পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৭০০

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


\|A| রবীন্দ্ৰ-রচনাবলী ভেবে দেখো কত পিতামাতা তাদের একমাত্র ধনকে হারাচ্ছে, কত শ্ৰী স্বামীকে হারাচ্ছে, কত ভাই ভাইকে হারাচ্ছে। এইজন্যই তো পাপের আঘাত এত নিষ্ঠুর ; কারণ, যেখানে বেদনাবোধ সব চেয়ে বেশি, যেখানে শ্ৰীতি সব চেয়ে গভীর, পাপের আঘাত সেইখানেই যে গিয়ে বাজে । যার হৃদয় কঠিন সে তো বেদনা অনুভব করে না। কারণ, সে যদি বেদনা পেত। তবে পাপ এমন নিদারুণ হতেই পারত না । যার হৃদয় কোমল, যার প্ৰেম গভীর, তাকেই সমস্ত বেদনা বইতে হবে । এইজন্য যুদ্ধক্ষেত্রে বীরের রক্তপাত কঠিন নয়, সুপ্রিশ্ন দৃশ্চন্দ্র কঠিন নয়; কিন্তু ঘরের কােলে যে কণী অবিসর্জন করছে তারই আঘাত সব CD সেইজন্য এক-এক সময় মন এই কথা জিজ্ঞাসা করে : যেখানে পাপ সেখানে কেন শান্তি হয় না । সমস্ত বিশ্বে কেন পাপের বেদনা কম্পিত হয়ে ওঠে। কিন্তু এই কথা জেনো যে, মানুষের মধ্যে কোনো বিচ্ছেদ নেই, সমস্ত মানুষ যে এক । সেইজন্য পিতার পাপ পুত্রকে বহন করতে হয়, বন্ধুর পাপের জন্য বন্ধুকে প্ৰায়শ্চিত্ত করতে হয়, প্রবলের উৎপীড়ন দুর্বলকে সহ্য করতে হয় । মানুষের সমাজে একজনের পাপের ফলভোগ সকলকেই ভাগ করে নিতে হয় ; কারণ, অতীতে ভবিষ্যতে দূরে দূরান্তে হৃদয়ে হৃদয়ে মানুষ যে পরম্পরে গাথা হয়ে আছে । মানুষের এই ঐক্যবোধের মধ্যে যে গীেরব আছে তাকে ভুললে চলবে না। এইজন্যই আমাদের সকলকে দুঃখভোগ করবার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। তা না হলে প্ৰায়শ্চিত্ত হয় না ; সমস্ত মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত সকলকেই করতে হবে । যে হৃদয় শ্ৰীতিতে কোমল দুঃখের আগুন তাকেই আগে দগ্ধ করবে। তার চক্ষে নিদ্রা থাকবে না। সে চেয়ে দেখবে দুর্যোগের রাত্রে দূর দিগন্তে মশাল জ্বলে উঠছে, বেদনায় মেদিনী কম্পিত করে রুদ্র আসছেন ; সেই বেদনার আঘাতে তার হৃদয়ের সমস্ত নাউী ছিন্ন হয়ে যাবে । যার চিত্ততন্ত্রীতে আঘাত করলে সব চেয়ে বেশি বাজে পৃথিবীর সমস্ত বেদনা তাকেই সব চেয়ে বেশি করে বাজবে । তাই বলছি যে সমস্ত মানুষের সুখদুঃখকে এক করে যে-একটি পরম বেদন পরম প্ৰেম আছেন, তিনি যদি শূন্য কথার কথা মাত্র হতেন তবে বেদনার এই গতি কখনোই এমন বেগবান হতে পারত না । ধনী-দরিদ্র জ্ঞানী-অজ্ঞানী সকলকে নিয়ে সেই এক পরম প্ৰেম চিরজাগ্ৰত আছেন বলেই এক জায়গার বেদনা সকল জায়গায় কেঁপে উঠছে। এই কথাটি আজ বিশেষভাবে অনুভব করো। তাই এ কথা আজ বলবার কথা নয় যে “অন্যের কর্মের ফল আমি কেন ভোগ করব । “হা, আমিই ভোগ করব- আমি নিজে একাকী ভোগ করব। এই কথা বলে প্ৰস্তুত হও । নিজের জীবনকে শুচি করো, তপস্যা করো, দুঃখকে গ্ৰহণ করো। তোমাকে যে নিজের পাপের সঙ্গে ভীষণ যুদ্ধ করতে হবে, নিজের রক্তপাত করতে হবে, দুঃখে দগ্ধ হয়ে হয়তো মরতে হবে। কারণ, তোমার নিজের জীবনকে যদি পরিপূর্ণরূপে উৎসর্গ না কর। তবে পৃথিবীর জীবনের ধারা নির্মল থাকবে কেমন করে, প্ৰাণবান হয়ে উঠবে কেমন করে। ওরে তপস্বী, তপস্যায় প্রবৃত্ত হতে হবে : সমস্ত জীবনকে আহুতি দিতে হবে, তবেই “যদভদ্রং তৎ’ যা ভদ্র তাই আসবে । ওরে তপস্বী, দুঃসহ দুর্ভর দুঃখভারে তোমার হৃদয় একেবারে নত হয়ে যাক, তার চরণে গিয়ে পৌছোক ! নমস্তেহস্তু। বলো, পিতা, তুমি যে আছ সে কথা এমনি আঘাতের মধ্য দিয়ে প্রচার করে । তোমার প্ৰেম নিষ্ঠুর, সেই নিষ্ঠুর প্ৰেম তোমার জাগ্রত হয়ে সব অপরাধ দলন করুক। পিতা নো বোধি । আজই তো সেই উদবোধনের দিন। আজ পৃথিবীর প্রলয়ন্দাহের রুদ্র আলোকে, পিতা, তুমি দাড়িয়ে আছে। প্ৰলয়হাহাকারের উর্ধে ভূপাকার পাপকে দগ্ধ করে সেই দহনদীপ্তিতে তুমি প্রকাশ পােচ্ছ, তুমি জেগে রয়েছ। তুমি আজ ঘুমোতে দেবে না ; তুমি আঘাত করছ প্রত্যেকের জীবনে কঠিন আঘাত । যেখানে প্ৰেম আছে জাগুক, যেখানে কল্যাণের বোধ আছে জাগুক ; সকলে আজ তোমার বোধে উদবোধিত হয়ে উঠুক । এই এক প্রচণ্ড আঘাতের দ্বারা তুমি সকল আঘাতকে নিরস্ত করো। সমস্ত বিশ্বের পাপ হৃদয়ে হৃদয়ে ঘরে ঘরে দেশে দেশে পুঞ্জীভূত ; তুমি আজ সেই পাপ মার্জনা করো। দুঃখের দ্বারা মার্জনা করো, রক্তস্রোতের দ্বারা মার্জনা করো, অগ্নিবৃষ্টির দ্বারা মার্জনা করে । এই প্রার্থনা, সমস্ত মানবচিত্তের এই প্রার্থনা, আজ আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে জাগ্ৰত হােক : বিশ্বানি দুরিতানি পরাসুব। বিশ্বপাপ মার্জনা করো। এই প্রার্থনাকে সত্য করতে হবে ; শুচি হতে হবে, সমস্ত