পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/২৯

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
প্রথম পরিচ্ছেদ ।

দান করিয়া গিয়াছেন। ইঁহারই রাজসভাতে কবিবর ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর বিরাজিত ছিলেন।

 ভারতচন্দ্র ১৬৩৪ শকে অর্থাৎ ১৭১২ খ্ৰীষ্টাব্দে বৰ্দ্ধমানান্তর্গত পেঁড়োগ্রামে জন্মগ্রহণ করিয়া, বাল্যে সংস্কৃত ও পারস্য ভাষা শিক্ষা পূৰ্ব্বক, নানাদেশ পরিভ্রমণানন্তর, অবশেষে ফরাসডাঙ্গাতে ফরাসি রাজ্যের দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর আশ্রয়ে আসিয়া প্রতিষ্ঠিত হন। কৃষ্ণচন্দ্র বিষয় কৰ্ম্ম উপলক্ষে মধ্যে মধ্যে ফরাসডাঙ্গাতে ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর নিকট আসিতেন। সেখানে তাঁহার সহিত ভারতের সাক্ষাৎ হয়। কৃষ্ণচন্দ্র তাঁহার গুণে আকৃষ্ট হইয়া তাঁহাকে সঙ্গে করিয়া কৃষ্ণনগরে লইয়া যান। এখানে রাজাদেশে তিনি “অন্নদামঙ্গল” রচনা করেন। এতদ্ভিন্ন হালিসহর পরগণার অন্তর্গত কুমারহট্টগ্রাম-বাসী বৈদ্যজাতীয় কবি সুপ্রসিদ্ধ রামপ্রসাদ সেনও এই সময়ে প্রাদুর্ভূত হন। তিনি কৃষ্ণচন্দ্রের সভাসদ না হইয়াও তাঁহার সাহায্য লাভে বঞ্চিত হন নাই। এই সময়েই গোপালভাঁড় প্রভৃতি বিখ্যাত উপস্থিত বক্তা ও সুরসিকগণ কৃষ্ণচন্দ্রের সভাতে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ইহা বলিলে বোধ হয় অত্যুক্তি হয় না, যে বঙ্গদেশ যে আজিও ভারত সাম্রাজ্যের মধ্যে বিদ্যা, বুদ্ধি, সুরসিকতা প্রভৃতির জন্য প্রতিষ্ঠা লাভ করিতেছে, কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভা তাহার পত্তন-ভূমিস্বরূপ ছিল।

 কিন্তু কৃষ্ণচন্দ্র প্রভূতশক্তিশালী হইয়াও ধৰ্ম্ম বা সমাজ সংস্কারের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন। এমন কি যে প্রাচীন কুরীতি-জালে দেশ আবদ্ধ ছিল, সে জালকে তিনি আরও দৃঢ় করিবার প্রয়াস পাইয়াছিলেন। এরূপ জনশ্রুতি আছে যে রাজা রাজবল্লভ স্বীয় স্বল্পবয়স্ক তনয়ার বৈধব্য-দুঃখ দর্শনে কাতর হইয়া দেশ মধ্যে বিধবা-বিবাহের প্রথা প্রবর্ত্তিত করিবার প্রয়াস পাইয়াছিলেন। কেবল কৃষ্ণচন্দ্রের গুপ্ত প্রতিকূলতাচরণবশতঃই তিনি সে সংস্কার সাধনে কৃতকাৰ্য্য হইতে পারেন নাই। স্মাৰ্ত্ত ভটাচার্য্যের যে সকল বিধি ব্যবস্থার ভারে প্রাচীন বঙ্গসমাজ বহুদিন ক্লেশ পাইতেছিল, কৃষ্ণচন্দ্র সেই ভার লঘু না করিয়া বরং দুৰ্ব্বহ করিয়াছিলেন। এরূপ শুনিতে পাওয়া যায় তিনিই যশোহর জেলাস্থ পিরালী ব্রাহ্মণদিগের উপবীত গ্ৰহণাধিকার রহিত করিয়া তাহাদিগকে জাত্যংশে অতি হীন করিয়া ফেলেন; এবং এ প্রদেশের বৈদ্যগণের উপবীত ধারণ নিষেধ করেন। এ জনশ্রুতি কতদূর সত্য তাহা বলিতে পারি না ।

 রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পরে রাজা শিবচন্দ্র, (১৭৮২ হইতে ১৭৮৮ পর্য্যন্ত)