সভ্যতার পাণ্ডা/তৃতীয় দৃশ্য


তৃতীয় দৃশ্য।

ভবতারিণীর বাটী।

(ভবতারিণী ও বিশ্বেরীর প্রবেশ।)

ভব। এস এস, অনেক দিনের পর দেখা হ’ল। পাঁচ ঝঞ্জাটে আর হাওয়া খেতে যেতে পারি নি, দ্যাখাও হয় না, তবে কি মনে করে?

বিশ্বে। ভাই, নেমন্তন্ন কর্ত্তে এসেছি।

ভব। কি, পার্টি টার্টি কি কিছু আছে নাকি?

বিশ্বে। না, তা নয়, কন্যা যাত্রের।

ভব। বে কার?

বিশ্বে। কেন, কিছু শোন নি? বক্তৃতাও পড়নি? এড্‌ভারটাইজ্‌মেণ্টও দেখনি?

ভব। আর ভাই, পাঁচ ঝঞ্জাটে কি আর কিছু দেখ্‌তে শুন্‌তে পাই! হাওয়া খেতে তো যেতে পারিই নি, একদিন যে জিম্‌ন্যাসিয়েমে যাব, তাও হয়ে উঠে না। কার বে?

বিশ্বে। অামার।

ভব। বটে বটে, ইস্‌ তাই তো!

বিশ্বে। তোমায় ভাই যেতেই হবে।

ভব। ভাই, তাইতো ভাবছি!

বিশ্বে। না, ও ভাবছি না।

ভব। আমার কি ভাই অসাধ? আমি তোমার কোন্‌ বে তে কন্যাযাত্রী যাই নি বল? প্রথমকার বেতে বাসর জাগি, দ্বিতীয় বে তে তেরাত্তির ছিলুম, যদি না ঝঞ্ঝাটে পড়তুম, তুমি জোড়ে ফিরে আসা অবধি তোমাদের বাড়িতে থাকতুম। তুমি কি ভাই আমার পর?

বিশ্বে। এত ঝঞ্ঝাট্‌টা কিসের বল দেখি?

ভব। সে কথা আর তোমায় কি বল্‌বো বল! এই ভোরে ওঠা, টিথ্ বুরূশ দিয়ে দাঁত মাজা, গোষলখানায় যাওয়া, ছোট হাজ্‌রে বড় হাজ্‌রে খাওয়া—কর্ত্তার সঙ্গে বসে খেতে হয়, কর্ত্তা একলা খায়না—টীফিন্‌, ডিনার, তিনবার ড্রেস করা, তারপর মেয়েকে বৌকে পড়ান।

বিশ্বে। কেমন শিখ্‌ছে কেমন?

ভব। মেয়ে আমার পেটের, বিয়ে পাস করেছে। রাইডীং, বক্‌সীং, জিম্‌ন্যাস্‌টীক্‌ পর্য্যন্ত পর্য্যন্ত শিখেছে। তবে বৌটা মানুষ হলনা। আমি বারণ করেছিলুম যে ছোট ঘরের মেয়ে এন না, কর্ত্তা শুনলে না। সে সেই আইবুড়ীর মত ঘোম্‌টা দেবে, ছেলের সঙ্গে বেড়াতে যাবেনা, ঘোড়া চড়বে না, গাউন পরবে না, দুপাত ইংরেজিও পড়বে না।

বিশ্বে। তবে তো বউ টা বয়ে গেল।

ভব। তা গেল বই কি! আসুক ছিষ্টিধর বিলেত থেকে আসুক, বল্‌ছে মেম্ বে করে আস্‌বে। তদ্দিনে ডাইভোর্স অ্যাক্টাও পাস হবে, উরির মধ্যে দেখে শুনে বৌটার একটা বে দেব।

বিশ্বে। দেখ, ঘর ঘরকন্নার কাজ কর্ম্মতো আছেই, কাল এক বার ফুরসুত করে শুভদৃষ্টির সময় গিয়ে দাঁডিও।

ভব। ভাই একটু ফুরসুত নেই, কাল কর্ত্তার শ্রাদ্ধ।

বিশ্বে।সে কি? আস্‌বের সময় তো দেখলুম তিনি গাড়িতে উঠ্‌ছেন।

ভব। হাঁ, ডেথ্ রেজেস্ট্রী কৰ্ত্তে গেল।

বিশ্বে। বটে! তোমার কি বে দেবেন?

