মানসী/নিন্দুকের প্রতি নিবেদন

নিন্দুকের প্রতি নিবেদন

হউক ধন্য তােমার যশ,
লেখনী ধন্য হােক,
তােমার প্রতিভা উজ্জ্বল হয়ে
জাগাক সপ্তলােক।
যদি পথে তব দাঁড়াইয়া থাকি
আমি ছেড়ে দিব ঠাঁই—
কেন হীন ঘৃণা, ক্ষুদ্র এ দ্বেষ,
বিদ্রুপ কেন ভাই!
আমার এ লেখা কারাে ভালাে লাগে
তাহা কি আমার দোষ?
কেহ কবি বলে (কেহ বা বলে না)—
কেন তাহে তব রােষ?


কত প্রাণপণ, দগ্ধ হৃদয়,
বিনিদ্র বিভাবরী—
জান কি, বন্ধু, উঠেছিল গীত
কত ব্যথা ভেদ করি?
রাঙা ফুল হয়ে উঠেছে ফুটিয়া
হৃদয়শোণিতপাত,
অশ্রু ঝলিছে শিশিরের মতাে
পােহাইয়ে দুখরাত।

উঠিতেছে কত কণ্টকলতা,
ফুলে পল্লবে ঢাকে—
গভীর গােপন বেদনা-মাঝারে
শিকড় আঁকড়ি থাকে;
জীবনে যে সাধ হয়েছে বিফল
সে সাধ ফুটিছে গানে—
মরীচিকা রচি মিছে সে তৃপ্তি,
তৃষ্ণা কাঁদিছে প্রাণে।
এনেছি তুলিয়া পথের প্রান্তে
মর্মকুসুম মম—
আসিছে পান্থ, যেতেছে লইয়া
স্মরণচিহ্নসম।
কোনাে ফুল যাবে দুদিনে ঝরিয়া,
কোনাে ফুল বেঁচে রবে,
কোনাে ছােটো ফুল আজিকার কথা
কালিকার কানে কবে।


তুমি কেন, ভাই, বিমুখ এমন,
নয়নে কঠোর হাসি—
দূর হতে যেন ফুঁসিছ সবেগে
উপেক্ষা রাশি রাশি।
কঠিন বচন জরিছে অধরে
উপহাস-হলাহলে—

লেখনীর মুখে করিতে দগ্ধ
ঘৃণার অনল জ্বলে।


ভালােবেসে যাহা ফুটেছে পরানে
সবার লাগিবে ভালাে,
যে জ্যোতি হরিছে আমার আঁধার
সবারে দিবে সে আলো,
অন্তরমাঝে সবাই সমান—
বাহিরে প্রভেদ হবে—
একের বেদনা করুণাপ্রবাহে
সান্ত্বনা দিবে সবে,
এই মনে ক’রে ভালােবেসে আমি
দিয়েছিনু উপহার।
ভালাে নাহি লাগে ফেলে যাবে চলে,
কিসের ভাবনা তার!


তােমার দেবার যদি কিছু থাকে
তুমিও দাও-না এনে,
প্রেম দিলে সবে নিকটে আসিবে
তােমারে আপন জেনে।
কিন্তু, জানিয়ো আলােক কখনো
থাকে না তাে ছায়া বিনা—

ঘৃণার টানেও কেহ বা আসিবে,
তুমি করিয়াে না ঘৃণা।
এতই কোমল মানবের মন,
এমনি পরের বশ,
নিষ্ঠুর বাণে সে প্রাণ ব্যথিতে
কিছুই নাহিকো যশ।
তীক্ষ্ণ হাসিতে বাহিরে শােণিত,
বচনে অশ্রু উঠে,
নয়নকোণের চাহনি-ছুরিতে
মর্মতন্তু টুটে।
সান্ত্বনা দেওয়া নহে তাে সহজ,
দিতে হয় সারা প্রাণ—
মানবমনের অনল নিভাতে
আপনারে বলিদান।


ঘৃণা জ্ব’লে মরে আপনার বিষে,
রহে না সে চিরদিন।
অমর হইতে চাহ যদি, জেনে
প্রেম সে মরণহীন।
তুমিও রবে না, আমিও রব না,
দুদিনের দেখা তবে—
প্রাণ খুলে প্রেম দিতে পারে যদি
তাহা চিরদিন রবে।

দুর্বল মােরা, কত ভুল করি—
অপূর্ণ সব কাজ।
নেহারি আপন ক্ষুদ্র ক্ষমতা
আপনি যে পাই লাজ।
তা বলে যা পারি তাও করিব না?
নিষ্ফল হব ভবে?
প্রেমফুল ফোটে, ছােটো হল বলে
দিব না কি তাহা সবে?
হয়তাে এ ফুল সুন্দর নয়,
ধরেছি সবার আগে—
চলিতে চলিতে আঁখির পলকে
ভুলে কারাে ভালাে লাগে।
যদি ভুল হয়, কদিনের ভুল!
দুদিনে ভাঙিবে তবে।
তােমার এমন শাণিত বচন
সেই কি অমর হবে?


২০ জ্যৈষ্ঠ ১৮৮৮