প্রধান মেনু খুলুন

শেষের কবিতা

দুই সখী যোগমায়ার বাগানে বাইরের দরজা পার হয়ে চাকরদের কাউকে দেখতে পেলে না। গাড়িবারান্ডায় এসে চোখে পড়ল বাড়ির রোযাকে একটি ছোটো টেবিল পেতে একজন শিক্ষায়িত্রী ও ছাত্রীতে মিলে পড়া চলছে। বুঝতে বাকি রইল না। এরই মধ্যে বড়োটি লাবণ্য। কেটি টক্‌ টক্‌ করে উপরে উঠে ইংরেজিতে বললে, ‘ দুঃখিত।’ লাবণ্য চৌকি ছেড়ে উঠে বললে, কাকে চান আপনারা?. কেটি এক মুহুর্তে লাবণ্যের আপাদমস-কে দৃষ্টিটাকে প্রখর ঝাটার মতো দ্রুত বুলিয়ে নিয়ে বললে, ‘ মিস্টার অমট্রায়ে এখানে এসেছেন কি না খবর নিতে এলুম।’ লাবণ্য হাঠাৎ বুঝতেই পারলে না ‘অমিট্রায়ে’ কোন্‌ জাতের জীব। বললে, ‘ তাঁকে তো আমরা চিনি নে।’ অমনি দুই সখীতে একটা বিদ্যুচ্চকিত চোখ-ঠরাঠারি হয়ে গেল, মুখে পড়ল একটা আড়হাসির রেখা কেটি ঝাজিয়ে উঠে মাথা নাড়া দিয়ে বললে, ‘ আমরা তো জানি এ বাড়িতে তাঁর যাওয়া আশা আছে ড়ভঃবহবৎ ঃযধহ রং মড়ড়ফ ভড়ৎ যরস’ ভাব দেখে লাবণ্য চমকে উঠল, বুঝলে এরা কে আরও কী ভুলটাই করেছে। অপ্রস’ত হয়ে বললে, ‘ কর্তামাকে ডেকে দিই, তাঁর কাছে খবর পাবেন।’ লাবণ্য চলে গেলেই সুরমাকে কেটি সংক্ষেপে জিজ্ঞাসা করলে, ‘ তোমার টিচার?’ ‘ হা।’ ‘ নাম বুঝি লাবণ্য।’ ‘ হা।’ ‘ গট ম্যাচেস?’ হঠাৎ দেশালাইয়ের প্রয়োজন আন্দাজ করতে না পেরে সুরমা কথাটার মানেই বুঝলে না। মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কেটি বললে, ‘ দেশালাই।’ সুরমা দেশলাইয়ের বাক্স নিয়ে এল। কেটি সিগারেট ধরিয়ে টানতে টানতে সুরমাকে জিজ্ঞাসা করলে, ‘ ইংরেজি পড়।’ সুরমা স্বীকৃতিসূচক মাথা নেড়েই ঘরের দিকে দ্রুত চলে গেল। কেটি বললে, ‘গবর্নেসের কাছে মেয়েটা আর যাই শিখুক ম্যানারস্‌ শেখে নি।’ তার পরে দুই সখীতে টিপ্পনী চলল। ‘ ফেমাস লাবণ্য। ডিল্লীশস্‌ ! শিলঙ পাহাড়টাকে ভল্‌ক্যানো বানিয়ে তুলেছে, ভুমিকম্পে অমিটের হৃদয়ডাঙায় ফাটল ধরিয়ে দিলে, এ ধার থেকে ও ধার সিলি! মেন আর ফানি!’ সিসি উচ্চেঃস্বরে হেসে উঠল। এই হাসিতে ঔদার্য ছিল। কেননা, পুরুষমানুষ নির্বোধ বলে সিসির পক্ষে আক্ষেপের কারন ঘটে নি। সে তো পাথুরে জমিতে ও ভুুমিকম্প ঘটিয়েছে, দিয়েছে একেবারে চৌচির করে। কিন’ এ কী সৃষ্টিছাড়া ব্যপার! এক দিকে কেটির মতো মেয়ে, আর অন্য দিকে ঐ অদ্ভুত ধরনে কাপড়-পরা গবর্নেস। মুখে মাখন দিলে গলে না, যেন এতকাল ভিজে ন্যাকড়া; কাছে বসলে মানটাতে বাদলার বিস্কুটের মতো ছাতা পড়ে যায়। কী করে অমিট ওকে এক মোমেন্টও সহ্য করে। ‘ সিসি, তোমার দাদার মনটা চিরদিন উপরে পা করে হাটে। কোন এক সৃষ্টিছাড়া উলটো বুদ্ধিতে এই মেয়েটাকে হঠাৎ মনে হয়েছে এঞ্জেল।’ এই বলে টেবিলে অ্যালজেব্রার বইয়ের গায়ে সিগারেটটা ঠেকিয়ে রেখে কেটি ওর রুপোর শিকল ওয়ালা প্রসাধনের থলি বের করে মুখে একটুখানি পাউডার লাগালে, অঞ্জনের পেনসিল নিয়ে ভুরুর রেখাটা একটু ফুটিয়ে তুললে। দাদার কান্ডজ্ঞানহীনতায় সিসির যথেষ্ট রাগ হয় না, এমন-কি, ভিতরে ভিতরে একটু যেন স্নেহই হয়। সমস- রাগটা পড়ে পুরুষদের মুগ্ধনয়ন বিহারীনি মেকি এঞ্জেলদের’ পরে। দাদা সম্বন্ধে সিসির এই সকৌতুক ঔদাসীন্যে কেটির ধৈর্যভঙ্গ হয়। খুব করে ঝাঁকনি দিয়ে নিতে ইচ্ছে করে। এমন সময়ে দাদা গরদের শাড়ি পরে যোগমায়া বেরিয়ে এলেন। লাবন্য এল না। কেটির সঙ্গে এসেছিল ঝাঁকড়া চুলে- দুইচোখ আচ্ছন্নপ্রায় ক্ষুদ্রকায়া ট্যাবি-নাম ধারী কুকুর। সে একবার ঘ্রানের দ্বারা লাবণ্য ও সুরমার পরিচয় গ্রহন করেছে। যোগমায়াকে দেখে হঠাৎ কুকুরটার মনে কিছু উৎসাহ জন্মালো। তাড়াহাড়ি গিয়ে সামনের দুটো পা দিয়ে যোগমায়ার নির্মল শাড়ির উপর পঙ্কিল স্বাক্ষর অঙ্কিত করে দিয়ে কৃত্রিম প্রীতি জ্ঞাপন করলে। সিসি ঘাড় ঘরে টেনে আনলে কেটির কাছে, কেটি তার নাকের উপর তর্জনী তাড়ন করে বললে, ‘ নটি ডগ!’ কেটি চৌকি থেকে উঠলই না। সিগারেট টানতে টানতে অত্যন- নির্লিপ্ত আড়ভাবে একটু ঘাড় বাঁকিয়ে যোগমায়াকে নিরীক্ষণ করতে লাগল। যোগমায়ার’ পরে তার আক্রোশ বোধ করি লাবণ্যর চেয়েও বেশি। ওর ধারণা লাবণ্যর ইতিহাসে একটা খুঁত আছে। যোগমায়াই মাসি সেজে অমিতর হাতে তাকে গতিয়ে দেবার কৌশল করছে। পুরুষমানুষকে ঠকাতে অধিক বুদ্ধির দরকার করে না বিধাতার স্বহসে–তৈরি ঠুলি তাদের দুই চোখে পরানো। সিসি সামনে এসে যোগমায়াকে নমস্কারের একুট আভাস দিয়ে বললে, ‘ আমি সিসি, অমির বোন।’ যোগমায়া একটু হেসে বললেন, ‘ অমি আমাকে মাসি বলে, সেই সম্পর্কে আমি তোমারও মাসি হই মা!’ কেটির রকম দেখে যোগমায়া তাকে লক্ষ্যই করলেন না। সিসিকে বললেন, ‘ এসো মা, ঘরে বসবে এসো।’ সিসি বললে, ‘ সময় নেই, কেবল খবর নিতে এসেছি অমি এসেছে কিনা।’ যোগমায়া বললেন, ‘এখনো আসে নি।’ ‘ কখন আসবেন জানেন?’ ‘ ঠিক বলতে পারি নে। আচ্ছা, আমি জিজ্ঞাসা করে আসি গে।’ কেটি তার স্বস’ানে বসেই তীব্রস্বরে বলে উঠল, ‘ যে মাষ্টারনী এখানে বসে পড়াচ্ছিল সে তো ভান করলে আমিটাকে সে কোনোকালে জানেই না।’ যোগমায়া বাঁধা লেগে গেল। বুঝলেন কোথাও একটা গোল আছে। এও বুঝলেন এদের কাছে মান রাখা শক্ত হবে। ্‌ক মুহুর্তে মাসিত্ব পরিহার করে বললেন, ‘ শুনেছি অমিতবাবু আপনাদের হোটেলেই থাকেন, তার খবর আপনাদেরই জানা আছে।’ কেটি বেশ একটু স্পষ্ট করে ই হাসলে। তাকে ভাষায় বললে বোঝায়, লুকোতে পারো, ফাঁকি দিতে পরাবে না। আসল কথা, গোড়াতেই লাবণ্যকে দেখে এবং অমিকে সে চেনে না শুনে কেটি মনে মনে আগুন হয়ে আছে। কিন’ সিসির মনে আশঙ্কা আছে মাত্র, জ্বালা নেই; যোগমায়ার সুন্দর মুখের গাম্ভীর্য তার মনকে টেনেছিল। তাই, যখন দেখলে কেটি তাকে স্পষ্ট আবজ্ঞা দেখিয়ে চৌকি ছাড়লে না, তার মনে কেমন সংকোচ লাগল। অথচ কোন বিষয়ে কেটির বিরুদ্ধে যেতে সাহস হয় না। কেননা, কেটি সিডিশন দমন করতে ক্ষিপ্রহস- -একটু সে বিরোধ সয় না কর্কশ ব্যবহারে তার কোন সংকোচ নেই। অধিকাংশ মানুষই ভীরু, অকুন্ঠিত দুর্ব্যবহারের কাছে তারা হার মানে। নিজের অজস্র কঠোরতায় কেটির একটা গর্ব আছে; যাকে সে মিষ্টিমুখো ভালোমানুষি বলে, বন্ধুদের মধ্যে তার কোন লক্ষণ দেখলে তাকে সে অসি’র করে তোলে। রূঢ়তাকে সে অকপটতা বলে বড়াই করে, এই রূঢ়তার আঘাতে যারা সংকুচিত তারা কোনোমতে কেটিকে প্রসন্ন রাখতে পারলে আরাম পায়। সিসি সেই দলের-সে কেটিকে মনে মনে যতই ভয় করে ততই তার নকল করে; দেখাতে যা সে দুর্বল নয়। সব সময় পেরে ওঠে না। কেটি আজ বুঝেছিল যে, তার ব্যবহারের বিরুদ্ধে সিসির মনের কোণে একটা মুখচোরা আপত্তি লুকিয়ে ছিল। তাই সে ঠিক করেছিল, যোগমায়ার সামনে সিসির এই সংকোচ কড়া করে ভাঙতে হবে। চৌকি থেকে উঠল, একটা সিগারেট নিয়ে সিসির মুখে বসিয়ে দিলে, নিজের ধরানো সিগারেট মুখে করেই সিসির সিগারেট ধরাবার জন্যে মুখ এগিয়ে নিয়ে এল। প্রত্যাখান করতে সিসি সাহস করলে না। কানের ডড়াটা একটুখানি লাল হয়ে উঠল। তবু জোর করে এমনি একটা ভাব দেখালে যেন তাদের হাল পাশ্চাত্যিকতায় যাদের ভ্রূ এতটুকু কুঞ্চিত হবে তাদের মুখর উপর ও তুড়ি মারতে প্রস’ত-ঃযধঃ সঁপয ভড়ৎ রঃ!

