ব্রাহ্মধর্ম্মের মত ও বিশ্বাস/তৃতীয় উপদেশ

তৃতীয় উপদেশ।


পরমেশ্বর আনন্দস্বরূপ।

 পরমেশ্বর আনন্দ স্বরূপ। যে সকল পবিত্র-চিত্ত মহাত্মার পরব্রহ্মকে প্রাপ্ত হইয়া সুমহান্ আনন্দ লাভ করিয়াছেন, তাঁহারা তাঁহাকে আনন্দ-স্বরূপ বলিয়া ব্যক্ত করিয়াছেন। পরমেশ্বর নির্ব্বিশেষ; তাঁহার কোন বিশেষ নাম নাই। সেই বিশ্বব্যাপী পরমাত্মাকে না চক্ষু দ্বারা দর্শন করা যায়; না হস্ত দ্বারা গ্রহণ করা যাইতে পারে। যখন তাঁহার নিষ্কলঙ্ক পবিত্র স্বরূপ—যখন তাঁহার সুমধুর মঙ্গল ভাব আমাদের বিশুদ্ধ বুদ্ধিতে প্রতিভাত হয়; যখন তাঁহার সন্নিকর্ষ আত্মার নিকটে উজ্জ্বল রূপে প্রকাশ পায়; তখন যে এক অনুপম স্বর্গীয় আনন্দ উপস্থিত হয়, তাহাতেই তাঁহার নিগূঢ় সত্তা উপলব্ধি হয়। মনের সঙ্গে বিষয়ের যেমন এক প্রকার সম্বন্ধ—পরমাত্মার সহিত আত্মারও সেই রূপ অতি নৈকট্য সম্বন্ধ রহিয়াছে। প্রিয় রস আস্বাদনে বা প্রিয় স্বর শ্রবণে মনেতে যেমন এক প্রকার সুখের সঞ্চার হয়; সেই রূপ ঈশ্বরের বিশুদ্ধ ভাব অনুভূত হইলে, আত্মাতে এক পবিত্র আনন্দরসের সঞ্চার হইয়া থাকে। বিষয়ের সংস্পর্শে মনেরই সুখ লাভ হয়, তাহাতে আত্মার পরিতোষ হয় না। আত্মার যে আনন্দ, সেই মঙ্গলস্বরূপের আবির্ভাবই তাহার কারণ। সেই আনন্দ-স্বরূপের প্রসন্ন মূর্ত্তিই সে আনন্দের জননী। এই ভূমানন্দের সঙ্গে সঙ্গে সেই মহান্ পুরুষের নিকট সম্বন্ধ অনুভূত হয় এবং তাঁহাকে প্রত্যক্ষবৎ প্রতীতি করা হয়। কিন্তু এই উজ্জ্বল পবিত্র ব্রহ্মানন্দ যে কি আনন্দ তাহা প্রতি জনের পরীক্ষার কথা; স্বীয় স্বীয় আত্মাতে ইহার পরীক্ষা ব্যতীত কাহারও বোধগম্য হইবার সম্ভাবনা নাই। ব্রহ্মানন্দ যে কি মহান্ আনন্দ, তাহা বাক্যেতেও ব্যক্ত হয় না এবং উপদেশ দ্বারাও বুঝান যায় না। কিন্তু ইহা নিশ্চয় যে যাহারা মনুষ্য জন্ম ধারণ করিয়াছে, তাহারা সকলেই সমান রূপে সেই আনন্দ-রস পানে অধিকারী। ঈশ্বর সকলেরই সাধারণ সমৃদ্ধি এবং তিনি প্রত্যেকেরই নিজস্ব ধন। সকল অবস্থার লোকেই জগৎ-পিতার নিকট গমন করিতে পারে এবং সকল অবস্থার লোকেই তাঁহার পবিত্র সহবাস লাভে অধিকারী। আত্মম্পৃহারূপ স্বর্গীয় অগ্নি প্রচ্ছন্ন ভাবে বা প্রজ্জ্বলিত রূপে সকলেতেই আছে। কিন্তু এমন আশ্চর্য্য অগ্নির উদ্দীপন হয় না বলিয়া এক্ষণে উহা নির্ব্বাণপ্রায় হইয়া যাইতেছে। ঈশ্বরের এক অমূল্য অতুল্য দান আমরা তুচ্ছ করিতেছি। উর্দ্ধ্ববাহুর হস্তের ন্যায় আমাদের আত্মাও অসাড় হইয়া যাইতেছে। এ দেশের এহ্মণে যে প্রকার অবস্থা হইয়াছে, তাহাতে যে ঈশ্বরের ভাব কিছুমাত্র পরিস্ফুট হয়, ইহাই আশ্চর্য্য। বাল্যকালে কেবল অপরা বিদ্যার শিক্ষাতেই মন এমনি অহরহঃ নিমগ্ন থাকে, যৌবন কালে বিষয় চেষ্টাতেই এমনি বিব্রত থাকিতে হয়, বৃদ্ধ বয়সে অনর্থ চিন্তাতেই কাল এমনি গত হয়, যে ঈশ্বরতত্ত্ব সমালোচনা করিবার অবকাশও থাকে না—স্পৃহাও হয় না। ইহাতেও যে তিনি কখন কখন আমাদের আত্মাতে তাঁহার মহান্ ভাবের উদ্দীপন করেন, ইহা কেবুল তাঁহারই অসামান্য করুণার নিদর্শন। যদিও আমরা বিষয় চিন্তা হইতে নিশ্চিন্ত হইয়া ঈশ্বরে চিত্তার্পণ করিবার সময় পাই না, যদিও আমরা বিক্ষিপ্তচিত্ত হইয়া ঈশ্বর হইতে সততই দূরে ভ্রমণ করি, তথাপি যে তিনি এক এক বার আমাদের নিকটে আপনাকে প্রকাশ করিয়া বিমলানন্দ বিধান করেন, ইহাতে কেবল তাঁহার স্নেহ-দৃষ্টি ও প্রীতি দৃষ্টি প্রকাশ পাইতে থাকে। যদিও সেই পবিত্র আনন্দ তড়িতের ন্যায় চঞ্চল হয়—যদিও তাহা নিমেষের সমান তিরোহিত হয়, কিন্তু তাহাতেই বা কি? সেই যে চকিতের ন্যায় আনন্দ তাহার সহিত কোন প্রকার বিষয়ানন্দই সমযোগ্য হয় না।

