পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৮৪

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রবীন্দ্ৰ-রচনাবলী ܓܣܠܟܠ কেন, তাকে দেখি নে কেন । কেননা, সে যে কিছুর সঙ্গে স্বতন্ত্র হয়ে দেখা দেবার নয় । সমস্ত স্বতন্ত্রকে আপনার মধ্যে ধারণ করে সে যে এক হয়ে আছে । সে যদি হত “একটি, তা হলে তাকে নানা বস্তুর এক প্রান্তে কোনো একটা জায়গায় দেখতে পেতুম । কিন্তু সে যে হল ‘এক, তাই তাকে অনেকের অংশ করে বিশেষ করে দেখবার জো রইল না । এত বড়ো আবিষ্কার মানুষ আর কোনো দিন করেনি। এটি কোনো বিশেষ সামগ্ৰীীর আবিষ্কার নয়, এ হল মন্ত্রের আবিষ্কার । মন্ত্রের আবিষ্কারটি কী । বিজ্ঞানে যেমন অভিব্যক্তিবাদ- তাতে বলছে জগতে কোনো জিনিস। একেবারেই সম্পূর্ণ হয়ে শুরু হয় নি, সমস্তই ক্ৰমে ক্রমে ফুটে উঠছে। এই বৈজ্ঞানিক মন্ত্রটিকে মানুষ যতই সাধন ও মনন করছে ততই তার বিশ্ব-উপলব্ধি নানা দিকে বেড়ে চলেছে । মানুষের অনেক কথা আছে যাকে জানিবা মাত্রই তার জানার প্রয়োজনটি ফুরিয়ে যায়, তার পরে সে আর মনকে কোনো খোরাক দেয় না। রাত পোহলে সকাল হয়। এ কথা বার বার চিন্তা করে কোনো লাভ নেই। কিন্তু, যেগুলি মানুষের অমৃতবাণী সেইগুলিই হল তার মন্ত্র। যতই সেগুলি ব্যবহার করা যায় ততই তাদের প্রয়োজন আরো বেড়ে চলে। মানুষের সেইরকম একটি অমৃতমন্ত্র কোনো—এক শুভক্ষণে উচ্চারিত হয়েছিল : সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্ৰহ্ম । কিন্তু, মানুষ সত্যকে কোথায় বা অনুভব করলে। কোথাও কিছুই তো স্থির হয়ে নেই, দেখতে দেখতে এক আর হয়ে উঠছে । আজি আছে বীজ, কাল হল অফুর, অন্ধুর থেকে হল গাছ, গাছ থেকে অরণ্য । আবার সেই সমস্ত অরণ্য স্লেটের উপর ছেলের হাতে আঁকা হিজিবিজির মতো কতবার মাটির উপর থেকে মুছে মুছে যাচ্ছে। পাহাড়-পর্বতকে আমরা বলি ধ্রুব ; কিন্তু সেও যেন রঙ্গমঞ্চের পট, এক-এক অঙ্কের পর তাকে কোন নেপথ্যের মানুষ কোথায় যে গুটিয়ে তোলে দেখা যায় না। চন্দ্ৰ সূৰ্য তারাও যেন আলোকের বুদবুদের মতো অন্ধকার সমুদ্রের উপর ফুটে ফুটে ওঠে, আবার মিলিয়ে মিলিয়ে যায় । এইজন্যেই তো সমস্তকে বলি সংসার, আর সংসারকে বলি স্বপ্ন, বলি মায়া। সত্য। তবে কোনখানে । সত্যের তো প্ৰকাশ এমনি করেই, এই চিরাচঞ্চলতায় । নৃত্যের কোনো একটি ভঙ্গিও স্থির হয়ে থাকে না, কেবলই তা নানাখানা হয়ে উঠছে। তবু যে দেখছে সে আনন্দিত হয়ে বলছে “আমি নাচ দেখছি । নাচের সমস্ত অনিত্য ভঙ্গিই তালে মানে বাধা একটি নিরবচ্ছিন্ন সত্যকে প্ৰকাশ করছে । আমরা নাচের নানা ভঙ্গিকেই মুখ্য করে দেখছি নে ; আমরা দেখছি তার সেই সত্যটিকে, তাই খুশি হয়ে উঠছি। যে ভাঙা গাড়িটা রাস্তার ধারে অচল হয়ে পড়ে আছে সে আপনার জড়ত্বের গুণেই পড়ে থাকে ; কিন্তু যে গাড়ি চলছে তার সারথি, তার বাহন, তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, তার চলবার পথ, সমস্তেরই পরস্পরের মধ্যে একটি নিয়তপ্রবৃত্ত সামঞ্জস্য থাকা চাই, তবেই সে চলে। অর্থাৎ, তার দেশকালগত সমস্ত অংশপ্ৰত্যংশকে অধিকার করে, তাদের যুক্ত করে, তাদের অতিক্রম করে যদি সত্য না থাকে। তবে সে গাড়ি চলে না । যে ব্যক্তি বিশ্বসংসারে এই কেবলই বদল হওয়ার দিকেই নজর রেখেছে সেই মানুষই হয় বলছে “সমস্তই স্বপ্ন নয় বলছে “সমস্তই বিনাশের প্রতিরূপ- অতি ভীষণ । সে হয় বিশ্বকে ত্যাগ করবার জন্যে ব্যগ্র হয়েছে নয় ভীষণ বিশ্বের দেবতাকে দারুণ উপচারে খুশি করবার আয়োজন করছে । কিন্তু, যে লোক সমস্ত তরঙ্গের ভিতরকার ধারাটি, সমস্ত ভঙ্গির ভিতরকার নাচটি, সমস্ত সুরের ভিতরকার সংগীতটি দেখতে শুনতে পাচ্ছে সেই তো আনন্দের সঙ্গে বলে উঠছে সত্যং । সেই জানে, বৃহৎ ব্যাবসা যখন চলে তখনই বুঝি সেটা সত্য, মিথ্যা হলেই সে দেউলে হয়ে অচল হয়। মহাজনের মূলধনের যদি সত্য পরিচয় পেতে হয় তবে যখন তা খাটে তখনই তা সম্ভব । সংসারের সমস্ত-কিছু চলছে বলেই সমস্ত মিথ্যা, এটা হল একেবারেই উলটাে কথা। আসল কথা সত্য বলেই সমস্ত চলছে। তাই আমরা চারিদিকেই দেখছি সত্তা আপনাকে স্থির রাখতে পারছে না, সে আপনার কুল ছাপিয়ে দিয়ে অসীম বিকাশের পথে এগিয়ে চলেছে। এই সত্য পদার্থটি, যা সমস্তকে গ্ৰহণ করে অথচ সমস্তকে পেরিয়ে চলে, তাকে মানুষ বুঝতে পারলে কেমন করে । এ তো তর্ক করে বোঝবার জো ছিল না ; এ আমরা নিজের প্রাণের মধ্যেই যে একেবারে নিঃসংশয় করে দেখেছি । সত্যের রহস্য সব চেয়ে স্পষ্ট করে ধরা পড়ে গেছে তরুলতায় পশুপাখিতে । সত্য যে প্রাণস্বরূপ তা এই পৃথিবীর রোমাঞ্চর্যাপী ঘাসের পত্রে পত্রে লেখা হয়ে বেরিয়েছে। নিখিলের মধ্যে যদি