মানসী/বিরহানন্দ

বিরহানন্দ

এই ছন্দে যে যে স্থানে ফাঁক
সেই স্থানে দীর্ঘ যতিপতন আবশ্যক

ছিলাম নিশিদিন  আশাহীন  প্রবাসী
বিরহতপােবনে  আনমনে  উদাসী।
আঁধারে আলাে মিশে  দিশে দিশে  খেলিত,
অটবী বায়ুবশে  উঠিত সে  উছাসি।
কথনাে ফুল দুটো  আঁখিপুট  মেলিত,
কখনাে পাতা ঝরে  পড়িত রে  নিশাসি।

তবু সে ছিনু ভালো  আধা-আলাে-  আঁধারে,
গহন শত-ফের  বিষাদের  মাঝারে।
নয়নে কত ছায়া  কত মায়া  ভাসিত,
উদাস বায়ু সে তাে ডেকে যেত  আমারে।
ভাবনা কত সাজে  হৃদিমাঝে  আসিত,
খেলাত অবিরত  কত শত  আকারে।

বিরহপরিপূত  ছায়াযুত  শয়নে
ঘুমের সাথে স্মৃতি  আসে নিতি  নয়নে।
কপােতদুটি ডাকে  বসি শাখে  মধুরে,
দিবস চলে যায়  গলে যায়  গগনে।
কোকিল কুহুতানে  ডেকে আনে  বধুরে,
নিবিড় শীতলতা  তরুলতা  গহনে।

আকাশে চাহিতাম  গাহিতাম  একাকী,
মনের যত কথা  ছিল সেথা  লেখা কি!
দিবসনিশি ধ’রে  ধ্যান ক’রে  তাহারে
নীলিমা-পরপার  পাব তার  দেখা কি!
তটিনী অনুখন  ছােটে কোন্  পাথারে,
আমি যে গান গাই  তারি ঠাঁই  শেখা কি!

বিরহে তারি নাম  শুনিতাম  পবনে,
তাহারি সাথে থাকা  মেঘে-ঢাকা  ভবনে।
পাতার মরমর  কলেবর  হরষে,
তাহারি পদধ্বনি  যেন গণি  কাননে।
মুকুল সুকুমার  যেন তার  পরশে,
চাঁদের চোখে ক্ষুধা  তারি সুধা  স্বপনে।

করুণা অনুখন  প্রাণ মন  ভরিত,
ঝরিলে ফুলদল  চোখে জল  ঝরিত।
পবন হুহু ক’রে  করিত রে  হাহাকার,
ধরার তরে যেন  মাের প্রাণ  ঝুরিত।
হেরিলে দুখে শোকে  কারো চোখে  আঁখিধার
তােমারি আঁখি কেন  মনে যেন  পড়িত!

শিশুরে কোলে নিয়ে  জুড়াইয়ে  যেত বুক,
আকাশে বিকশিত  তােরি মতাে  স্নেহমুখ।
দেখিলে আঁখি-রাঙা  পাখা-ভাঙা  পাখিটি
‘আহাহা’ ধ্বনি তাের  প্রাণে মাের  দিত দুখ।

মুছালে দুখনীর  দুখিনীর  আঁখিটি
জাগিত মনে ত্বরা  দয়া-ভরা  তোর সুখ।

সারাটা দিনমান  রচি গান  কত-না,
তােমার পাশে রহি  যেন কহি  বেদনা।
কানন মরমরে  কত স্বরে  কহিত,
ধ্বনিত যেন দিশে  তােমারি সে  রচনা।
সতত দূরে কাছে  আগে পাছে  বহিত
তােমারি যত কথা  পাতা-লতা  ঝরনা।

তােমারে আঁকিতাম,  রাখিতাম  ধরিয়া
বিরহ ছায়াতল  সুশীতল  করিয়া
কখনাে দেখি যেন  ম্লান-হেন  মুখানি,
কখনাে আঁখিপুটে  হাসি উঠে  ভরিয়া।
কখনাে সারা রাত  ধরি হাত  দুখানি
রহি গাে বেশবাসে  কেশপাশে  মরিয়া।

বিরহ সুমধুর  হল দূর  কেন রে।
মিলনদাবানলে  গেল জ্বলে  যেন রে।
কই সে দেবী কই,  হেরো ওই  একাকার—
শ্মশানবিলাসিনী  বিবাসিনী  বিহরে।
নাই গাে দয়ামায়া,  স্নেহছায়া  নাহি আর—
সকলি করে ধু ধু,  প্রাণ শুধু  শিহরে।

জ্যৈষ্ঠ ১৮৮৭