আত্মশক্তি/অবস্থা ও ব্যবস্থা

আত্মশক্তি (సెసి এ-কথা আমাদিগকে মনে রাথিতে হইবে, এতকাল অনেক বিদেশী অধ্যাপক আমাদের কলেজের পরীক্ষাশালায় যন্ত্রতন্ত্র লইয়া অনেক নাড়াচাড়া করিয়াছেন, তাহারা কেহই স্বাধীন বুদ্ধি দেখাইয়া যশস্বী হইতে পারেন নাই। বাঙালীর মধ্যেই জগদীশ ও প্রফুল্লচন্দ্র সুযোগলাভ করিয়া সেই সুযোগের ফল দেখাইয়াছেন। পরের সহিত তর্কের জন্যই এগুলি স্মরণীয়, তাহা নহে, নিজেদের উৎসাহ ও আত্মসন্ত্রমের জন্ত । পরের কথায় নিজেদের প্রতি যেন অবিশ্বাস না জন্মে । যাহাতে আমাদের যথার্থ আত্মসন্মানবোধের উদ্রেক হয় বিদেশীরা তাহা ইচ্ছাপূর্বক করিবে না, এবং সেজন্য আমরা যেন ক্ষোভ অনুভব না করি । যেখানে যাহা স্বভাবতই আশা করা যাইতে পারে না সেখানে তাহা আশা করিতে যাওয়া মূঢ়তা— এবং সেখানে ব্যর্থমনোরথ হইয়া পুনঃপুন সেইখানেই ধাবিত হইতে যাওয়া যে কী, ভাষায় তাহার কোনো শব্দ নাই। এ স্থলে আমাদের একমাত্র কর্তব্য, নিজেরা সচেষ্ট হওয়া ; আমাদের দেশে ডাক্তার জগদীশ বস্থ প্রভৃতির মতো যে-সকল প্রতিভাসম্পন্ন মনম্বী প্রতিকূলতার মধ্যে থাকিয়াও মাথা তুলিয়াছেন, তাহাদিগকে মুক্তি দিয়া তাহাদের হস্তে দেশের ছেলেদের মানুষ করিয়া তুলিবার স্বাধীন অবকাশ দেওয়া ; অবজ্ঞা-অশ্ৰদ্ধা-অনাদরের হাত হইতে বিদ্যাকে উদ্ধার করিয়া দেবী সরস্বতীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা ; জ্ঞানশিক্ষাকে স্বদেশের জিনিস করিয়া দাড় করানো ; আমাদের শক্তির সহিত, সাধনার সহিত, প্রকৃতির সহিত তাহাকে অস্তরঙ্গরূপে সংযুক্ত করিয়া তাহাকে স্বভাবের নিয়মে পালন করিয়া তোলা ; বাহিরে আপাতত তাহার দীনবেশ, তাহার কুশতা, দেখিয়া ধৈর্ধভ্রষ্ট না হইয়া আশার সহিত আনন্দের সহিত হৃদয়ের সমস্ত প্রীতি দিয়া জীবনের সমস্ত শক্তি দিয়া তাহাকে সতেজ ও সফল করা । উপস্থিত ক্ষেত্রে ইহাই আমাদের একমাত্র আলোচ্য, একমাত্র কর্তব্য । ইহাকে যদি দুরাশা বল, তবে কি পরের রুদ্ধভারে জোড়হন্তে বসিয়া থাকাই আশা পূর্ণ হইবার একমাত্র সহজ প্রণালী । কবে কন্সার্ভেটিব গবর্মেন্ট গিয়া লিবারেল গবমেন্টের অভু্যদয় হইবে, ইহারই অপেক্ষা করিয়া শুষ্ক চঞ্চু বিস্তারপূর্বক নিদাঘমধ্যাঙ্কের আকাশে তাকাইয়া থাকাই কি হতবুদ্ধি হতভাগ্যের একমাত্র সন্ধুপায় । °C●● ब्रबौठ-ब्रध्नांबजौ অবস্থা ও ব্যবস্থা আজ বাংলাদেশে উত্তেজনার অভাব নাই, সুতরাং উত্তেজনার ভার কাছাকেও লইতে হইবে না। উপদেশেরও যে বিশেষ প্রয়োজন আছে তাহা আমি মনে করি না । বসন্তকালের ঝড়ে যখন রাশি রাশি আমের বোল ঝরিয়া পড়ে তখন সে বোলগুলি কেবলই মাটি হয়, তাহা হইতে গাছ বাহির হইবার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। তেমনি দেখা গেছে, সংসারে উপদেশের বোল অজস্র বৃষ্টি হয় বটে, কিন্তু অনেক স্থলেই তাহা হইতে অঙ্কুর বাহির হয় না, সমস্ত মাটি হইতে থাকে। তৰু ইহা নিঃসন্দেহ যে, যখন বোল ঝরিতে আরম্ভ করে, তখন বুঝিতে হইবে ফল ফলিবার সময় স্থদুরে নাই । আমাদের দেশেও কিছুদিন হইতে বলা হইতেছিল যে, নিজের দেশের অভাবমোচন দেশের লোকের নিজের চেষ্টার দ্বারাই সম্ভবপর, দেশের লোকই দেশের চরম অবলম্বন, বিদেশী কদাচ নহে, ইত্যাদি । নানা মুখ হইতে এই যে বোলগুলি ঝরিতে আরম্ভ হইয়াছিল, তাহা উপস্থিত মতো মাটি হইতেছিল সন্দেহ নাই, কিন্তু ভূমিকে নিশ্চয়ই উর্বরা করিতেছিল এবং একটা সফলতার সময় যে আসিতেছে, তাহারও সূচনা করিয়াছিল । অবশেষে আজ বিধাতা তীব্র উত্তাপে একটি উপদেশ স্বয়ং পাকাইয়া তুলিয়াছেন । দেশ গতকল্য যে-সকল কথা কর্ণপাত করিবার যোগ্য বলিয়া বিবেচনা করে নাই, আজ তাহা অতি অনায়াসেই চিরন্তন সত্যের ন্যায় গ্রহণ করিতেছে। নিজেরা যে এক হইতে হইবে, পরের দ্বারস্থ হইবার জন্য নহে, নিজেদের কাজ করিবার জন্য, এ-কথা আজ আমরা একদিনেই অতি সহজেই যেন অনুভব করিতেছি, বিধাতার বাণীকে অগ্রাহ করিবার.জো নাই । অতএব, আমার মুখে আজ উত্তেজনা ও উপদেশ অনাবশুক হইয়াছে—ইতিহাসকে ধিনি অমোঘ ইজিতের দ্বারা চালনা করেন, তাহার অগ্নিময় তর্জনী আজ দেশের সকলের চক্ষের সম্মুখে প্রত্যক্ষ হইয়া উঠিয়াছে। து: এখন এই সময়টাকে বৃথা নষ্ট হইতে দিতে পারি না। কপালক্রমে অনেক ধোয়ার পরে ভিজা কাঠ যদি ধরিয়া থাকে, তবে তাহা পুড়িয়া ছাই হওয়ার পূর্বে রান্না চড়াইতে হইবে ; শুধু শুধু শূন্ত চুলায় আগুনে খোচার উপর খোচা দিতে থাকিলে আমোদ হইতে পারে, কিন্তু তাহাতে ছাই হওয়ার কালটাও নিকটে অগ্রসর হয় এবং আয়ের আশা মুদুরবর্তী হইতে থাকে। 