প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শ্রীকান্ত (প্রথম পর্ব).djvu/১১৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
শ্রীকান্ত
১১৪
 

পিসিমা একদিন দুপুর-বেলা আমাকে নিভৃতে ডাকিয়া বলিলেন, বাবা শ্রীকান্ত, তোরা ত এমন অনেকেরই রোগে শোকে গিয়ে দেথিস্; এই ছুঁড়িটাকে এক-আধবার গিয়ে দেখিস্ না। সেই অবধি আমি মাঝে মাঝে গিয়া দেখিতাম এবং পিসিমার পয়সায় এট—ওটা—সেটা কিনিয়া দিয়া আসিতাম। তাঁর শেষকালে একা আমিই কাছে ছিলাম। মরণকালে অমন পরিপূর্ণ বিকার এবং পরিপূর্ণ জ্ঞান আমি আর দেখি নাই। বিশ্বাস না করিলেও যে ভয়ে গা ছম্ ছম্ করে, আমি সেই কথাটাই বলিতেছি।

 সেদিন শ্রাবণের অমাবস্যা। রাত্রি বারোটার পর ঝড় এবং জলের প্রকোপে পৃথিবী যেন উপড়াইয়া যাইবার উপক্রম করিল। সমস্ত জানালা দরজা বন্ধ; আমি খাটের অদূরে বহু প্রাচীন অর্দ্ধভগ্ন একটা ইজি-চেয়ারে শুইয়া আছি। নিরুদিদি স্বাভাবিক মুক্তকণ্ঠে আমাকে কাছে ডাকিয়া হাত তুলিয়া আমার কানটা তাঁর মুখের কাছে আনিয়া, ফিস্ ফিস্ করিয়া বলিলেন, শ্রীকান্ত, তুই বাড়ী যা।

 সে কি নিরুদি, এই ঝড়-জলের মধ্যে?

 তা হোক। প্রাণটা আগে। ভুল বকিতেছেন ভাবিয়া বলিলাম, আচ্ছা যাচ্চি—জলটা একটু থামুক। নিরুদিদি ভয়ানক ব্যস্ত হইয়া বলিয়া উঠিলেন, না, না, শ্রীকান্ত, তুই যা। যা ভাই যা—আর এতটুকু দেরি করিস্‌নে—তুই পালা। এইবার তার কণ্ঠস্বরের ভঙ্গীতে আমার বুকের ভিতরটায় ছ্যাঁৎ করিয়া উঠিল। বলিলাম, আমাকে যেতে বল্‌ছ কেন?

 প্রত্যুত্তরে তিনি আমার হাতটা টানিয়া লইয়া রুদ্ধ জানালার প্রতি লক্ষ্য করিয়া চেঁচাইয়া উঠিলেন, যাবিনি, তবে কি প্রাণটা দিবি? দেখ্‌চিস্‌নে, আমাকে নিয়ে যাবার জন্যে কালো কালো সেপাই এসেচে? তুই আছিস্ বলে ঐ জানালা দিয়ে আমাকে শাসাচ্চে?