 এই ব্রহ্মানন্দ উপভোগ করিবার যাঁহাদিগের অভিলাষ হয়, তাঁহাদের কি রূপ আচরণ করা আবশ্যক? আপনাকে পবিত্র করা পবিত্রস্বরূপের সহবাস জনিত আনন্দ লাভ। করিবার প্রথম পথ। পাপ হইতে বিরত থাকা অপাপবিদ্ধ পরম পুরুষের প্রসন্নতা লাভের একমাত্র উপায়। যেমন শরীরের বিকার রোগ, সেই রূপ মনের বিকার পাপ। আত্ম-প্রসাদই মনের সুস্থতা, আত্ম-গ্লানিই মনের বিকৃতাবস্থা। শরীর সুস্থ না থাকিলে যেমন মন সুস্থ থাকে না, সেই রূপ মন প্রকৃতিস্থ না থাকিলে আত্মাও সুস্থতা লাভ করিতে পারে না। আমাদের আত্মা যদি অসুস্থ ও মলিন রহিল, তবে যিনি আমাদের আশার শেষ স্থল, প্রীতির পরমাস্পদ, তৃপ্তির একই তুমি, তাঁহাকে লাভ করিয়া আমরা সেই পরিশুদ্ধ আনন্দের আস্বাদ কি প্রকারে পাইতে পারি? তাহাতে সে আনন্দ উপভোগের প্রার্থনাও জন্মে না। পাপী ও পুণ্যাত্মা পরম্পর এত ভিন্ন, যেমন রোগী ও সুস্থ পুরুষ। বিকারী রোগী যেমন ক্রমিক জল পান করিয়াও পরিতোষ পায় না, সেই রূপ পাপী ব্যক্তি সম্ভোগসলিলে অনবরত বিলাস করিয়াও পরিতৃপ্ত হয় না। পাপেতে যতই লিপ্ত থাকা যায়, পাপ আপন অনুচরকে ততই আকর্যণ করিতে থাকে। পাপের সহিত বিশেষ রূপে প্রণয় বন্ধন হইলে, আর তাহার মলিনত্ব দেখা যায় না। পাপপঙ্কে নিমগ্ন থাকাই এখানকার নরক ভোগ। পাপীদিগের নিকটে ঈশ্বর উগ্র মূর্ত্তি ধারণ করেন—পাপীর পক্ষে তিনি মহদ্ভয়ং বজমুদ্যতং— ঈশ্বরের অপরাধী অসৎ সন্তান তাঁহার প্রেরিত দণ্ড ভোগ করিয়া তাঁহার পিতৃস্নেহ উপলব্ধি করিতে পারে না। কিন্তু তাঁহার দণ্ড স্নেহ সমন্বিত। তিনি আমাদিগকে আপন ক্রোড়ে আকর্ষণ করিবার জন্যই দণ্ড বিধান করেন। পাপের উপযুক্ত দণ্ড পাইয়া আমরা পাপ হইতে বিরত থাকি—ক্ষীণপাপ হইয়া তাঁহার পবিত্র সহবাসের প্রার্থনা করি এবং তাঁহাকে লাভ করিয়া নির্ম্মলানন্দ উপভোগ করি, ইহাই তাঁহার অভিপ্রায়।