ভব। না, তা না। কি জান, ছিষ্টিধর পরশু মেলে বিলেত যাবে, ঘেসেড়াগিরী শিখ্‌বে! কাজটা বড় শক্ত, ব্যারিষ্টারী ডাক্তারী নয়, সে দু এক বছরে হবে; এসে ঘেসেড়ার আফিস খুলবে। সেখানে অন্তত বছর দশেক শিখতে কবে, অ্যাদ্দিনে কৰ্ত্তার ভাল মন্দ হোক্, শেষ কি ব্যাটা থাক্‌তে ব্যাড়া আগুনে পুড়বে, না জ্ঞাতে শ্রাদ্ধ করবে? তাই পুরুৎ ঠাকুর পরামর্শ দিয়েছেন, আজ ছিষ্টিধর মুখ-অগ্নি করে কাচা নিয়ে থাক্‌বে, কাল্ সকালে শ্রাদ্ধ করে, পরশু মেলে উঠবে।

বিশ্বে। বটে? তবে ভাই আর তোমায় কি বলবো!

ভব। তোমারো বে শুন্‌ছি, তোমায়ই বা কি বল্‌বো! তা নৈলে একবার শ্রাদ্ধ টাদ্ধ দেখে যেতে। তা সকাল সকাল তে বে চুকে যাবে, একবার তোমার নিউডিয়ারকে নিয়ে এদিকে আস্‌তে পারবে না?

বিশ্বে। দেখি কদ্দুর হয় বল্‌তে পারিনি।

ভব। হাঁ, ভাল কথা মনে হলো, কর্ত্তা ডেথ্ রেজেষ্ট্রী করে এলেই আমার কাঁদ্‌তে হবে; কখনোত স্বামী মরেনি, কি করে কাঁদতে হয় জানিনি, অসভ্য কারাত কাঁদতে পারবোনা।

বিশ্বে। ও সোজা। আমার স্বামী মরতে, রুমালে এক্‌টু অডিকলোম দিয়ে মুখে দিলুম, অডিকলমের ঝাঁজে চোক্‌ দে জল পড়তে লাগলো, আর ফোঁপাতে লাগলুম।

ভব। থ্যাঙ্ক্ ইউ! বড় বাধিত হলেম!

বিশ্বে। তবে ভাই এখন চল্লুম। আমার দাঁড়াবার জো নেই, এখুনি ক’নে দেখ্‌তে আস্‌বে।

ভব। একটু দাঁড়াও, আর্‌ একটা পরামর্শ জিজ্ঞাসা করি। কর্ত্তা ব’ল্‌ছে যে মরণ বাঁচনের কথা তো কিছু বলা যায় না, এক সঙ্গে মুখ অগ্নিটা করে রাখবে।

বিশ্বে। তা মুখো অগ্নি কর কর্‌বে, খবরদার শ্রাদ্ধটী কর্ত্তে দিওনা।

ভব। কেন বল দেখি, কেন বল দেখি?

বিশ্বে। না, আর একটা বে আগে হোক্‌।

ভব। তেমন কি কপাল দিদি, তেমন কি কপাল! কর্ত্তা কি আর সত্যি সত্যি মরতে পারতো না, তা কৈ রাজি হয় কৈ! দুটো বে আমার বরাতে নেই আমি বুঝেছি।

বিশ্বে। কেন, কর্ত্তার শ্রাদ্ধ হলেই তুমি বে করতে পারবে, আইনে বাধবে না।

ভব। তা তুমি বে থা করে এসো, এ গোল্‌মাল্‌ গুল চুকে যাক্, তারপর যা হয় পরামর্শ করবো।

বিশ্বে। তবে আসি?

ভব। এস দিদি এস।

[বিশ্বেশ্বরীর প্রস্থান।
 
এই যে কর্ত্তা আসছেন!

(নীলাকান্তের প্রবেশ।)

কি গো! এত দেরি?

নীল। কি করবো বল, রেজিষ্টার ব্যাটা আহাম্মুক্‌ কোন রকমেই রেজেষ্ট্রী কৰ্ত্তে চায় না। আর সে ব্যাটার যে কথা, কে মরেছে, কি সে মলো, ব্যাটা যখন চোট্‌পাট্ শুনলে তখন থ হয়ে রৈল।

ভব। তুমি কি বল্লে, তুমি কি বল্লে?

নীল। বল্লেম, আমি মরেছি, চুরট খেয়ে।

ভব। তা এইতে এত দেরি?

নীল। না, আর পাঁচজন বন্ধুবান্ধবকে নেমন্তন্ন করে এলুম, ছিষ্টিধর বলেছে, শ্রাদ্ধর পর গার্ডেন পার্টি হবে।

ভব। বল কি ! তবে আমারো তো দু পাঁচ জন বন্ধু বান্ধবকে বলতে হবে, আমি এই বেলা বেরিয়ে পড়ি।

নীল। দাঁড়াও, পুরুৎ ঠাকুর আসুন, তিনি বলেছেন তোমার মুখঅগ্নির পর তোমার্ শ্রাদ্ধ বন্ধ থাকবে না।

ভব। তুমি কি আমারও ডেথ রেজেষ্ট্রী করে এসেছ নাকি?

