মাতৃ-স্নেহ ও ঈশ-স্তুতি/ঈশ-স্তুতি



অলক্তবরণ ধরি, পূৰ্ব্বদিক আলো করি
যবে আসি দিনমণি হইল উদয়।
পৰ্ব্বত শিখর পর, পশ্চাতে অসংখ্য নর,
ঈশ আসি উপস্থিত এমন সময়॥
প্রকাশিল ধরাতল, বায়ু বহে সুশীতল,
হেনকালে মহাপ্রভু স্তব আরম্ভিল।
করি বাহু উত্তোলন, নেত্ৰ করি উন্মীলন,
স্থির চিত্তে ঊৰ্দ্ধ্বমুখে চাহিয়া রহিল॥
ধ্যান ভঙ্গ হলে পরে, কহেন গম্ভীর স্বরে,
শুন সবে একমনে হয়ে সাবধান।
উচ্চ পদ তুচ্ছ কর, ব্ৰহ্ম নাম হৃদে ধর,
পিতার উদ্দেশে চল বাঁচিবে পরাণ॥

ধরাতলে পুণ্যমতি ধন্য সেই জন,
ধৰ্ম্মের ভিখারী যেই হয় অনুক্ষণ।

অবিরোধী যত লোক, নাহি পাবে কোন শোক,
তাহারাই ঈশ্বরের আদর-ভাজন;

ঈশ প্রতি ভক্তিহেতু পাবে যেবা ক্লেশ,
মনুষ্য সমাজে নিন্দা যাহার অশেষ,
স্বৰ্গবাস হবে তার, ভুঞ্জিবে সুখ অপার,
না রহিবে হৃদি-মাঝে অশান্তির লেশ।

শরীরের কোন অঙ্গ যদি মন্দ হয়,
অবিলম্বে সেই অঙ্গ কাটিবে নিশ্চয়।
এক অঙ্গ যদি যায়, নাহি কোন ক্ষতি তায়,
প্রাণধ্বংস করিও না রাখি সমুদয়।

তব অঙ্গে যদি কেহ করাঘাত করে,
কভু না বিরক্ত হ’য়ে তাহার উপরে।
শরীরের অন্য স্থান, উলটিয়া কর দান,
নিত্য-স্বৰ্গবাস হবে ইহজন্ম পরে।

বিপক্ষের প্রতি সদা প্রসন্ন থাকিবে,
কাহার সম্মুখে দান কভু না করিবে।

নির্জন স্থানে বসিয়া, উপাসনা কর গিয়া,
অক্ষয় ঐশ্বৰ্য্য ভোগ তা হলে হইবে।

যদি ইচ্ছ অন্যে তব করে উপকার,
অগ্ৰে উপকার তুমি করহ তাহার।
ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র, সুখে রবে দিবা রাত্র,
সৰ্ব্বদা আনন্দে মন রহিবে তোমার।

সঞ্চয় করোনা রত্ন পৃথিবী উপরে,
নষ্ট হবে চুরি করি লইবে তস্করে।
করি সবে আকিঞ্চন, স্বৰ্গপুরে রাখ ধন,
মৃত্যু পরে পাবে গিয়া অমর-নগরে।

অন্য দেহে এক ছিদ্র দেখিতে না পরি,
শত ছিদ্র নিজ দেহে না কর বিচার।
শুন ওরে দুষ্ট নর, নিজ দেহ শুদ্ধ কর,
তবে বলো অন্য জনে হতে পরিষ্কার।

বিশুদ্ধ অমৃত ধৰ্ম্ম কর অন্বেষণ,
হইবে সকল সুখ পশ্চাতে মিলন।

কল্য কি হইবে বলে, ভাবিছ কেন সকলে,
আজি গতি কি হইবে ভাবহ এখন।

সমাপ্ত হইল যবে ঈশ-উপদেশ,
জয়ধ্বনি করে সবে আনন্দে তাশেষ।
মহাব্যাধি আদি যত রোগ ভয়ঙ্কর,
প্রভুর স্পর্শন মাত্র হয় অগোচর।
পৃথিবী ব্যাপিয়া কীর্ত্তি বাড়ে কিছু কাল,
হিংসা করি পাপাত্মারা ফেলে কূট জাল।
অবশেষে মারিবারে করে আয়োজন,
কৃতঘ্ন শিষ্যের সঙ্গে করিয়া মিলন।

8

দুদিকে তস্কর, ক্রুশের উপর,
প্রাণদণ্ড করিবারে শ্মশানে আনিল—
ঈশকে লইয়া, ক্রুশে চড়াইয়া,
কণ্টক মুকুট তাঁর শিরে পরাইল।

লোকারণ্য চতুর্দ্দিকে হইল তখন,
শিরে করাঘাত করি কান্দে সৰ্ব্বজন।

যাহারা নিষ্পাপ দেহে কণ্টক বিঁধিল,
আপনার সর্ব্বনাশ আপনি করিল।

শোকার্ত্ত দেখিয়া লোকে সাধু একজন,
সকলেরে বলে শুন ঈশ-বিবরণ।
কুমারীর গর্ব্ভে জন্ম হয়েছে তাঁহার,
প্রভুর রুধিরে নর পাইবে নিস্তার।
সকলের পাপ ভার স্কন্ধেতে লইয়া,
তিন দিন পরে স্বর্গে যাবেন চলিয়া।
তাঁহা হতে এই কীৰ্ত্তি ধরাতে হইল,
বোবা কথা কয় আর বধির শুনিল।
মরা লোক বাঁচিয়াছে ঈশ স্পর্শ করে,
চলিতে দেখেছ তারে সমুদ্র উপরে।
খোঁড়ার হয়েছে পদ, অন্ধ চক্ষু পায়,
নব তরু ঈশ-কোপে শুকাইয়া যায়।
পঞ্চরুটি দুই মৎস্য দিলেন তুলিয়া,
খাইল অসংখ্য লোক উদর পূরিয়া।

