পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৩৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন VSS সমগ্রের মধ্যে সর্বতোভাবে সত্য হয়ে উঠতে পারে, সেই ব্ৰহ্মসাধনার পরিপূর্ণ মূর্তিকে ভারতবর্ষ বিশ্বজগতের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করবে। এই হচ্ছে ব্ৰাহ্মসমাজের ইতিহাস। ভারতবর্ষে এই ইতিহাসের আরম্ভ হয়েছে কোন সুদূর দুৰ্গম গুহার মধ্যে। এই ইতিহাসের ধারা কখনো দুই কূল ভাসিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, কখনো বালুকাস্তরের মধ্যে প্রচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছে, কিন্তু কখনােই শুষ্ক হয় নি। আজ আমরা ভারতবর্ষের মর্মেচ্ছসিত পেয়েছি— কিন্তু, তাই বলে যেন তাকে আমরা ছোটাে করে আমাদের সাম্প্রদায়িক গৃহস্থলির সামগ্ৰী করে না জানি । যেন বুঝতে পারি নিষ্কলঙ্কতুষারহুমুত এই পুণ্যস্রোত কোন গঙ্গোত্রীর নিভৃত কন্দর থেকে বিগলিত হয়ে পড়ছে এবং ভবিষ্যতের দিকপ্রান্তে কোন মহাসমুদ্র তাকে অভ্যর্থনা করে জলদমন্দ্রে মঙ্গলবাণী উচ্চারণ করছে। ভস্মরাশির মধ্যে যে প্ৰাণ নিশ্চেতন হয়ে আছে সেই প্ৰাণকে সঞ্জীবিত করবার এই ধারা । অতীতের সঙ্গে অনাগতকে অবিচ্ছিন্ন কল্যাণের সূত্রে এক করে দেবার এই ধারা । এবং বিশ্বজগতে জ্ঞান ও ভক্তির দুই তীরকে সুগভীর সুপবিত্র জীবনযোগে সম্মিলিত করে দিয়ে কর্মের ক্ষেত্রকে বিচিত্ৰ শস্যপর্যায়ে পরিপূর্ণরূপে সফল করে তোলাবার জন্যেই ভারতের অমৃত-কলমন্ত্র-কল্লোলিত এই উদার স্রোতস্বতী ।। ১২ মাঘ ১৩১৭ বৈশাখ ১৩১৮ S 8 সুন্দর পশ্চিম আকাশের পরে তখনো সূর্যাস্তের ধূসর আভা ছিল ; আমাদের আশ্রমে শালবনের মাথার উপরে সন্ধাবেলাকার নিস্তব্ধ শান্তি সমস্ত বাতাসকে গভীর করে তুলছিল। আমার হৃদয় একটি বৃহৎ সৌন্দর্যের আবির্ভাবে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল ! আমার কাছে বর্তমান মুহূর্ত তার সীমা হারিয়ে ফেলেছিল ; আজকেকার এই সন্ধ্যা কত যুগের সুদূর অতীতকালের সন্ধ্যার মধ্যে প্রসারিত হয়ে গিয়েছিল। ভারতবর্ষের ইতিহাসে যেদিন ঋষিদের আশ্রম সত্য ছিল, যেদিন প্রত্যহ সূর্যের উদয় এ দেশে তপোবনের পর তপোবনে পাখির কাকলি এবং সামগানকে জাগিয়ে তুলত, এবং দিনের অবসানে পাটলিবর্ণ নিঃশব্দ গোধূলি কত নদীর তীরে জীবন এবং গভীর সাধনার দিন আজকের শান্ত সন্ধ্যার আকাশে অত্যন্ত সত্যরূপে প্ৰত্যক্ষ হয়ে উঠেছিল । আমার এই কথা মনে হচ্ছিল, আর্যাবর্তের দিগন্তপ্রসারিত সমতল ভূমিতে সূর্যোদয়ে ও সূর্যাস্তে যে আশ্চর্য সৌন্দর্যের মহিমা প্ৰতিদিন প্ৰকাশিত হয় আমাদের আর্যপিতামহেরা তাকে একদিনও একবেলাও উপেক্ষা করেন নি । প্ৰাতঃসন্ধা ও সয়ংসন্ধ্যাকে তারা অচেতনে বিদায় দিতে পারেন নি । প্রত্যেক যোগী এবং প্ৰত্যেক গৃহী তাকে হৃদয়ের মধ্যে গ্ৰহণ করেছেন । কিন্তু, কেবল ভোগীর মতো নয়, ভাবুকের মতো নয়। সৌন্দর্যকে তারা পূজার মন্দিরে অভ্যর্থনা করে নিয়েছেন। সীেন্দর্যের মধ্যে যে আনন্দ প্রকাশ পায় তাকে তারা ভক্তির চক্ষে দেখেছেন ; সমস্ত চাঞ্চল্য দমন করে মনকে স্থির শান্ত করে। উষা ও সন্ধ্যাকে তঁরা অনন্তের ধ্যানের সঙ্গে মিলিত করে নিয়েছেন । আমার মনে হল, নদীসংগমে সমুদ্রতীরে পর্বতশিখরে যেখানে র্তারা প্ৰকৃতির সুন্দর প্রকাশকে বিশেষ করে দেখেছেন সেইখানেই তারা আপনার ভোগের উদ্যান রচনা করেন নি ; সেখানে তারা এমন একটি তীর্থস্থান স্থাপন করেছেন, এমন কোনো-একটি চিহ্ন রেখে দিয়েছেন, যাতে স্বভাবতই সেই সুন্দরের মধ্যে ভূমির সঙ্গে মানুষের মিলন হতে পারে। এই সুন্দরের মহান রূপকে সহজ দৃষ্টিতে যেন প্রত্যক্ষ করতে পারি, এই প্রার্থনাটি আমার মনের মধ্যে সেই সন্ধ্যার আকাশে জেগে উঠছিল । জগতের মধ্যে সুন্দরকে আপনার ভোগবৃত্তির দ্বারা অসত্য ও ছোটো না করে, ভক্তিবৃত্তির দ্বারা সত্য ও মহৎ করে যেন জানতে পারি। অর্থাৎ, কেবলই তাকে নিজের করে নেবার ব্যৰ্থ বাসনা ত্যাগ করে আপনাকেই তার কাছে দান করবার ইচ্ছা যেন আমার মনে স্বাভাবিক হয়ে *GŻ