 ঈশ্বরকে একবার লাভ করিতে পারিলে তাঁহাকে রক্ষা করিবার আকিঞ্চন সর্ব্বদাই জাগ্রৎ থাকে। কিন্তু সেই অমূল্য ধন রক্ষা করিবার উপায় কি? মনকে সুস্থ এবং, আত্মাকে সুস্থ রাখাই তাহার উপায়। সুনিশ্চল ধর্ম্মানুষ্ঠানে আপনাকে পবিত্র রাখাই তাহার উপায়। মধুস্বরূপ ধর্ম্ম যে কেবল পৃথিবীতে কল্যাণ উৎপাদন করেন, এমত নহে; ঈশ্বরের সন্নিধান প্রাপ্ত হইবার জন্যও ধর্ম্ম আমাদের সহায়। ধর্ম্মই ব্রহ্মধামের সোপানস্বরূপ। ধর্ম্মকে রক্ষা করিলে ধর্ম্ম আমাদিগকে ইহকালে রক্ষা করেন এবং আমাদের যথার্থ ধামে লইয়া যান। আমরা পাপ হইতে যত দূরে থাকি, পুণ্যের যত অনুষ্ঠান করি, ঈশ্বরস্পহার ততই উদ্দীপন হয়। ঈশ্বর যখন সেই মহতী স্পৃহাকে তৃপ্ত করেন, যখন তিনি তাঁহার সন্তাপ-হারিণী মূর্ত্তি প্রকাশ করেন, তখনই আমরা ভূমানন্দ লাভ করিয়া কৃতার্থ হই; তখনই আমরা জীবনের পূর্ণ সুখ ভোগ করি। সেই আনন্দ যে কেবল মুহ‍ুর্ত্ত কালের নিমিত্ত, তাহা নহে—সে আনন্দের যে একই প্রকার ভাব, তাহাও নহে। সেই আনন্দের ক্রমিকই উৎকর্ষ সাধন হইতে থাকে। স্বর্গ হইতে স্বর্গ লাভ; সুখ হইতে কল্যাণকর সুখের আস্বাদ গ্রহণ হইতে থাকে। মনুষ্যের সকল বিষয়েই হয় উন্নতি, নয় দুর্গতি। মনুষ্যের জ্ঞান ক্রমিক উন্নত হয়,—মনুষ্যের ধর্ম্ম ক্রমশঃ সবল হয়—মনুষ্যের মঙ্গল ভাব ক্রমে প্রশস্ত হইতে থাকে। আত্মারও উন্নতি হইতেছে। ঈশ্বরের সহিত আত্মার ক্রমিক নিকট সম্বন্ধ হইতে থাকে। ঈশ্বরের নিকটবর্ত্তী হওয়াই আত্মার প্রখর আশা। সেই সত্য পুরুষ এই মহতী আশাকে এখানেই পূর্ণ করিতেছেন। আত্মার সুস্থাবস্থাতে তাহার স্ফ‌ুর্ত্তি ও প্রভা দিন দিন বিবৃদ্ধ হয়। প্রতি সূর্য্যের উদয়ান্তের সঙ্গে সঙ্গে মেদিনীও যেমন নূতন নূতন বেশ ধারণ করে, আত্মাও সেই রূপ নূতন নূতন ভাবে বিরাজ করিতে থাকে। মন ও আত্মা যতই পবিত্র হয় ব্রহ্মানন্দ ততই দীপ্তি পায়। এখানে থাকিয়া ঈশ্বরের সঙ্গে যে সম্বন্ধ নিবদ্ধ করা হয়, অনন্ত কালেও তাহা ক্রটিত হইবার নহে যিনি এক বার আপনাকে উজ্জ্বল রূপে প্রকাশ করিয়াছেন, তিনি আমাদের জ্ঞাননেত্র হইতে আর কখনই অন্তরিত হইবেন না। এই আমাদের স্পৃহা এই আমাদের আশা। চন্দ্র যদিও মলিন হয়—সূর্য্য যদিও নিস্তেজ হয়—নক্ষত্রসকল যদিও নির্ব্বাণ হয়, তথাপি আমাদের আত্মার কখন বিনাশ হইবে না। ঈশ্বর আমাদিগকে তাঁহাকে পাইবার প্রখর আশা দিয়া কদাপি নিরাশ করিবেন না।

