প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (সপ্তম সম্ভার).djvu/২২০

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ স্বয়মা ! বলিয়া তাহাকে নিকটবর্তী একটা চেয়ারে বসাইয়া নানারকমে পুনঃ পুনঃ এই কথাটাই বুঝাইতে লাগিলেন যে, ইহাতে কোন লজ্জা, কোন সরম নাই। যুগে যুগে চিরদিনই ইহা হইয়া আসিতেছে। যিনি সতী, যিনি স্বয়ং আন্তাশক্তি, তিনিও একবার স্বামীর ঘর করিতে বাপ মা আত্মীয়-স্বজন সকলের সঙ্গেই ঝগড়া করিয়া চলিয়া গিয়াছিলেন। আবার সব হইবে, সব ফিরিয়া পাইবে, আজ যাহারা বিমুখ আবার তাহারা মুখ ফিরাইবে, আবার তাহদের পুত্র-পুত্রবধূকে যত্নে তুলিয়া লইবে । দেখ দেখি মা, আমার এ আশীৰ্ব্বাদ কখনো নিষ্ফল হইবে না । এমনি কত-কি বৃদ্ধ মনের আবেগে বকিয়া যাইতে লাগিলেন। তাহাতে সার যাহা ছিল তাহা থাক, কিন্তু তাহার ভারে যেন শ্রোতাটির আনত মাথাটি ধীরে ধীরে ধুলির সঙ্গে মিশিয়া যাইবার উপক্রম করতে লাগিল। চাপিয়া বৃষ্টি আসিয়াছিল। এমনি সময়ে দেখিতে পাওয়া গেল, স্বরেশ ভিজিয়া কাদা মাখিয়া কোথা হইতে হন হন করিয়া বাড়ি ঢুকিতেছে। দেখিবামাত্রই অচলা তাড়াতাড়ি চোখ মুছিয়া ফেলিল এবং উঠিয়া দাড়াইয়া বৃষ্টির জল হাত বাড়াইয়া লইয়া অশ্রজলের সমস্ত চিহ্ন ধুইয়া ফেলিয়া ফিরিয়া আসিয়া বসিল। রামবাৰু বুঝিলেন, স্বরম যেজন্যই হোক, চোখের জলের ইতিহাসটা স্বামীর কাছে গোপন রাথিতে চায়। সে উপরে উঠিয়া রামবাবুকে দেখিয়া বিস্মিত হইয়া কিছু বলিবার চেষ্টা করিতেই তিনি ব্যস্ত হইয়া বলিয়া উঠিলেন, কথাবাৰ্ত্তা পরে হবে স্বরেশবাবু, আমি পালাইনি। আপনি কাপড় ছেড়ে আমুন । স্বরেশ হাসিয়া কহিল, এ কিছুই না। বলিয়া একটা চৌকি টানিয়া বসিবার উদ্যোগ করিতেছিল, অচলা মুখ তুলিয়া চাহিল—জ্যাঠামশায়ের কথাটা শুনতে দোষ কি ? এক মাস হয়নি তুমি এতবড় অস্বথ থেকে উঠেচ—বার বার আমাকে আর কত শাস্তি দিতে চাও ? t তাহার বাক্য ও চাহনির মধ্যে এত বড় ব্যবধান ছিল যে, দু'জনেই বিস্মিত হইলেন, কিন্তু এই বিস্ময়ের স্রোতটা বহিতে লাগিল ঠিক বিপরীত মুখে। স্বরেশ কোন জবাব না দিয়া নীরবে আদেশ পালন করিতে চলিয়া গেল, আর রামবাৰু বাহিরের দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিলেন । সেই বাহিরের বারিপাতের আর বিরাম নাই, রাত্রি যত বাড়িতে লাগিল, বৃষ্টির প্রকাশ যেন ততই বৃদ্ধি পাইতে লাগিল । বহুদিনের আকর্ষণে ধরিত্রী শুষ্কপ্রায় হইয়া উঠিয়াছিল ; মনে হইতে লাগিল, তাহার সমস্ত দীনতা, সমস্ত অভাব আজিকার এই রাত্রির মধ্যেই পরিপূর্ণ করিয়া দিতে বিধাতা বদ্ধপরিকর হইয়াছেন। রামবাবুর উদ্বেগ লক্ষ্য করিয়া অচলা আস্তে আস্তে বলিল, ফিরে যেতে বড় কই হবে জ্যাঠামশাই, আজ রাত্তিরেই কি না গেলে নয় ? ২১২