পাতা:সুকুমার রায় রচনাবলী-প্রথম খণ্ড.djvu/১৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

 সুকুমারের রসবোধ কি করে অনেক সময়ে সামাজিক সংকটের উদ্ধারে সাহায্য করতো তার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যায়।

 একবার সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের প্রাঙ্গণে ব্রাহ্মসমাজের নেতৃস্থানীয় ভিন্ন প্রদেশবাসী কোন ব্যক্তির সম্বর্ধনায় প্রীতিসম্মেলনের আয়োজন হয়, কিন্তু আরম্ভেই দুই দল যুবকের মধ্যে বচসার সূত্রপাতে একটা অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কায় সকলে অস্থির হয়ে উঠেছেন এমন সময়ে সুকুমার হঠাৎ তাঁর লক্ষ্মণের শক্তিশেলের গান ধরলো—

“কেন, কেন, কেনরে,
চেঁচিয়ে কাঁচা ঘুম ভাঙো কেন?”

অমনি হাসির রোলের মধ্যে সমস্ত তিক্ততা ধুয়ে ভেসে গেল।

 আরেকবার কংগ্রেসের সভামণ্ডপে গায়কদলের মধ্যে সুকুমার রয়েছেন। ওঁদের সামনে এক ভলাণ্টিয়ার সর্দার ঘোরাঘুরি করছে। মিলিটারি ধরনের উর্দি পরে বোধহয় তার মাথা ঘুরে গেছে, সে বীরদর্পে পায়চারি করতে করতে এমন ভঙ্গিতে মেয়েদের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে যে সকলে বিরক্ত হচ্ছেন, কিন্তু আগের দিন ভলাণ্টিয়ার ও দর্শকদের মধ্যে একটা মারামারি হয়ে যাওয়াতে ভয়ে কেউ কিছু বলতে চাইছেন না। এই সময়ে সুকুমার, ছোটরা দুষ্টুমি করলে বড়রা যেমনভাবে ভর্ৎসনা করেন তেমনি ভঙ্গিতে তার দিকে চেয়ে, হেসে, বললেন, “দুৎ”! যুবকটি অপ্রস্তুত, হয়ে পালালো।

 আরেকবার, ঢাকাতে একদল বন্ধুর সঙ্গে সিনেমা দেখতে গেছেন, যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য মাঝখানে ছবি বন্ধ হয়ে গেল। দর্শকেরা অধৈর্য হয়ে উঠে যখন বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে তখন তিনি সদলবলে গান ও অভিনয় আরম্ভ করে দিলেন—অমনি সব চুপ! অভিনয় প্রায় শেষ হতে চলেছে, এমন সময়ে ম্যানেজার এসে মিনতি করে বললেন, “মশাইরা দয়া করে আরেকটু-খন চালিয়ে যান, আমাদের প্রায় সব ঠিক হয়ে এসেছে।”

 সুকুমার ঘনিষ্ঠ নিকট বন্ধুদের নিয়ে ননসেন্স ক্লাবের উত্তরসাধনে “মন-ডে ক্লাব” বা “মণ্ডা ক্লাব” স্থাপিত করলেন। এর বিষয়ে প্রভাতকুমার গংগোপাধ্যায় লিখেছিলেন—“জীবনে বহু ক্লাবের সংস্পর্শে আমি আসিয়াছি, রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত বিচিত্রার সদস্য হইবার সৌভাগ্যও আমার হইয়াছিল, কিন্তু বলিতে দ্বিধা নাই যে মন-ডে ক্লাবের ন্যায় এত বিচিত্র, এত রসে ভরপুর কোন ক্লাব আর আমি দ্বিতীয় দেখি নাই।” (শ্রীপরিমল গোস্বামীর সৌজন্যে)।

 এই ক্লাবের গৃহীত সংগীত ছিল রবীন্দ্রনাথের “আমরা লক্ষীছাড়ার দল।” সভ্যদের অনেকেই খুব লম্বাচওড়া ছিলেন—গড়পারের দোতলার বসবার ঘরে ধেই ধেই নত্যসহকারে যখন এই গানটি গাওয়া হতো তখন তার নীচের ঘরে খাবারের রেকাব সাজাতে সাজাতে বৌ-রা ভাবতেন ছাতটা ভেঙে মাথায় না পড়ে! অন্য একটা গান—

“আমাদের মন-ডে সম্মিলন,
হা রে রে আমাদের মন-ডে সম্মিলন!
চারুবাবুর দধি, কারু ঘোলের নদী,
জংলিভায়ার সরবতেতে মন মাতালে নিরবধি”—

১৪
সুকুমার সমগ্র রচনাবলী