পাতা:সুকুমার রায় রচনাবলী-প্রথম খণ্ড.djvu/৮১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

মারতে গিয়েছে; নীল সাগরের মধ্যিখানে ছায়ায় ঢাকা রত্নদ্বীপ, সেখানে সে মুক্তো আনতে গেছে; ঐ যে পুরীর সামনে পৃথিবীজোড়া গভীর বন, সেই বনের ওপারে গিয়ে সে অদ্ভুত দৃশ্য দেখে এসেছে। সকলে বলল, “অদ্ভুত দৃশ্যটা কিরকম?” শিকারি বলল, “দেখতে পেলাম ঝরনাতলায় বনের বড়ি, মাথায় তার সোনার চুল। সেই চুল দিয়ে বুড়ি রপোর তাঁতে কাপড় বুনছে! চকচকে, ঝকঝকে, ফিনফিনে, ফরফরে চমৎকার কাপড়—তেমন কাপড় এ রাজ্যে নেই, ও রাজ্যে নেই, কোথাও নেই।”

 সে রাত্রে রাজাদের চোখে আর ঘুম এলো না। তারা শুয়ে শুয়ে কেবলই ভাবছে, ‘আহা! সে কাপড় যদি কিছু আনতে পারতাম। শেষটায় শ্বেতপুরীর আর সহ্য হল না—উঠে লালপুরীর ঘরে গিয়ে বলল, “লালপুরী ভাই, জেগে আছ?” লালপুরী বলল, “হ্যাঁ ভাই, সেই কাপড়ের কথা ভেবে ভেবে আমার আর ঘুম আসছে না।” শ্বেতপুরী বলল, “আমারও সেই দশা। চল না, দুজনে চুপচাপ বেরিয়ে পড়ি।” লালপুরী বলল, “বেশ কথা। দেখা যাক, সেই বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায় কি না।” শ্বেতপুরী চুপচাপ গিয়ে রাজভাণ্ডারীর কানে কানে বলল, “তদবির সিং, আমি কয়দিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি, তুমি সাবধানে সব সামলে থেকো, আর রাজকুমারকে চোখে চোখে রেখো।” লালপুরী তার বাপের আমলের বুড়ো চাকরকে জাগিয়ে বলল, “নিমকরাম, আমি কয়দিন একটা ঘুরে আসছি, তুমি আমার মেয়েকে দেখো।”

 তারপর দুজনে বুড়ির খোঁজে বনের মধ্যে গেল। সেই যে গেল, আর তাদের খবর নেই। দুদিন যায়, দশদিন যায়, এমনি করে সাত মাস গেল। তখন দুষ্টু তদবির সিং নিমকরামকে লোভ দেখিয়ে বলল, “দাদা, বুড়ো হয়ে পড়লে, আর কয়দিনই-বা বাঁচবে। এখন এই বয়সে একটা জিরিয়ে নাও। তোমায় নদীর ধারে বাগান দিচ্ছি, ঘর দিচ্ছি, চাকর-দাসী সব দিচ্ছি—শেষ কটা দিন আরামে থাক। মেয়েটাকে দেখাশোনা, সে আমার গিন্নি করবে।” এই বলে নিমকরামকে ভুলিয়ে ভালিয়ে পাঠিয়ে দিল, পুরী থেকে অনেক দূরে।

 দিন যতই যায়, রাজকন্যা আর রাজপুত্রের ততই কষ্ট বাড়ে। ক্রমে এমন হল যে তারা ভালো করে খেতেই পায় না, ছেঁড়া ময়লা কাপড় পরে, নোংরা ঘরে মাদুর পেতে শোয়। ভাণ্ডারীটার ছেলেমেয়ে, ভাইপো-ভাগনে, ভাইঝি-ভাগনি, মাসি-পিসি আর মেসো-পিসে, তারা সব দলেবলে পুরীতে এসে থাকে। ভালো ঘর সব তারাই নেয়, ভালো কাপড় সব তারাই পরে, ভালো খাবার সব তারাই খায়। শেষটায় একদিন নিমকরামের গিন্নি এসে রাজপুত্র আর রাজকন্যাকে পুরীর বাইরে তাড়িয়ে দিলো। বলল, “যা, যা, বসে বসে আর খেতে হবে না; মাঠে গিয়ে শুয়োর চরা। যদি ভালো করে চরাস, আর একটাও শুয়োর না হারায়, তা হলে বিকেলে চারটি ভাত পাবি। রাত্রে ঐ হোগলার ঘরে শুয়ে থাকিস।”

 দুজনে বনের ধারে, মাঠের মধ্যে শুয়োর চরাতে গেল। একটা শুয়োর ভারি দুষ্টু, কেবলই পালাতে চায়। রাজপুত্র তাকে ধরে এনে লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে বললেন, “খবরদার! এইখানে চোখ বুজে শুয়ে থাক; নড়েছিস কি মরেছিস!” তারপর দুজনে মিলে গল্প করতে লাগলো। দুঃখের কথা বলে বলেও ফুরোয় না: এদিকে বেলা যে শেষ হয়ে আসছে, তাদের সে খেয়ালই নেই। হঠাৎ রাজপুত্রে চেয়ে দেখে, দুষ্টু শুয়োরটা আবার কোথায় পালিয়েছে। কোথায় গেল? কোথায় গেল? চারদিক

৭৬
সুকুমার সমগ্র রচনাবলী