ঠিক সেই সময়টাতে অমিত এসে উপসি’ত। মেয়েরা তো অবাক। হোটেল থেকে যখন সে বেরিয়ে এল মাথায় ছিল ফেল্ট হ্যাট, গায়ে ছিল বিলিতি কোর্তা। এখানে দেখা যাচ্ছে, পরনে তার ধুতি আর শাল। এই বেশান-রের আড্ডা ছিল তার সেই কুটিরে। সেখানে আছে একটি বইয়ের শেল্‌ফ, একটি কাপড়ের তোরঙ্গ, আর যোগমায়ার দেওয়া একটি আরাম-কেদারা। হোটেল থেকে মধ্যাহ্নভোজন সেরে এই খানে সে আশ্রয় নেয়। আজকাল লাবন্যর শাসন কড়া, সরমাকে পড়ানোর সময়ের মাঝখানটাতে জলপ্রপাত বা কমলালেবুর সন্ধানে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। সেইজন্য বিকেলে সাড়ে চারটে বেলা চা-পান সভার পূর্বে এ বাড়িতে দৈহিক মানসিক কোনো প্রকার তৃষ্ণা নিবারণের সৌজন্য সম্মত সুযোগ অমিতর ছিল না। এই সময়টা কোনোমতে কাটিয়ে কাপড় ছেড়ে যথা নির্দিষ্ট সময়ে এখানে যে আসত। আজ হোটেল থেকে বেরোবার আগেই কোলকাতা থেকে এসেছে তার আংটি। কেমন করে সে সেই আংটি লাবন্যকে পরাবে তার সমস- অনুষ্ঠানটা সে বসে বসে কল্পনা করেছে। আজ হল ওর একটা বিশেষ দিন। এ দিনকে দেউড়িতে বসিয়ে রাখা চলবে না। আজ সব কাজ বন্ধ করা চাই। মনে মনে ঠিক করে রেখেছে লাবণ্য যেখানে পড়াচ্ছে সেইখানে গিয়ে বলবে, ‘একদিন হাতিতে চড়ে বাদশা এসেচিল, কিন’ তোরণ ছোটো, পাছে মাথা হেট করতে হয় তাই সে ফিরে গেছে, নতুন-তৈরি তুমি খাটো করে রেখেছ-সেটাকে ভাঙো, রাজা মাথা তুলেই তোমার ঘরে প্রবেশ করুন।’ অমিত এ কথাও মনে করে এসেছিল যে ওকে বলবে, ‘ঠিক সময়টাতে আসাকেই বলে পাঙ্কচুয়ালিটি; কিন’ ঘড়ির সময় ঠিক সময় নয়; ঘড়ি সময়ের নম্বর জানে, তার মুল্য জানবে কী করে?’ অমিত বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখলে, মেঘে আকাশটা ম্লান, আলোর চেহারাটা বেলা পাঁচটা ছটার মতো। অমিত ঘড়ি দেখলে না, পাছে ঘড়িটা তার অভদ্র ইশারায় আকাশের প্রতিবাদ করে যেমন বহুদিনের জ্বোরো রোগীর মা ছেলের গা একটু ঠান্ডা দেখে আর থার্মোমিটার মিলিয়ে দেখতে সাহস করে না। আজ অমিত এসেছিল নির্দিষ্ট সময়ের যথেষ্ট আগে। কারণ, দুরাশা নির্লজ্জ। বারান্দার যে কোনাটায় বসে লাবণ্য তার ছাত্রীকে পড়ায়, রাস-া দিয়ে আসতে সেটা চোখে পড়ে। আজ দেখলে সে জায়গাটা খালি। মন আনন্দে লাফিয়ে উঠল। এতক্ষণ পরে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলে। এখনো তিনটে বেজে বিশ মিনিট। সেদিন ও লাবণ্যকে বলেছিল, ‘ নিয়মপালনটা মানুষের, অনিয়মটা দেবতার; মর্তে আমরা নিয়মের সাধনা করি স্বর্গে অনিয়ম-অমৃতে অধিকার পাব বলেই। সেই স্বর্গে মাঝে মাঝে মর্তেই দেখা দেয়, তখন নিয়ম ভেঙে তাকে সেলাম করে নিতে হয়।’ আশা হল, লাবণ্য নিয়ম-ভাঙার গৌরব বুঝেছে বা; লাবণ্যর মনের মধ্যে হঠাৎ আজ বুঝি কেমন করে বিশেষ দিনের স্পর্শ লেগেছে, সাধারণ দিনের বেড়া গেছে ভেঙে। নিকটে এসে দেখে, যোগমায়া তাঁর ঘরের বাইরে স-ম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে, আর সিসি তার মুখের সিগারেট কেটির মুখের সিগারেট থেকে জ্বালিয়ে নিচ্ছে। অসম্মান যে ইচ্ছাকৃত তা বুঝতে বাকি রইল না। ট্যাবি-কুকুরটা তার প্রথম মৈত্রীর উচ্ছাসে বাধা পেয়ে কেটির পায়ের কাছে শুয়ে একটু নিদ্রার চেষ্টা করছিল। অমিতর আগমনে তাকে সম্বর্ধনা করবার জন্যে আবার অসংযত হয়ে উঠ। সিনি আবার তাকে শাসনের দ্বারা বুঝিয়ে দিলে যে এই সদভাবে প্রকাশের প্রণালীটা এখানে সমাদৃত হবে না। দুই সখীর প্রতি দৃকপাত মাত্র না করে ‘ মাসি’ বলে দুর থেকে ডেকেই অমিত যোগমায়ার পায়ের কাছে পড়ে তার পায়ের ধুলো নিলে। এ সময়ে এমন করে প্রণাম করা তার প্রথার মধ্যে ছিল না। জিজ্ঞাসা করলে, ‘ মাসিমা, লাবণ্য কোথায়?’ ‘ কী জানি বাছা, ‘ মাসিমা, লাবণ্য কোথায় আছে?’ ‘ এখনো তো তার পড়াবার সময় শেষ হয় নি।’ ‘ বোধ হয় এঁরা আসাতে ছুটি নিয়ে ঘরে গেছে।’ ‘ চলো, একবার দেখে আসি সে কী করছে।’ যোগমায়াকে নিয়ে অমিত ঘরে গেল। সম্মুখে যে আর কোনো সজীব পদার্থ আছে সেটা সম্পূর্ণই অস্বীকার করলে। সিসি একটু ঁেচচিয়ে বলে উঠল, ‘ অপমান! চলো কেটি, ঘরে যাই।’ কেটিও কম জ্বলে নি। কিন’ শেষ পর্যন- না দেখে সে যেতে চায় না। সিসি বললে, ‘কোনো ফল হবে না।’ কেটির বড়ো বড়ো চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল; বললে, ‘হতেই হবে ফল।’ আরো খানিকটা সময় গেল। সিসি আবার বললে, ‘চলো ভাই, আর একটুও থাকতে ইচ্ছে করছে না।’ কেটি বারান্দায় ধন্না দিয়ে বসে রইল। বললে, ‘ এইখানে দিয়ে তাকে বোরোতেই তো হবে।’ অবশেষে বেরিয়ে এল অমিত, সঙ্গে নিয়ে এল লাবণ্যকে। লাবণ্যর মুখে একটি নির্লিপ্ত শানি- তাতে একটুও রাগ নেই, স্পর্ধা নেই, অভিমান নেই। যোগমায়া পিছনের ঘরেই ছিলেন, তাঁর বেরোবার ইচ্ছা ছিল না। অমিত তাঁকে ধরে নিয়ে এল এক মুহুর্তের মধ্যেই কেটির চোখে পড়ল, লাবণ্যর হাতে আংটি। মাথায় রক্ত চন্‌ করে উঠল, লাল হয়ে উঠল দুই চোখ, পৃথিবীটাকে লাথি মারতে ইচ্ছে করল। অমিত বললে, ‘ মাসি, এই আমার বোন শমিতা, বাবা বোধ হয় আমার নামের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে নাম রেখিছিলেন কিন- রয়ে গেল অমিত্রাক্ষর। ইনি কেতকী, আমার বোনের বন্ধু।’ ইতিমধ্যে আর-এক উপদ্রব। সুরমার এক পোষা বিড়াল ঘর থেকে বেরিয়ে আসাতেই ট্যাবির কুক্কুরীয় নীতিতে সে এই স্পর্ধাটাকে যুদ্ধঘোষণার বৈধ কারণ বলেই গণ্য করলে। একবার অগ্রসর হয়ে তাকে ভৎসনা করে, আবার বিড়ালের উদ্যত নখর ও ফোঁসফোঁসানিতে যুদ্ধের আশু ফল সম্বন্ধে সংশয়াপন্ন হয়ে ফিরে আসে; এমন অবস’ায় কিঞ্চিৎ দূর হতেই অহিংস্র গর্জননীতিই নিরাপদ বীরত্ব প্রকাশের উপায় মনে করে অপরিমিত চীৎকার শুরু করে দিলে। বিড়ালটা তার কোনো প্রতিবাদ না করে পিঠ ফলিয়ে চলে গেল। এইবার কেটি সহ্য করতে পারলে না। প্রবল আক্রোশে কুকুরটাকে কান-মলা দিতে লাগল। এই কাল-মলার অনেকটা অংশই নিজের ভাগ্যের উদ্দেশে। কুকুরটা কেই কেই স্বরে অসদ্‌ব্যবহার সম্বন্ধে তীব্র অভিমত জানালে। ভাগ্য নিঃশব্দে হাসল। এই গোলমালটা একটু থামলে পর অমিত সিসিকে লক্ষ্য করে বললে, ‘সিসি, এরই নাম লাবণ্য। আমার কাছ থেকে এঁর নাম কখনো শোন নি, কিন’ বোধ হচ্ছে আর-দশজনের কাছ থেকে শুনেছে। এঁর সঙ্গে আমার বিবাহ সি’র হয়ে গেছে, কলকাতায়, অঘ্রান মাসে।’ কেটি মুখে হাসি টেনে আনতে দেরি করলে না। বললে,‘আই কন্‌গ্যাচুলেট। কমলালেবুর মধু পেতে বিশেষ বাধা হয় নি বলেই ঠেকছে; রাস-া কঠিন নয়, মধু লাফ দিয়ে আপনি এগিয়ে এসেছে মুখের কাছে’। সিসি তার স্বাভাবিক অভ্যাসমত হী হী করে হেসে উঠল। লাবণ্য বুঝলে, কথাটায় খোঁচা আছে, কিন’ মানেটা সম্পূর্ণ বুঝলে না। অমিত তাকে বললে, ‘আজ বেরোবার সময । এরা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল‘কোথায় যাচ্ছ’। আমি বলেছিলুম ‘বন্য মধুর সন্ধানে’। তাই এরা হাসছে। ওটা আমারই দোষ; আমার কোন কথাটা যে হাসির নয় লোক সেটা ঠাওরাতে পারে না। কেটি শাস- স্বরেই বললে, ‘কমলালেবুর মধু নিয়ে তোমার তো জিত হল, এবার আমারও যাতে হার না হয় সেটা করো।’ ‘কী করতে হবে বলো’ ‘নরেনের সঙ্গে আমার একটা বাজি আছে। সে বলেছিল, জেন্টলম্যানরা যেখানে যায় কেউ সেখানে তোমাকে রেসে নিয়ে যাবই। এ দেশে যত ঝর্ণা, যত মধুর দোকান আছে, সব সন্ধান করে শেষকালে এখানে এসে তোমার দেখা পেলুম। বলো-না ভাই সিসি, কত ফিরতে হয়েছে বুনো হাঁস শিকারের চেষ্টায়, ইংরেজিতে যাকে বলে রিষফ মড়ড়ংব. সিসি কোনা কথা না বলে হাসতে লাগল। কেটি বললে,‘মনে পড়ছে সেই গল্পটা, একদিন তোমার কাছেই শুনেছি অমিট। কোন্‌ পার্সিয়ান ফিলজফার তার পাগড়িচোরের সন্ধান না পেয়ে শেষে গোরস’ানে এসে বসেছিল। বলেছিল পালাবে কোথায়? মিস্‌ লাবণ্য যখন বলেছিলেন ওকে চেনেন না, আমাকে ধোঁকা লাগিয়ে দিয়েছিল; কিন’ আমার মন বললে ঘুরে ফিরে ওকে ওর এই গোরস’ানে আসতেই হবে।’ সিসি উচ্চেস্বরে হেসে উঠল। কেটি লাবণ্যকে বললে,‘অমিট আপনার নাম মুখে আনলে না, মধুর ভাষাতে ঘুরিয়ে বললে কমলালেবুর মধু; আপনার বুদ্ধি খুবই বেশি সরল, ঘুরিয়ে বলবার কৌশল মুখে জোগায় না, ফস করে বলে ফেললেন অমিটকে জানেনই না। তবু সান্‌ডে স্কুলের বিধানমত ফল ফলল না, দন্ডদাতা আপনাদের কোনো দন্ডই দিলেন না, শক্ত পথের মধুও একজন এক চুমুকেই খেয়ে নিলেন, আর অজানাকে একজন এক দৃষ্টিতে জানলেন- এখন কেবল আমার ভাগ্যেই হার হবে? দেখো তো সিসি, কী অন্যায়। সিসির আমার সেই উচ্চহাসি।ট্যাবি কুকুরটা এই উচ্ছ্বাসে যোগ দেওয়া তার সামাজিক কর্তব্য মনে করে বিচলিত হবার লক্ষণ দেখালো। তৃতীয়বার তাকে দমন করা হল। কেটি বললে, অমিট তুমি জান, এই হীরের যদি হারি জগতে আমার সান-্বনা থাকবে না। এ আংকটি একদিন তুমিই দিয়েছিল। এক মূহূর্ত হাত থেকে খুলি নি, এ আমার দেহের সঙ্গে এক হয়ে গেছে। শেষকালে আজ এই শিলঙ পাহাড়ে কি একে বাজিতে খোওয়াতে হবে? সিসি বললে, বাজি রাখাত গেলে কেন ভাই। ‘মনে মনে নিজের উপর অহংকার ছিল, আর মানুষের উপর ছিল বিশ্বাস। অহংকার ভাঙল, এবারকার মতো আমার রেস ফুরোল, আমারই হার। মনে হচ্ছে অমিটকে আর রাজি করতে পারব না। ত, এমন অদ্ভূত করেই যদি হারাবে সেদিন এত আদরে আংকটি দিয়েছিলে কেন? সে দেওয়ার মধ্যে কি কোন বাঁধন ছিল না? এই দেওয়ার মধ্যে কি কথা ছিল না যে, আমার অপমান কোনোদিন তুমি ঘটাতে দেবে না?’ বলতে বলতে কেটির গলা ভার হয়ে এল, অনেক কষ্টে চোখের জল সামলে নিলে। আজ সাত বৎসর হয়ে গেল, কেটির বয়স তখন আঠারো। সেদিন এই আংটি অমিত নিজের আঙুল থেকে খুলে ওকে পরিয়ে দিয়েছিল। তখন ওরা দুজনেই ছিল ইংল্যান্ডে। আকসফোর্ডে একজন পাঞ্জাবি যুবক ছিল কেটির প্রণয়মুগ্ধ। সেদিন আপসে অমিত সেই পাঞ্জাবির সঙ্গে নদীতে বাচ খেলেছিল। অমিতরই হল জিত। জুন মাসের জ্যোৎস্নায় সমস- আকাশ যেন কথা বলে উঠেছিল, মাটে মাঠে ফুলের প্রচুর বৈচিত্রের ধরনী তার ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলেছে। সেই ক্ষনে অমিত কেটির হাতে আংটি পরিয়ে দিলে; তার মধ্যে অনেক কথাই উহ্য ছিল, কিন’ কোনো কথাই গোপন ছিল না। সেদিন কোটির মুখে প্রসাধনের প্রলেপ লাগে নি, তার হাসিটি সহজ ছিল, ভাবের আবেগে তার মুখ রক্তিম হতে বাধা পেত না। আংটি হাতে পরা হলে অমিত তার কানে বলেছিল- ঞবহফবৎ রং ঃযব হরমযঃ অহফ যধষঢ়ু ঃযব য়ঁববহ সড়ড়হ রং ড়হ যবৎ ঃযৎড়হব.

কেটি তখন বেশি কথা বলতে শেখে নি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেবল যেন মনে মনে বলেছিল ‘মনআমী’, ফরাসি ভাষায়, যার নাম হচ্ছে ‘বধু’। কেটি বললে, বাজিতে যদিই হারলুম তবে আমার এই চিরদিনের হারের চিহ্ন তোমার কাছেই থাক্‌ অমিট। আমার হাতে রেখে একে আমি মিথ্যে কথা বলতে দেব না।’ ব’লে আংটি খুলে টেবিলটার উপরে রেখেই দ্রুতবেগে চলে গেল। এনামেল করা মুখের উপর দিয়ে দর দর করে চোখের জল গড়িয়ে পড়তে লাগল .