 পাপের সহিত লিপ্ত থাকিলে একে এখানে যন্ত্রণা, তাহাতে আবার ঈশ্বর হইতে বিচ্যুতি। আমরা যেন পাপ হইতে সর্ব্বদাই নিবৃত্ত থাকি; পাপকে বিষবৎ পরিত্যাগ করি; পাপচিন্তা, পাপালপ, পাপানুষ্ঠান, এই তিন প্রকার পাপ হইতে যেন প্রাণপণে দূরে থাকি। যদিও কখন পাপ-প্রলোভনে আকৃষ্ট অথবা মুগ্ধ হই, তবে ঈশ্বরের নিকটে অকৃত্রিম অনুশোচনা করিয়া যেন তাহা হইতে বিরত হই। অনুতাপ—অকৃত্রিম অনুতাপই পাপের প্রায়শ্চিত্ত।

ঈশ্বর কেবল ন্যায়বান্ রাজা নছেন, তিনি আমাদের করুণময় পিতা, আমাদের মঙ্গল সাধনই তাঁহার উদ্দেশ্য। আমরা অতি ক্ষীণস্বভাব; আমাদের এক বারও ধর্মপথ হইতে পদ স্থলিত হইবে না, এমন কথনই সম্ভব হয় না। আমরা যদি এক বার পতিত হইয়া সেই পতিত-পাবনের প্রসাদ হইতে এক কালে বঞ্চিত হই, তবে আমাদের উপায় কি—তবে আমাদের নিস্তার কোথায়! যখন পিতার নিকটে ক্রন্দন করিলে তিনি প্রসন্ন হইয়া আমাদের অপরাধ মার্জ্জনা করেন, যখন সাধু ব্যক্তির নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করিলে তিনি প্রশস্ত চিত্তে ক্ষমা বিতরণ করেন; তখন যিনি আমাদের পরম পিতা—যিনি পূর্ণ-মঙ্গল ও করুণাময় পাতা, তিনি কি অনুতাপিত হৃদয়কে কখনই শীতল করিবেন না। তিনি কি তাহার পতিত সন্তানের অকৃত্রিম ভাব দেখিলে ক্ষমা বিতরণে বিরত হইবেন? কখনই না। পরমেশ্বর যেমন রোগ শান্তির জন্য ঔষধের সৃজন করিয়াছেন, সেই প্রকার পাপের প্রতীকারের জন্য বিবিধ উপায় করিয়া দিয়াছেন। রোগী ব্যক্তি রোগ হইতে মুক্ত হইলেই যেমন আপনা আপনি জানিতে পারে, পাপীর ভাবও সেই প্রকার। যখন মন পাপেতে আসক্ত ও পতিত হয়, তখন তাহা আপনিই বুঝা যায় এবং যখন সে সেই পাপ হইতে পরিত্রাণ পায়, তখনও সহজে বুঝা যায় এবং তাহা বুঝিবার জন্য অন্যের সহিত মন্ত্রণা আবশ্যক হয় না। আত্ম-গ্লানি মনের রোগের লক্ষণ—আত্ম—প্রসাদই তাহার সুস্থতার লক্ষণ।