নীল। করলুম বৈ কি! এবারে বড় রেজেষ্টার ব্যাটা জব্দ হ’ল। মুদ্দফরাশকে কিছু দিয়ে, একটা কলেজের মুদ্দর্ দেখিয়ে বল্লুম এই আমার স্ত্রী।

ভব। ছিঃ তুমি বড় অসভ্য! আমি চল্লুম, আমি কাটিয়ে আসি গে, আমি কি ওম্‌নি অসভ্য মরণ মরবো?

নীল। তুমি আমায় তেমনিই পেলে বটে! দেখে এস গে এখনো লাস্ জলে নি, আগে গাউন প’রিয়ে তবে লাস দেখিয়েছি।

ভব। তাই তো বলি, তাইতো বলি, তুমি কি এমন অসভ্য কাজটা করবে!

(পুরোহিতের প্রবেশ)

পুরো। কি গো! তুমি আবার কি অমত কর্‌ছো? মুখ অগ্নির পর কি শ্রাদ্ধ বন্ধ থাকে? শ্রাদ্ধ কর্ত্তেই হবে।

ভব। তা যা ভাল বোঝেন, কিন্তু আমার একজন বন্ধুর বড় অমত, সে বলে অার একটা বের পর তবে তোমার শ্রাদ্ধ ক’রো।

পুরো। তা, শ্রাদ্ধের পরও বে চল্‌বে।

ভব। তাহ’লে আর আমার আপত্তি নেই।

পুরো। তা এস, ছিষ্টিধর আসছে, মুখঅগ্নিটে এখন সেরে যাই। ভাবছি আজ রাত্রেই শ্রাদ্ধটা সারবো। কাল আবার একটা বে দিতে হবে।

(ছিষ্টিধরের প্রবেশ)

ছিষ্টি। বাবা! বাবা! প্যাসেজ্‌ এন্‌গেজ করে এলুম।

ভব। পুরুৎ ঠাকুর বল্‌,ছেন আজি তোমায় শ্রাদ্ধটা সারতে হবে।

ছিষ্টি। বেস কথা, কাজটা সেরে রাখাই ভাল। পাঁচ জন বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে দেখা করবার কাল ফুরসুৎ পাব।

পুরো। তবে মুখঅগ্নি করবে এস।

ছিষ্টি। এই খানেই হোক না, আমার ঠেঁয়ে লুসিফার ম্যাচ আছে।

পুরো। তবে দুট জ্বালো, দুজনের মুখে দাও।

(ছিষ্টিধরের তথা করণ)

তবে কাচা গলায় দিয়ে বাইরে এস।

ছিষ্টি। আর কাচা গলায় দিতে হবে না, আমার ঠেয়ে কালো ফিতে অাছে।

পুরো। ওঃ! “উদ্যোগী পুরুষো সিংহ“ এমন নৈলে ব্যাটা? তবে বাইরে এস, শ্রাদ্ধটা সেরে যাই। তোমাদের আর কি, মুখঅগ্নি হোয়ে গিয়েছে, যে যার কাজে যাও। ব্রাহ্মণ ভোজনের উজ্জুগ করগে।

[পুরোহিত ও ছিষ্টিধরের প্রস্থান।

নীল। গিন্নি একটা কথা ভাবছি।

ভব। অামিও ভাবছি।

নীল। কি বল দেখি?

ভব। তুমি বল দেখি?

নীল। ভাবছি ফ্যান্‌সি বাজারে যাব।

ভব। ভাবছি বরের নীলেমে যাব।

নীল। বরের নিলেমে যাবে কি কত্তে?

ভব। তুমি ফ্যান্‌সি বাজারে যাবে কি কত্তে?

নীল। তুমি কি বর কিনবে?

ভব। হুঁ। তুমি কি কনে কিনবে?

নীল। হাঁ।

ভব। বেশ কথা।

নীল। বেশ কথা। তবে এস দুজনে কাঁদি।

ভব। নাও এই এসেন্স চোখে নাও।

নীল। হোয়েছে?

ভব। অনেকক্ষণ। আমি চোখের রুমাল খুলেছি।

নীল। আবার কি ভাবছো?

ভব। ভাবছি, আইনে বাধবে কি না।

নীল। না বাধবে না, ডেথ রেজেষ্ট্রী হোয়ে গিয়েছে।

ভব। ঠিক!— গুড্‌ বায়।

[উভয়ের সেক্‌হ্যাণ্ড ও প্রস্থান।