পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬২৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন V9O) প্রার্থনা : রুদ্র যত্তে দক্ষিণং মুখং তেন মাং পাহি নিত্যম। হে রুদ্র, তোমার প্রসন্ন মুখের দ্বারা আমাকে নিয়ত রক্ষা করো। যেখানে সেই আবিষ্ণু’র আবির্ভাব সম্পূর্ণ নয়। সেখানে প্রসন্নতা নেই ; যে দেশে সেই আবিঃদ্র আবির্ভাব বাধাগ্ৰস্ত সেই দেশ থেকে প্ৰসন্নতা চলে গেছে ; যে গৃহে তার আবির্ভাব প্রতিহত সেখানে ধনধান্য থাকলেও শ্ৰী নেই ; যে চিত্তে তার প্রকাশ সমাচ্ছন্ন সে চিত্ত দীপ্তিহীন, প্ৰতিষ্ঠাহীন, সে কেবল স্রোতের শৈবালের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। এইজন্যে যে-কোনো প্রার্থনা নিয়েই মানুষ ঘুরে বেড়াক-না কেন, তার আসল প্রার্থনাটি হচ্ছে: আবিরাবীর্ম এধি। হে প্ৰকাশ, আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ সম্পূর্ণ হােক। এইজন্যে মানুষের সকল কান্নার মধ্যে বড়ো কান্না পাপের কান্না । সে যে আপনার সমস্তটাকে নিয়ে সেই পরম-একের সুরে মেলাতে পারছে না, সেই অমিলের বেসুর সেই পাপ তাকে আঘাত করছে। মানুষের নানা ভাগ নানা দিকে যখন বিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তার একটা অংশ যখন তার অন্য সকল অংশকে ছাড়িয়ে গিয়ে উৎপাতের আকার ধারণ করছে, তখন সে নিজেকে সেই পরম-একের শাসনে বিধূত দেখতে পাচ্ছে না ; তখন সেই বিচ্ছিন্নতার বেদনায় কেঁদে উঠে সে বলছে ; মা মা হিংসীঃ । আমাকে আর আঘাত কোরো না, আঘাত কোরো না । বিশ্বানি দেব সবিতরুদুরিতানি পরাসুব । আমার সমস্ত পাপ দূর করো, তোমার সঙ্গে আমার সমগ্রকে মিলিয়ে দাও- তা হলেই আমার আপনার মধ্যে আমার মিল হবে, সকলের মধ্যে আমার মিল হবে. আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ পরিপূর্ণ হবে, জীবনের মধ্যে সমস্ত রুদ্রতা প্ৰসন্নতায় দীপ্যমান হয়ে উঠবে । মানুষের নানা জাতি আজ নানা অবস্থার মধ্যে আছে, তাদের জ্ঞানবুদ্ধির বিকাশ এক রকমের নয় । তাদের ইতিহাস বিচিত্র, তাদের সভ্যতা ভিন্ন রকমের । কিন্তু, যে জাতি যেরকম পরিণতিই পাক-না কেন, সকলেই কোনো-না-কোনো আকারে আপনার চেয়ে বড়ো আপনাকে চাচ্ছে । এমন একটি বড়ো যা তার সমস্তকে আপনার মধ্যে অধিকার করে সমস্তকে বাধবে, জীবনকে অর্থদান করবে। যা সে পেয়েছে, যা তার প্ৰতিদিনের, যা নিয়ে তাকে ঘরকন্না করতে হচ্ছে, যা তার কেনা-বেচার সামগ্ৰী, তা নিয়ে তো তাকে থাকতেই হয় । সেইসঙ্গে, যা তার সমস্তের অতীত, যা তার দেখাশোনা খাওয়াপরার চেয়ে বেশি, যা নিজেকে অতিক্রম করবার দিকে তাকে টানে, যা তাকে দুঃসাধ্যের দিকে আহবান করে, যা তাকে ত্যাগ করতে বলে, যা তার পূজা গ্ৰহণ করে, মানুষ তাকেই আপনার মধ্যে উপলব্ধি করতে চাচ্ছে। তাকেই আপনার সমস্ত সুখদুঃখের চেয়ে বড়ো বলে স্বীকার করছে। কেননা, মানুষ জানছে মনুষ্যত্বের প্রকাশ সেই দিকেই ; তার প্রতিদিনের খাওয়া-পরা আরাম-বিরামের দিকে নয় । সেই দিকেই চেয়ে মানুষ দু হাত তুলে বলছে : আবিরাবীর্ম এধি । হে প্ৰকাশ, তুমি আমার মধ্যে প্রকাশিত হও । সেই দিকে চেয়েই মানুষ বুঝতে পারছে যে, তার মনুষ্যত্ব তার প্রতিদিনের তুচ্ছতার মধ্যে আচ্ছন্ন হয়ে আছে, তার প্রবৃত্তির আকর্ষণে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে, তাকে মুক্ত করতে হবে ; তাকে যুক্ত করতে হবে । সেই দিকে চেয়েই মানুষ এক দিকে আপনার দীনতা আর-এক দিকে আপনার সুমহৎ অধিকারকে প্রত্যক্ষ দেখতে পাচ্ছে এবং সেই দিকে চেয়েই মানুষের কণ্ঠ চিরদিন নানা ভাষায় ধ্বনিত হয়ে উঠছে ; আবিরাবীর্ম এধি। হে প্ৰকাশ, তুমি আমার মধ্যে প্রকাশিত হও । প্ৰকাশ চায়, মানুষ প্রকাশ চায় ; ভূমাকে আপনার মধ্যে দেখতে চায় ; তার পরম-আপনাকে আপনার মধ্যে পেতে চায়। এই প্ৰকাশ তার আহার-বিহারের চেয়ে বেশি, তার প্রাণের চেয়ে বেশি । এই প্রকাশই তার প্রাণের প্রাণ, তার মনের মন । এই প্ৰকাশই তার সমস্ত অস্তিত্বের পরমার্থ। মানুষের জীবনে এই ভুমার উপলব্ধিকে পূর্ণতর করবার জন্যেই পৃথিবীতে মহাপুরুষদের আবির্ভাব । মানুষের মধ্যে ভুমার প্রকাশ যে কী সেটা তারাই প্রকাশ করতে আসেন। এই প্রকাশ সর্বাঙ্গীণ রূপে কোনো ভক্তের মধ্যে ব্যক্ত হয়েছে এমন কথা বলতে পারি। নে । কিন্তু, মানুষের মধ্যে এই প্ৰকাশকে উত্তরোত্তর পরিপূর্ণ করে তোলাই তাদের কাজ। অসীমের মধ্যে সকল দিক দিয়ে মানুষের আত্মোপলব্ধিকে তারা অখণ্ড করে তোলবার পথ কেবলই সুগম করে দিচ্ছেন, সমস্ত গানটাকে তার সমস্ত তালে। লয়ে জাগাতে না পারলেও তারা মূল সুরটিকে কেবলই বিশুদ্ধ করে তুলছেন— সেই সুরটি তারা ধরিয়ে দিচ্ছেন। যিনি ভক্ত তিনি অসীমকে মানুষের মধ্যে ধরে মানুষের আপনি সামগ্ৰী করে তোলেন । আমরা আকাশে সমুদ্রে পর্বতে জ্যোতিষ্কলোকে, বিশ্বব্যাপী অমোঘ নিয়মতন্ত্রের মধ্যে, অসীমকে দেখি ; কিন্তু সেখানে আমরা