পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৫৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন W) জীবনকে সত্য করতে না পারলে সেই অনন্ত সত্যের বোধকে পাব কেমন করে। নিজের নিষ্ঠুর স্বার্থকে ত্যাগ করতে না পারলে সেই অনন্ত করুণার বোধকে গ্ৰহণ করব কেমন করে । সত্যে মঙ্গলে দয়ায় সৌন্দর্যে আনন্দে নির্মলতায় ভরে রয়েছে, সমস্ত ঘন হয়ে ভরে রয়েছে- সেই তো আমার পিতা, সর্বত্র আমার পিতা । পিতা নোহসি, পিতা নোেহাঁসি- এই মন্ত্রের অক্ষরই সমস্ত আকাশে, এই মন্ত্রের ধবনিই জ্যোতির্ময় সুরসপ্তকের বিশ্বসংগীত । পিতা তুমি আছ, এই মন্ত্রই কত অসংখ্য রূপ ধরে লোকলোকান্তরে সমস্ত জীবকে কোলে করে নিয়ে সুখদুঃখের অবিরাম বৈচিত্র্যে সৃষ্টিকে প্ৰাণপরিপূর্ণ করে রয়েছে। অসীম চেতনজগতের মধ্যে নিয়ত উদবেলিত তোমার যে পিতার আনন্দ, যে আনন্দে তুমি আপনাকেই আপনি সস্তানের মধ্যে নিরীক্ষণ করে লীলা করছ, যে আনন্দে তুমি তােমার সন্তানের মধ্যে ছােটাে হয়ে নত হয়ে আসছ এবং তোমার সম্ভানকে তোমার মধ্যে বড়ো করে তুলে নিচ্ছ, সেই তোমার অপরিসীম পিতার আনন্দকেই সকলের চেয়ে সত্য করে, আপনার সকলের চেয়ে পরম সম্পদ করে বোধ করতে চাচ্ছে আমার অন্তরাত্মা- তবু সেই জায়গায় আমি কেবলই তার কাছে এনে দিচ্ছি। আমার অহংকে । সেই অহংকে কিছুতেই আমি তাড়াতে পারছি নে, তার কাছে আমার নিজের জোর আর কিছুতেই খাটে না, অনেক দিন হল তার হাতেই আমার সমস্ত কেল্লা আমি ছেড়ে দিয়ে বসে আছি । আমার সমস্ত অস্ত্র সেই নিয়েছে, আমার সমস্ত ধনের সেই অধিকারী । সেইজন্যেই তোমার কাছে আমার এই প্রার্থনা- পিতা নো বোধি । পিতা, এই বোধ তুমিই আমার মনে জাগাঁও । এই বোধটিকে একেবারে বাধাহীন করে লাভ করি যে, আমার অস্তিত্ব এ কেবলমাত্রই সন্তানের অস্তিত্ব, আমি তো আর কারও নই, আর কিছুই নই, তোমার সন্তান এই আমার একটিমাত্র সত্য ; এই সন্তানের অস্তিত্বকে ঘিরে ঘিরে অন্তরে বাহিরে যা-কিছু আছে। এ-সমস্তই পিতার আনন্দ ছাড়া আর কিছুই নয়- এই জল স্থল আকাশ, এই জন্মমৃত্যুর জীবনকাব্য, এই সুখদুঃখের সংসারলীলা, এ-সমস্তই সন্তানের জীবনকে আলিঙ্গন করে ধরছে । এইবার কেবল আমার দিকের দরকার আমার সমস্ত প্ৰাণটা পিতা বলে সাড়া দিয়ে উঠুক। উপরের ডাকের সঙ্গে নীচের ডাকটি মিলে যাক, আমার দিক থেকে কেবল এইটেই বাকি আছে । তোমার দিক থেকে একেবারে জগৎ ভরে উঠল ; তুমি আপনাকে দিয়ে আর শেষ করতে পারলে না- পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ একেবারে ছাপিয়ে পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু, তোমার এই এতবড়ো আকাশ-ভরা আত্মদান আমরা দেখতেই পাচ্ছি নে, গ্ৰহণ করতেই পারছি নে কিসের জন্যে। ঐ এতটুকু একটুখানি আমির জন্যে । সে যে সমস্ত অনন্তের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বলছে “আমি !! একবার একটুখানি থাম! একবার আমার জীবনের সব চেয়ে সত্য বলাটা বলতে দে, একবার সম্ভানজন্মের চরম ডাকটা ডাকতে দে ; পিতা নোহসি । পিতা পিতা পিতা, তুমি তুমি তুমি, কেবল এই কথাটা- অন্ধকারে আলোতে নিৰ্ভয়ে গলা খুলে কেবল : আছ, আছ, আছ । “আমি তার সমস্ত বোঝাসুদ্ধ একেবারে তলিয়ে যাক সেই অতলম্পর্শ সত্যে যেখানে তুমি তোমার সন্তানকে আপনার পরিপূর্ণ আনন্দে আবৃত করে জানছ ; তেমনি করে সন্তানকেও জানতে দাও তার পিতাকে । তোমার জানা এবং তার জানার মাঝখানকার বাধাটা একেবারে ঘুচে যাক ; তুমি যেমন করে আপনাকে দান করেছ তেমনি করে আমাকে গ্ৰহণ করে । নমস্তেহস্তু, তোমাকে যেন নমস্কার করতে পারি। এই আমার পিতার বোধ যখন জাগে তখন নমস্কারের মধুর রসে সমস্ত জীবন একেবারে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। সর্বত্র যখন পিতাকে পাই তখন সর্বত্র হৃদয় আনন্দে অবনত হয়ে পড়ে। তখন শুনতে পাই জগৎ-ব্ৰহ্মাণ্ডের গভীরতম মর্মকুহর হতে একটিমাত্র ধবনি অনন্তের মধ্যে নিশ্বসিত হয়ে উঠছে ; নমোনমঃ । লোকে লোকান্তরে ; নমোনমঃ । সুমধুর সুগভীর নমোনমঃ । তখন দেখতে পাই নমস্কারে নমস্কারে নক্ষত্রের সঙ্গে নক্ষত্র একটিমাত্র জায়গায় তাদের জ্যোতির্ময় ললাটকে মিলিত করেছে। সমস্ত বিশ্বের এই আশ্চৰ্য সুন্দর সামঞ্জস্য- যে সামঞ্জস্য কোথাও কিছুমাত্র ঔদ্ধত্যের দ্বারা সৃষ্টির বিচিত্র ছন্দকে একটুও আঘাত করছে না, আপনার অণুতে পরমাণুতে অনন্তের আনন্দকে সম্পূর্ণ মেনে নিচ্ছে। এই তো সেই নমস্কারের সংগীত, উর্ধের্ব অধোতে দিকে দিগন্তরে ; নমোনমঃ । এই সমস্ত বিশ্বের নমস্কারের সঙ্গে আমার চিত্ত যখন তার নমস্কারটিকেও এক করে দেয়, সে যখন আর পৃথক থাকতে পারে না, তখন সে চিরকালের মতো ধন্য হয় ; তখনই সে বুঝতে পারে, আমি বেঁচে গেলুম, আমি রক্ষা পেলুম । তখনই জগতের সমস্তের মধ্যেই সে আপনার পিতাকে পেলে; কোনো জায়গায়তার আর কোনো ভয় রইল না।