পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (দশম সম্ভার).djvu/৩১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

ষোড়শী

 ষোড়শী। কাছেই থাকেন, কিন্তু তাই বলে তিন-চার মিনিটেই কি আসা যায়?

 জীবানন্দ। সবে তিন-চার মিনিট? আমি ভেবেচি আধ ঘণ্টা—কি আরও কতক্ষণ যেন এককড়ি তাকে আনতে গেছে। (উপুড় হইয়া শুইয়া পড়িল) হয়ত তিনিও ভয়ে এখানে আসবেন না অলকা। (তাহার কণ্ঠস্বরে ও চোখের দৃষ্টিতে নিরাশ্বাসের অবধি রহিল না।)

 ষোড়শী। (ক্ষণকাল মৌন থাকিয়া স্নিগ্ধস্বরে) ডাক্তার আসবেন বই কি।

 জীবানন্দ। বোধ করি আমি বাঁচব না। আমার নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্চে, মনে হচ্চে পৃথিবীতে আর বুঝি হাওয়া নেই।

 ষোড়শী। আপনার কি বড় কষ্ট হচ্চে?

 জীবানন্দ। হু। অলকা, আমাকে তুমি মাপ কর। (একটু থামিয়া) আমি ঠাকুর-দেবতা মানিনে, দরকারও হয় না। কিন্তু একটু আগেই মনে মনে ডাকছিলাম। জীবনে অনেক পাপ করেচি, তার আর আদি-অন্ত নেই। আজ থেকে থেকে কেবলি মনে হচ্ছে বুঝি সব দেনা মাথায় নিয়েই যেতে হবে। (ক্ষণেক থামিয়া) মানুষ অমর নয়, মৃত্যুর বয়সও কেউ দাগ দিয়ে রাখেনি–কিন্তু এই যন্ত্রণা আর সইতে পরিচিনে—উঃ—মা গো! (ব্যথার তীব্রতায় সৰ্ব্বশরীয় যেন আকুঞ্চিত হইয়া উঠিল।)

[ষোড়শী একটু ইতস্তত: করিয়া শয্যাপার্শ্বে বসিয়া আঁচল দিয়া ললাটের ঘাম মুছাইয়া দিয়া, পাখার অভাবে আঁচল দিয়া বাতাস করিতে লাগিল। জীবানন্দ কোন কথা কহিল না, কেবল তাহার ডান হাতটা ধীরে ধীরে কোলের উপর টানিয়া লইল।]

 জীবানন্দ। (ক্ষণেক পরে) অলকা—

 ষোড়শী। আপনি আমায় ষোড়শী বলে ডাকবেন।

 জীবানন্দ। আর কি অলকা হতে পার না?

 ষোড়শী। না।

 জীবানন্দ। কোনদিন কোন কারণেই কি—

 ষোড়শী। আপনি অন্য কথা বলুন। (জীবানন্দ নীরবে রহিল; ক্ষণেক পরে) কষ্টটা কি কিছুই কমেনি?

 জীবানন্দ। (ঘাড় নাড়িয়া) বোধ হয় একটু কমেচে। আচ্ছা যদি বাঁচি, তোমার কি কোন উপকার করতে পারিনে?

 ষোড়শী। না, আমি সন্ন্যাসিনী— আমার নিজের কোন উপকার করা কারো সম্ভব নয়।

২১