 মনুষ্য অপূর্ণ বস্তু —অতি ক্ষুদ্র জীব। মনুষ্য এক বারেই নিষ্পাপ হইবে, এমন কখনই সম্ভব হয় না। ঈশ্বরই এক মাত্র শুদ্ধ অপাপবিদ্ধ। কিন্তু ঈশ্বর মনুষ্যকে যে প্রকার বল দিয়াছেন, যে প্রকার কর্ত্তৃত্ব ভার দিয়াছেন, তাহাতে তাহার কিছুরই অনির্ব্বৃতি নাই। যাহাতে ধর্ম্মের পথে মনুষ্য উন্নতমস্তক থাকিতে পারে, তিনি তাহাকে এমত অতুল শক্তি দিয়াছেন। যাহাতে সে আপন প্রবৃত্তি ও অবস্থার সহিত সংগ্রাম করিয়া পুণ্যপদবীতে আরোহণ করিতে পারে, তিনি তাহাকে এমত অতুল শক্তি প্রদান করিয়াছেন। যাহাতে পশুভাব মনুষ্যের উপরে প্রভুত্ব না পায়—যাহাতে তাহার মহদ্ভাব সকল উন্নত ও স্ফূর্ত্তি যুক্ত হয়, তিনি এ প্রকার নানা উপায় বিধান করিয়াছেন। আবার তিনি মধুস্বরূপ ধর্ম্ম দিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, তিনি আপনাকে আমাদের নিকটে প্রকাশ রাখিয়া আমাদের আত্মাকে সহস্রগুণ বলে সবল করিয়াছেন। পাপ হইতে মুক্ত হইলে ঈশ্বরের পবিত্র সহবাস উপার্জন করা যায়, আবার ঈশ্বরের সহবাস লাভ করিলে আত্মা পবিত্র হয় এবং পাপের আসক্তিও তেমনি ক্ষীণ হইতে থাকে। পাপ। হইতে মুক্ত হওয়া প্রথমে আমাদের যত্নাধীন, পরে আমরা ঈশ্বরের প্রসাদ ও আশ্রয় পাইলে পাপ আরো দূরে পলায়ন করে। কিন্তু একে আমরা দুর্ব্বল, তাহাতে আবার অন্তরের কত শত্রু এবং বাহিরের কত শত্রু আমাদিগকে আক্রমণ করিতেছে, কায়মনোবাক্যে চেষ্টা ব্যতীত মনের পবিত্রতা ও আত্মার পবিত্রতা সম্পাদন করিতে কখনই সমর্থ হই না। যাহাদের ধর্ম্ম সরল আছে, ঈশ্বরম্পৃহা প্রবল আছে এবং আত্মা প্রকৃতিস্থ আছে, তাহারাও যখন মধ্যে মধ্যে ঈশ্বরের পথ হইতে স্খলিতপদ হয়; তথন তাহাদের কি দুর্দ্দশা, যাহারা স্বীয় কুপ্রবৃত্তির হস্তে আপনাকে অর্পণ করিয়া সংসার অরণ্যে বিচরণ করিতেছে। তাহাদের চিত্তভুজঙ্গ নিরন্তর কুটিলগামী হইয়া আপনার ও জন-সমাজের কত অনর্থই উৎপাদন করিতে থাকে।

 ধর্ম্ম-রত্ন লাভ করিবার আন্তরিক ইচ্ছা চাই। আন্তরিক ইচ্ছা থাকিলে দুর্ব্বলতার অনেক পরিহার হয়। আমাদের অসৎ ইচ্ছা এক, আর দুর্ব্বলতা এক, দুই পৃথক্ বিষয়। যাহাদের সাধু ইচ্ছা, সাধু ব্যবহার, তাহাদের দুর্ব্বলতা জনিত পতন এক প্রকার; আর যাহাদের লোক রক্ষাই সর্ব্বস্ব এবং কপট ব্যবহারই পৃথিবীতে চলিবার উপায়, তাহাদের পাপ-প্রকাশ-জনিত পতন অন্য প্রকার। সাধু ব্যক্তি এক বার পতিত হইলে ঈশ্বরের প্রসাদে আবার উদ্ধার হইয়া আত্ম-প্রসাদ লাভ করেন। তাঁহার পাপজনিত অনুশোচনা এবং অনুশোচনা-জনিত ঈশ্বরের প্রকাশ, এই উভয় প্রকারেই তিনি পাপ হইতে মুক্ত হয়েন। পাপ হইতে মুক্ত হইলে ঈশ্বরের সহিত সহবাসের প্রার্থনা জন্মে, সেই প্রার্থনার সঙ্গে সঙ্গে আত্মস্পৃহা সমধিক উজ্জ্বল হয় এবং তৎপরে ঈশ্বর স্বীয় সন্তাপহারিণী মূর্ত্তি প্রকাশ করিয়া সকল সন্তাপ হরণ করেন। ঈশ্বরম্পৃহা সঞ্চারের পূর্ব্বে এই উপদেশ; পাপের সহিত যেন সংস্পর্শ না হয়। ঈশ্বর-স্পৃহার উদ্দীপন হইলে এই উপদেশ; পা পর সহিত যেন সংস্পর্শ না হয় এবং ঈশ্বরের প্রকাশ কালেও এই উপদেশ; পাপের সহিত যেন সংস্পর্শ না হয়। এই প্রকার পাপ হইতে দূরে থাকিবার যাহার আন্তরিক ইচ্ছা, ঈশ্বর তাহার সহায়। ঈশ্বরই দুর্ব্বলের বল—ঈশ্বরই পাপীর পরিত্রাতা।