প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (দ্বাদশ সম্ভার).djvu/৩০৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


বছর-পঞ্চাশ পূর্বের একটা দিনের কাহিনী ঠাঙাড়ের কথা শুনেচে অনেকে এবং আমাদের মতো যারা বুড়ো তারা দেখেচেও অনেকে। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেও পশ্চিম বাংলায়, অর্থাৎ হুগলী বর্ধমান প্রভৃতি জেলায় এদের উপদ্রব ছিল খুব বেশি। তারও আগে, অর্থাৎ ঠাকুরমাদের যুগে, শুনেচি, লোক-চলাচলের প্রায় কোন পথই সন্ধ্যার পরে পথিকের পক্ষে নিরাপদ ছিল না। এই ছত্ৰপ্তরা ছিল যেমন লোভী তেমনি নিৰ্দ্দয়। দল বেঁধে পথের ধারে ঝোপ-ঝাড়ে লুকিয়ে থাকতো, হাতে থাকতে বড় বড় লাঠি এবং কাচা বাশের ভারি ছোট-ছোট খেটে, তাকে বলতে পাবড়া! অব্যর্থ তার সন্ধান। অতর্কিতে পায়ে চোট খেয়ে সে যখন পথের উপর মুখ থুবড়ে পড়তে, তখন সকলে ছুটে এসে জুমদাম্ করে লাঠি মেরে তার জীবন শেষ করতো। এর ভাবা-চিন্তা বাচবিচার নেই! এদের হাতে প্রাণ দিয়েচে এমন অনেক লোককে আমি নিজের চোখেই দেখেচি । ছেলেবেলায় আমার মাছ ধরার বাতিক ছিল খুব বেশি। অবশু মস্ত ব্যাপার নয়, —পুটি, চ্যাল প্রভৃতি ছোট ছোট মাছ। ভোর না হতেই ছিপ-হাতে নদীতে গিয়ে হাজির হতাম। আমাদের গ্রামের প্রান্তে হাজা-মজা ক্ষুদ্র নদী, কোথাও কোময়ের বেশি জল নেই, সমস্তই শৈবালে সমাচ্ছন্ন—তার মাঝে মাঝে যেখানে একটু ফাক, সেখানেই এই সব ছোট ছোট মাছ খেলা করে বেড়াত। বড়শিতে টোপ গেঁথে সেইগুলি ধরাই ছিল আমার বড় আনন্দ একলা নদীর তীরে মাছের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে কতদিন দেখেচি কাদায় খাওলায় মাখামাখি মানুষের মৃতদেহ। কোনটার মাখা থেকে হয়তো তখনো রক্ত করে জলট রাঙা হয়ে আছে। নদীর দুই তীরেই ঘন বনজঙ্গল, কি জানি কোথাকার মানুষ, কোথা থেকে ঠ্যাঙাড়েরা মেরে এনে এই জনবিরল নদীর পাকে পুতে দিত। এর জন্য কখনো দেখিনি পুলিশ আসতে, কখনো দেখিনি গ্রামের কেউ গিয়ে থানায় খবর দিয়ে এসেচে। এ ঝঞ্চাট কে করে । তারা চিরদিন গুনে আসচে পুলিশ ঘাটাতে নেই,—তার ত্রিসীমানার মধ্যে যাওয়াও বিপজ্জনক। বাঘের মুখে পড়েও দৈবাং বীচ যায়, কিন্তু ওদের হাতে কাচ নয়। কাজেই এ দৃশ্ব যদি কারও চোখে পড়তে, সে চোখ ফিরিয়ে নিঃশবে অন্যত্র সরে যেত। তারপরে রান্ত্রি এলে, শিয়ালের দল বেরিয়ে মহা-সমারোহে ভোজনাদি শেষ করে নদীর জলে আঁচিয়ে মুখ ধুয়ে ঘরে ফিরে যেত, মড়ার চিহ্নমাত্র থাকত না। একদিন আমার নিজেরও হয়তো ঐ দশ ঘটত, কিন্তু ঘটতে পেলে না। সেই গল্পটা বলি । २»é