মিলনকে অগ্রাহ্য করতে চায় ! তিনি যেখানে চালাতে চান কে সেখানে চলতে চায় না ! কে বলতে চায় আমি মানুষের ইতিহাসের ক্ষেত্র থেকে সুদূরে পালিয়ে গিয়ে নিক্রিয়তার মধ্যে, নিশ্চেষ্টতার মধ্যে একলা পড়ে থেকে তার সঙ্গে মিলব । কে বলতে চায় এই সমস্তই মিথ্যা- এই বৃহৎ সংসার, এই নিত্যবিকাশমান মানুষের সভ্যতা, অন্তর-বাহিরের সমস্ত বাধাকে ভেদ করে আপনার সকল প্রকার শক্তিকে জয়যুক্ত করবার জন্যে মানুষের এই চিরদিনের চেষ্টা, এই পরমদুঃখের এবং পরমসুখের সাধনা । যে লোক এ-সমস্তকেই মিথ্যা বলে কত বড়ো মিথ্যা তার চিত্তকে আক্রমণ করেছে ! এত বড়ো বৃহৎ সংসারকে এত বড়ো ফাকি বলে যে মনে করে সে কি সত্যস্বরূপ ঈশ্বরকে সত্যই বিশ্বাস করে ! যে মনে করে পালিয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায় সে কবে তাকে পাবে, কোথায় তঁকে পাবে, পালিয়ে কত দূরে সে যাবে, পালাতে পালাতে একেবারে শূন্যতার মধ্যে গিয়ে পৌছবে এমন সাধ্য তার আছে কি ! তা নয়- ভীরু যে, পালাতে যে চায়, সে কোথাও তাকে পায় না । সাহস করে বলতে হবে এই যে তাকে পাচ্ছি এই—যে এখনই, এই-যে এখানেই । বার বার বলতে হবে। আমার প্ৰত্যেক কর্মের মধ্যে আমি যেমন আপনাকে পাচ্ছি। তেমনি আমার আপনার মধ্যে যিনি আপনি তাকে পাচ্ছি ; কর্মের মধ্যে আমার যা-কিছু বাধা, যা-কিছু বেসুর, যা-কিছু জড়তা, যা-কিছু অব্যবস্থা, সমস্তকেই আমার শক্তির দ্বারা সাধনার দ্বারা দূর করে দিয়ে এই কথাটি অসংকোচে বলবার অধিকারটি আমাদের লাভ করতে হবে যে, কমে আমার আনন্দ, সেই আনন্দেই আমার আনন্দময় বিরাজ করছেন । উপনিষদে ‘ব্রহ্মবিদাং বরিষ্ঠঃ' ব্ৰহ্মবিৎদের মধ্যে শ্ৰেষ্ঠ কাকে বলেছেন ? আত্মজীড়ঃ আত্মরতিঃ ক্রিয়াবান