পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/১৯২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১৫০
রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ।

কেবল আশ্রয় দান নহে, তাহাদিগকে পড়াইবার ভার লইয়া তাহাদের ভাবীজীবনের উন্নতির পথ খুলিয়া দিবার চেষ্টা করিতেন। দেওয়ান কাৰ্ত্তিকেয় চন্দ্র রায় মহাশয়ের স্বলিখিত জীবন চরিতে উল্লেখ দেখিতে পাই, যে তিনিও ইহার কয়েক বৎসর পরে, নবপ্রতিষ্ঠিত মেডিকেল কালেজে পড়িবার অভিপ্রায়ে আসিয়া লাহিড়ী মহাশয়ের ভবনে আশ্রয় লইয়াছিলেন। দেওয়ানজী একস্থানে বলিতেছেন, “কলিকাতায় আমি কালীর (রামতনু বাবুর কনিষ্ঠ কালীচরণ লাহিড়ী) আত্মীয়দের অতি প্রিয়পাত্র হইলাম। নুতন বান্ধবগণের মধ্যে মদনমোহন তর্কালঙ্কার ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়দ্বয়ের মিত্রতা লাভে বড়ই সুখী হইলাম। ঠনঠনিয়ার একটী বৃহৎ বাটীর কোনও অংশে রামতনু বাবু থাকিতেন, কোনও অংশে মদন তাঁহার দুই পিতৃব্যের সহিত অবস্থান করিতেন। আমি রামতনু বাবুর অংশের এক প্রকোষ্ঠে কালীর সহিত একত্রে থাকিতাম।”

 এইরূপে আত্মীয় স্বজনে বেষ্টিত হইয়া রামতনু বাবু তাঁহার প্রবাসভবনে বাস করিতেন। কিন্তু শুনিয়াছি তাঁহাদিগকে অতি ক্লেশে থাকিতে হইত। সকলকে পালা করিয়া স্বহস্তে হাট-বাজার করা জলতোলা, বাটন কুটনা, রন্ধন প্রভৃতি সমুদয় করিতে হইত। এরূপও শুনিয়াছি যে এত কষ্ট সহিতে না পারিয়া শ্যামাচরণ সরকার মহাশয় একটু অবস্থার উন্নতি করিতে পারিলেই চলিয়া যান; এবং দেওয়ানজী যে অল্পদিন ছিলেন তাহাতেই তাঁহার শরীর ভাঙ্গিয়া যায়; এবং তাঁহাকে মেডিকেল কালেজ ছাড়িতে বাধ্য হইতে হয়। দেশে গিয়া এক মাস সাবধানে থাকিয়া তবে তাঁহার শরীর সারে।

 যাঁহারা তাঁহার আশ্রয়ে থাকিতেন তাঁহাদের প্রতি লাহিড়ী মহাশয়ের স্নেহ যত্নের পরিসীমা ছিল না। কালীচরণ লাহিড়ী মহাশয় উত্তরকালে বন্ধুবান্ধবকে একটী ঘটনার কথা সৰ্ব্বদা বলিতেন, এবং বলিবার সময়ে তাঁহার চক্ষু জলে পূর্ণ হইত। একবার পরীক্ষার কয়েক মাস পূৰ্ব্বে কালীচরণ বাবুর চক্ষে এক প্রকার পীড়া হয়, যেজন্য তাঁহাকে চক্ষুদ্বয় ব্যবহার করিতে নিষেধ করিয়া দেওয়া হয়। পরীক্ষা সন্নিকট, অথচ পড়িতে নিষেধ, এই সঙ্কটে ভ্রাতৃবংসল রামতনু বাবু এক উপায় অবলম্বন করিলেন। তিনি প্রতিদিন কালেজ হইতে পড়াইয়া আসিয়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা কালীচরণের শষ্যাপার্শ্বে বসিয়া তাঁহার পাঠ্য সমুদয় গ্রন্থ পড়িয়া শুনাইতেন;