মানসী/বিচ্ছেদের শান্তি

বিচ্ছেদের শান্তি

সেই ভালাে, তবে তুমি যাও।
তবে আর কেন মিছে করুণ নয়নে
আমার মুখের পানে চাও?
এ চোখে ভাসিছে জল, এ শুধু মায়ার ছল,
কেন কাঁদি তাও নাহি জানি।
নীরব আঁধার রাতি,  তারকার ম্লান ভাতি,
মােহ আনে বিদায়ের বাণী।
নিশিশেষে দিবালােকে  এ জল রবে না চোখে,
শান্ত হবে অধীর হৃদয়—
জাগ্রত জগতমাঝে  ধাইব আপন কাজে,
কাঁদিবার রবে না সময়।

দেখেছি অনেক দিন  বন্ধন হয়েছে ক্ষীণ,
ছেঁড় নাই করুণার বশে।
গানে লাগিত না সুর,  কাছে থেকে ছিলে দূর,
যাও নাই কেবল আলসে।
পরান ধরিয়া তবু  পারিতাম না তাে কভু
তােমা ছেড়ে করিতে গমন।
প্রাণপণে কাছে থাকি দেখিতাম মেলি আঁখি
পলে পলে প্রেমের মরণ।
তুমি তাে আপনা হতে  এসেছ বিদায় ল’তে—
সেই ভালাে, তবে তুমি যাও।

যে প্রেমেতে এত ভয়  এত দুঃখ লেগে রয়
সে বন্ধন তুমি ছিঁড়ে দাও।

আমি বহি এক ধারে,  তুমি যাও পরপারে,
মাঝখানে বহুক বিস্মৃতি।
একেবারে ভুলে যেয়াে, শতগুণে ভালাে সেও—
ভালাে নয় প্রেমের বিকৃতি।
কে বলে যায় না ভােলা! মরণের দ্বার খােলা,
সকলেরই আছে সমাপন।
নিবে যায় দাবানল,  শুকায় সমুদ্রজল,
থেমে যায় ঝটিকার রণ।
থাকে শুধু মহা শান্তি,   মৃত্যুর শ্যামল কান্তি,
জীবনের অনন্ত নির্ঝর—
শত সুখ দুঃখ দ’লে   কালচক্র যায় চলে,
রেখা পড়ে যুগ-যুগান্তর।

যেখানে যে এসে পড়ে  আপনার কাজ করে
সহস্র জীবন-মাঝে মিশে—
কত যায় কত থাকে,  কত ভােলে কত রাখে,
চলে যায় বিষাদে হরিষে।
তুমি আমি যাব দূরে,   তবুও জগৎ ঘুরে,
চন্দ্র সূর্য জাগে অবিরল—
থাকে সুখ দুঃখ লাজ,  থাকে শত শত কাজ,
এ জীবন হয় না নিষ্ফল।

মিছে কেন কাটে কাল, ছিঁড়ে দাও স্বপ্নজাল,
চেতনার বেদনা জাগাও—
নূতন আশ্রয়ঠাঁই,  দেখি পাই কি না পাই।
সেই ভালাে তবে তুমি যাও।

১৪ অগ্রহায়ণ ১৮৮৭