পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/৫৫

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
২৯
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

অনেক দেশীয় ও বিদেশীয় লোকের মোকদ্দমাদির সহায়তা করিয়া এক প্রকা মোক্তারের কাজ করিতেন; তাহাতেও কিছু কিছু উপরি আয় হইত। সে সময়ে আদালতের চতুঃসীমার মধ্যে যাহারা বাস করিত, তাহারা উৎকোচ, মিথ্যাসাক্ষ্য, প্রবঞ্চনাদির দ্বারা অল্পকালের মধ্যেই ধনী হইয়া উঠিত। কিন্তু কেশবচন্দ্রের অতিরিক্ত আয় এত অল্পই ছিল যে তিনি নিজের ব্যয় নির্ব্বাহ ও কৃষ্ণনগরের বাটীর সাহায্য করিয়া কলিকাতায় ভ্রাতাদিগের শিক্ষার জন্য অধিক ব্যয় করিতে পারিতেন না। এজন্য তাঁহাকে পরের অনুগ্রহাপেক্ষী হইতে হইয়াছিল।

 এইরূপ পিতা মাতা ও এরূপ জ্যেষ্ঠের ক্রোড়ে শিশু রামতনু জন্মগ্রহণ করিলেন। হিন্দু গৃহস্থের গৃহে ছয়টী সন্তানের পর, বিশেষতঃ কয়েকী গত হওয়ার পর, পুত্র সন্তান জন্মিলে সেটী কিরূপ আদরের সামগ্রী হয়, সকলে তাহাকে কিরূপ অভ্যর্থনা করে, তাহা সকলেই বিদিত আছেন। তাহাতে অাবার মাতামহ রাধাকান্ত রায় মহাশয় রাজবাটীর দেওয়ান ও গ্রামের মধ্যে সম্ভ্রান্ত লোক ছিলেন। সুতরাং ইহাতে কিছু সন্দেহ নাই যে শিশু রামতনু ভূমিষ্ঠ হইলে স্বল্পকালের মধ্যেই বারূইহুদা ও কৃষ্ণনগরের লোক জানিতে পারিল দেওয়ানজীর দৌহিত্র জন্মিয়াছে। সুতিকাগৃহের দ্বারে সমাগত পল্লীবাসিনীগণের মাঙ্গল্য শঙ্খধ্বনিতে ক্ষুদ্র গ্রামখানি কাঁপিয়া উঠিল। পুরস্কারের প্রত্যাশায় দলে দলে বাদকগণ আসিয়া নিরন্তর বাদ্যধ্বনি করিতে লাগিল বারূইহুদায় বাটী হইতে সুসংবাদ লইয়া কৃষ্ণনগরের বাটীতে লোক ছুটিল; পথে, ঘাটে, সরোবরে স্নানের কালে, গৃহিণীগণ বলিতে লাগিলেন—“লাহিড়ীদের ছেলে হয়েছে; অাহা বেঁচে থাকলে হয়।”

 এবম্প্রকার অভ্যর্থনার মধ্যে রামতনু সুর্য্যের আলোক দেখিলেন। তৎপরে প্রাচীন হিন্দু গৃহস্থের গৃহে যে সকল কৃত্য ও কুলাচার হইয়া থাকে সকলি হইল। অর্থাৎ অষ্টাহে আটকৌড়া, সূতিকা-নিষ্ক্রমণ সময়ে ষষ্ঠীপূজা প্রভৃতি সমুদয় কার্য্য যথাবিহিত প্রণালীতে নিষ্পাদিত হইল।

 অতঃপর শিশু রামতনু সূতিকা কারাগার হইতে বাহিরে আসিয়া সকলের চক্ষের অগোচরে, জননীর স্নেহময় বক্ষে, শুক্লপক্ষের শশিকলার ন্যায় দিন দিন বাড়িতে লাগিলেন। জ্যেষ্ঠ কেশবচন্দ্র নবজাত সহোদরের রূপগুণের বর্ণনা করিয়া জননীকে কতই উৎসাহিত ও আনন্দিত করিতে লাগিলেন।

 পঞ্চম বর্ষ অতিক্রম করিলেই হাতে খড়ি দিয়া বিদ্যারম্ভ করান হইল।