পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৩৮

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


VeSVe রবীন্দ্র-রচনাবলী পাওয়া যায়। তাকে পাওয়াই আমাদের পাওয়া । নদী আপন গতিপথে দুই কুলে দিনরাত্রি নূতন নুতন ক্ষেত্ৰকে পেতে পেতে চলে ; সমুদ্রে যখন সে এসে পৌছয় তখন আর নূতন-নূতনকে পায় না, তখন তার দেবার পালা। তখন আপনাকে সে নিঃশেষ করে কেবল দিতেই থাকে । কিন্তু, আপনার সমস্তকে দিতে দিতে সে যে অন্তহীন পাওয়াকে পায় সেইটিই তো পরিপূর্ণ পাওয়া। তখন সে দেখে আপনাকে অহরহ রিক্ত করে দিয়েও কিছুতেই তার লোকসান আর হয় না । বস্তুত কেবলই আপনাকে ক্ষয় করে দেওয়াই অক্ষয়কে সত্যরূপে জানিবার প্রধান উপায় । যখন আপনার নানা জিনিস থাকে তখন আমরা মনে করি সেই থাকাতেই সমস্ত কিছু আছে, সে-সব ঘুচালেই একেবারে সব শূন্যময় হয়ে যাবে। সেইজন্যে আপনার দিকটা একেবারে উজাড় করে দিয়ে যখন তঁকে পূর্ণ দেখা যায়। তখন সেই দেখাই অভয় দেখা, সেই দেখাই সত্য দেখা । এইজনেই সংসারে ক্ষয় আছে, মৃত্যু আছে। যদি না থাকত। তবে অক্ষয়কে অমৃতকে কোন অবকাশ দিয়ে আমরা দেখতে পেতুম । তা হলে আমরা কেবল বস্তুর পর বস্তু, বিষয়ের পর বিষয়কেই একান্ত করে দেখতুম ; সত্যকে দেখতুম না । কিন্তু বিষয় কেবলই মেঘের মতো সরে যাচ্ছে, কুয়াশার মতো মিলিয়ে যাচ্ছে বলেই যিনি সরে যাচ্ছেন না, মিলিয়ে যাচ্ছেন না, তাকে আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাই আমি বলছি, আজ বর্ষশেষের এই রাত্ৰিতে তোমার বদ্ধ ঘরের জানলা থেকে জগতের সেই যাওয়ার পথটার দিকেই মুখ বাড়িয়ে একবার তাকিয়ে দেখো । কিছুই থাকছে না, সবই চলেছে, এইটিই লক্ষ্য করে । মন শান্ত করে হৃদয় শুদ্ধ করে এই দিকে দেখতে দেখতেই দেখবে- এই সমস্ত যাওয়া সার্থক হচ্ছে এমন একটি ‘থাকা স্থির হয়ে আছে । দেখতে পাবে বৃক্ষ ইব স্তব্ধো দিবি তিষ্ঠত্যেকঃ । সেই এক যিনি, তিনি অন্তরীক্ষে বৃক্ষের মতো স্তব্ধ হয়ে আছেন । জীবন যতই এগোচ্ছে ততই দেখতে পাচ্ছি। সেখানেও সেই এক যিনি, তিনি সমস্ত যাওয়া-আসার মধ্যে স্তব্ধ হয়ে আছেন । নিমেষে নিমেষে যা সরে গেছে, ঝরে গেছে, যা দিতে হয়েছে, তার হিসাব রাখতে কে পারে । তা অনেক, তা অসংখ্য । কিন্তু এই সমস্ত গিয়ে, সমস্ত দিয়ে, যাকে পাচ্ছি। তিনি এক । “গেছে গেছে। এ কথাটা যতই কেঁদে বলি-না কেন, তিনি আছেন, তিনি আছেন- এই কথাটাই সকল কান্না ছাপিয়ে জেগে উঠছে। সব গেছে। এই শোক যেখানে জাগছে সেখানে ভালো করে তাকাও, তিনি আছেন এই আচল আনন্দ সেখানে বিরাজমান । যেখানে যা-কিছু সমস্ত শেষ হয়ে যাচ্ছে সেই গভীর নিঃশেষতার মধ্যে আজ বর্ষশেষের দিনে মুখ তুলে তাকাও, দেখো : বৃক্ষ ইব স্তব্ধো দিবি তিষ্ঠত্যেকঃ । চিত্তকে নিস্তব্ধ করো ; বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডের সমস্ত গতি নিস্তব্ধ হয়ে যাবে, আকাশের চন্দ্ৰতারা স্থির হয়ে দাড়াবে, অণুপরমাণুর অবিরাম নৃত্য একেবারে থেমে যাবে। দেখবে বিশ্বজোড়া ক্ষয়মৃত্যু এক জায়গায় সমাপ্ত হয়ে গেছে । কলশব্দ নেই, চাঞ্চল্য নেই, সেখানে জন্ম-মরণ এই নিঃশব্দ সংগীতে বিলীন হয়ে রয়েছে ; বৃক্ষ ইব স্তব্ধো দিবি তিষ্ঠত্যেকঃ । আজ আমি আমার জীবনের দেওয়া এবং পাওয়ার মাঝখানের আসনটিতে বসে তার উপাসনা করতে এসেছি। এই জায়গাটিতে তিনি যে আজ আমাকে বসতে দিয়েছেন এজন্যে আমি আমার মানবজীবনকে ধন্য মনে করছি। তার যে বাহু গ্ৰহণ করে এবং তার যে বাহু দান করে এই দুই বাহুর মাঝখানটিতে তার যে বক্ষ, যে কোল, সেই বক্ষে, সেই কোলে আমি আমার জীবনকে অনুভব করছি। এক দিকে অনেককে হারিয়েও আর-এক দিকে এককে পাওয়া যায়। এই কথাটি জানিবার সুযোগ তিনি ঘটিয়েছেন । জীবনে যা চেয়েছি। এবং পাই নি, যা পেয়েছি। এবং চাই নি, যা দিয়ে আবার নিয়েছেন, সমস্তকেই আজ জীবনের দিব্যাবসানের পরম মাধুর্যের মধ্যে যখন দেখতে পাচ্ছি। তখন তাদের দুঃখবেদনার রূপ কোথায় চলে গেল ! আমার সমস্ত হারানো আজ আনন্দে ভরে উঠছে- কেননা, আমি যে দেখতে পাচ্ছি। তিনি রয়েছেন, তাকে ছাড়িয়ে কিছুই হয় নি- আমার যা-কিছু গেছে তাতে তাকে কিছুই কমিয়ে দিতে পারেনি, সমস্তই আপনাকে সরিয়ে তাকেই দেখাচ্ছে। সংসার আমার কিছুই নেয় নি, মৃত্যু আমার কিছুই নেয় নি, মহাশূন্য আমার কিছুই নেয় নি