পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/২৪১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১৯৭
অষ্টম পরিচ্ছেদ।

লাঘব হইল। তাঁহার কলিকাতাবাসী বন্ধুগণ নানা প্রকারে তাঁহাকে সাহায্য করিতে লাগিলেন। ইঁহাদের মধ্যে স্বৰ্গীয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখ-যোগ্য। বিদ্যাসাগর মহাশয় আজ পাচক ব্রাহ্মণ পাঠাইলেন; কাল পলাইয়া গেল। তিনি আবার পাচক যোগাড় করিয়া পাঠাইলেন। ভৃত্যের পর ভূত্য পলাইতে লাগিল; বিদ্যাসাগর মহাশয় আবার পাঠাইতে লাগিলেন। এতদ্ভিন্ন গার্হস্থ্য সামগ্ৰী সকল কলিকাতাতে ক্রয় করিয়া নৌকাযোগে প্রেরণ করিতেন; বন্ধুকে কোনও অভাব অনুভব করিতে দিতেন না। এইরূপে লাহিড়ী মহাশয়ের দিন এক প্রকার কাটিয়া যাইত। উপবীত পরিত্যাগ করিয়া তিনি যখন নির্য্যাতন ভোগ করিতেছিলেন তখন হিন্দুসমাজের আত্মীয় স্বজনের কথা দূরে থাকুক, তাঁহার শিক্ষিত বন্ধুদিগের মধ্যে ও অনেকে তাঁহাকে পুনরায় উপবীত গ্রহণের জন্য অনুরোধ করিয়াছিলেন, কিন্তু তিনি সেরূপ পরামর্শের প্রতি কোনও দিন কর্ণপাত করেন নাই।

 লাহিড়ী মহাশয় যখন উত্তরপাড়া স্কুলের প্রধান শিক্ষক রূপে প্রতিষ্ঠিত, তখন কলিকাতা সমাজের নব অভ্যূদয়ের দিন। তখন চারিদিকে ইংরাজী শিক্ষা ও স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার হইতেছে; ব্রাহ্মসমাজ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অক্ষয়কুমায় দত্ত মহাশয়দ্বয়ের নেতৃত্বাধীনে উদীয়মান শক্তিরূপে উঠিতেছে এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমার দত্ত বৰ্ত্তমান গদ্য সাহিত্যের সূত্রপাত করিতেছেন। ১৮৪৭ সালে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের “বেতাল পঞ্চবিংশতি” নামক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তাহাতে সুললিত বাঙ্গালা গদ্য রচনার সূত্রপাত হয়। তৎপরে তিনি ১৮৪৮ সালে “বাঙ্গালার ইতিহাস,” ১৮৫৭ সালে “জীবনচরিত’ ও ১৮৫১ সালে “বোধোদয়” মুদ্রিত ও প্রচারিত করেন। ১৮৫১ সালে ও ১৮৫২ সালে অক্ষয়কুমার দত্ত প্রণীত “বাহ্য বস্তুর সহিত মানব-প্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার” নামক গ্রন্থদ্বয় প্রকাশিত হয়। পূৰ্ব্বোক্ত গ্রন্থ সকল প্রচার দ্বারা বাঙ্গালা গদ্যের এক নবযুগের অবতারণা হইল। বিশেষতঃ “বাহ বস্তুর" প্রচার যুবকদলের মধ্যে এক নব ভাবকে উদ্দীপ্ত করে। ইহার প্ররোচনাতে, অনেকে নিরামিষ ভোজন, আরম্ভ করেন; এবং সামাজিক নীতি ও চরিত্র সম্বন্ধে এক অভূতপূৰ্ব্ব পরিবর্ত্তন উপস্থিত হয়।

 বাস্তবিক অক্ষয়কুমার দত্ত মহাশয় এই সময়ে বঙ্গসমাজের নেতৃগণের মধ্যে একজন প্রধান পুরুষ ছিলেন।