হায় হায়! পাপিষ্ঠেরা কি কাজ করিল,
সেই ধৰ্ম্মরাজে মারি বংশ মজাইল।

সাধুর অদ্ভূত বাক্য হবামাত্র সায়,
ক্রুশ হতে এই শব্দ শুনিবারে পায়।
"হা পিতঃ হা পিতঃ কেন ত্যজিলে আমায়।”

"ইহারা করিল দোষ অজ্ঞান কারণ,
ক্ষম পিতঃ–রাখ এই তনয়-বচন।
তব পদে করিলাম আত্ম সমর্পণ।”

যেমনি সে ধৰ্ম্ম রাজ নয়ন মুদিল,
চতুর্দ্দিক্‌ অন্ধকারে আচ্ছন্ন হইল।
তখনি সে সাধুজন হ’ল অন্তর্ধান,
অসংখ্য পৰ্ব্বত ফাটি হ’ল খান খান।
মহাশব্দে ভূমিকম্প হইতে লাগিল,
পবিত্র মন্দির-বস্ত্র ছিঁড়িয়া পড়িল।
ঘোর রবে অনাবৃত হইল কবর,
মৃত দেহ উঠে বসে তাহার উপর।

আশ্চর্য্য ব্যাপার—সবে চমৎকার!
সহসা আকাশবাণী করিল শ্রবণ।
প্রভু মৃত্যুঞ্জয়, নাহি তাঁর ক্ষয়,
স্বস্থানে প্রস্থান কর, করোনা রোদন।

বিশ্বের জনক যিনি, এমনি দয়াল তিনি,
পাপীগণে উদ্ধারিতে পাঠালেন তনয়ে।
নিরঞ্জন নাম ধরি, মহীতলে অবতরি,
ধৰ্ম্মবীজ দিয়াছেন বিশ্বজন-হৃদয়ে।

বিশ্বাস নয়ন, কর উন্মীলন,
বিশুদ্ধ ধৰ্ম্মের পন্থা করহ গ্রহণ।
আর নাহি মৃত্যু ভয়, যতোধৰ্ম্মস্ততোজয়,
প্রেমানন্দে ভাই সবে কর আলিঙ্গন।

ওহে প্ৰভু ধৰ্ম্মরাজ, এস হে হৃদয় মাঝ,
কর হে পিতার কায, ক্ষম দয়াময় হে।
অজ্ঞান হইয়া আমি, ভজি নাই বিশ্ব-স্বামী,
হইব নরকগামী, জানি তা নিশ্চয় হে॥
এ পাতকী জন, অন্ধের মতন,
না সেবি চরণ, কাটিল জীবন হে।
কি হবে উপায়, নাহি জানি হায়,
কর সদুপায় অধমতারণ হে॥
কর প্রভু পরিত্রাণ, রক্ষ মোর পাপ প্রাণ,
আমি হে অতি অজ্ঞান, কিসে মুক্ত হব হে।
বিষম পাপ সংসার, হইব কিসে উদ্ধার,
ওহে প্ৰভু সারাৎসার, কত সুরি কব হে॥
দেখিয়া ধরায়, কীৰ্ত্তি-সমুদায়,
নয়ন যুড়ায় সুখের আধার হে।

পিতা তুমি কি কৌশলে, গড়িয়াছ এ সকলে,
রাখিয়াছ ভূমণ্ডলে এ ধরা শোভিতে হে॥
পালিতে এ জীবগণ, কত খাদ্য অগণন,
করিয়াছ হে সৃজন মহিমা ঘুষিতে হে।
এমনি দয়া তোমার, চৌদিকে দেখি প্রচার,
এক মুখে বলা ভার ওহে কৃপাময় হে॥
খুলি হৃদি সিংহাসন, রাখি তব শ্রীচরণ
পূজি সদা সৰ্ব্বক্ষণ ভক্তি উপহারে হে।

মরি মরি কি আশ্চর্য্য করুণ তোমার,
বলিতে কি পারি তাহা, কি সাধ্য আমার।
অসীম তোমার স্নেহ হয়ে বিস্মরণ
কাটিলাম ওহে প্রভু সমস্ত জীবন।
ভাবিয়া সে পাপ নাথ কাঁপিতেছে কায়,
তুমি না করিলে দয়া নাহিক উপায়।
পাপাত্মার যত দোষ কর হে মোচন,
কর যোড়ে ও চরণে করি নিবেদন।

অনিত্য বস্তুর লাগি ভুলিয়া তোমায়,
পাপ-পঙ্কে ডুবিলাম ও হে দয়াময়।
নিদারুণ পাপ দণ্ড করিয়া স্মরণ
অশ্ৰু-জলে দিবানিশি ভাসিছে নয়ন।
এ পাপ সংসার ত্যজি যাইব যখন,
আমারে রাখিও নিজ চরণে তখন।
দিও না কঠিন দণ্ড ও হে দণ্ড-ধর,
প্রসন্ন হইও পিতঃ পাপাত্মা উপর।
অশেষ আমার পাপ ওহে বিশ্বপতি,
তুমি রক্ষা না করিলে নাহিক নিস্কৃতি।
অখণ্ড নিয়ম তব করিতে পালন,
এ পাপ অন্তর যেন করে আকিঞ্চন।
ও শ্রীপদে ভক্তি ঘেন থাকে সর্ব্বক্ষণ,
এই ভিক্ষা এ দাসীরে কর বিতরণ।

মাতৃ-স্নেহ ও ঈশ-স্তুতি (page 25 crop).jpg

সম্পূর্ণ।