劇 আত্মশক্তি لا هوا বঙ্গব্যবচ্ছেদের প্রস্তাবে যখন সমস্ত দেশের লোকের ভাবনাকে এক সঙ্গে জাগাইয়া তুলিয়াছে, তখন কেবলমাত্র সাময়িক উত্তেজনায় আত্মবিশ্বত না হইয়া কতকগুলি গোড়াকার কথা স্পষ্টরূপে ভাবিয়া লইতে হইবে । প্রথম কথা এই যে, আমরা স্বদেশের হিতসাধন সম্বন্ধে নিজের কাছে যে-সকল আশা করি না, পরের কাছ হইতে সেই সকল আশা করিতেছিলাম। এমন অবস্থায় নিরাশ হওয়াই স্বাভাবিক এবং তাহাই মঙ্গলকর । নিরাশ হুইবার মতো আঘাত বারবার পাইয়াছি, কিন্তু চেতনা হয় নাই । এবারে ঈশ্বরের প্রসাদে আর-একটা আঘাত পাইয়াছি, চেতনা হইয়াছে কি না তাহার প্রমাণ পরে পাওয়া যাইবে ।

  • আমাদিগকে তোমরা সম্মান দাও, তোমরা শক্তি দাও, তোমরা নিজের সমান অধিকার দাও”— এই যে-সকল দাবি আমরা বিদেশী রাজার কাছে নিঃসংকোচে উপস্থিত করিয়াছি, ইহার মূলে একটা বিশ্বাস আমাদের মনে ছিল । আমরা কেতাব পড়িয়া নিশ্চয় স্থির করিয়াছিলাম যে, মানুষমাত্রেরই অধিকার সমান, এই সাম্যনীতি আমাদের রাজার জাতির ।

কিন্তু সাম্যনীতি সেইখানেই থাটে, যেখানে সাম্য আছে । যেখানে আমারও শক্তি আছে, তোমার শক্তি সেখানে সাম্যনীতি অবলম্বন করে। যুরোপীয়ের প্রতি যুরোপীয়ের মনোহর সাম্যনীতি দেখিতে পাই ; তাহা দেখিয়া আশান্বিত হইয়া উঠা অক্ষমের লুব্ধতামাত্র । অশক্তের প্রতি শক্ত যদি সাম্যনীতি অবলম্বন করে, তবে সেই প্রশ্রয় কি অশক্তের পক্ষে কোনোমতে শ্রেয়স্কর হইতে পারে। সে-প্রশ্রয় কি অশক্তের পক্ষে সম্মানকর । অতএব, সাম্যের দরবার করিবার পূর্বে সাম্যের চেষ্টা করাই মনুষ্যমাত্রের কর্তব্য । তাহার অন্যথা করা কাপুরুষতা । ইহা আমরা স্পষ্টই দেখিয়াছি, যে-সকল জাতি ইংরেজের সঙ্গে বর্ণে ধর্মে প্রথায় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, তাহাদিগকে ইহারা নিজের পার্থে স্বচ্ছন্দবিহারের স্থান দিয়াছেন, এমন ইহাদের ইতিহাসে কোথাও নাই। এমন কি, তাহারা ইহাদের সংঘর্ষে লোপ পাইয়াছে ও পাইতেছে, এমন প্রমাণ ষথেষ্ট আছে । একবার চিস্তা করিয়া দেখো, ভারতবর্ষের রাজাদের যখন স্বাধীন ক্ষমতা ছিল তখন র্তাহারা বিদেশের অপরিচিত লোকমণ্ডলীকে স্বরাজ্যে বসবাসের কিরূপ স্বচ্ছন্দ অধিকার দিয়াছিলেন– তাহার প্রমাণ এই পার্শিজাতি । ইহারা গোহত্যা প্রভৃতি দুই-একটি বিষয়ে হিন্দুদের বিধিনিষেধ মানিয়া, নিজের ধর্ম সমাজ অক্ষুণ্ণ রাখিয়া, নিজের স্বাতন্ত্র কোনো অংশে বিসর্জন না দিয়া হিন্দুদের অতিথিরূপে প্রতিবেশিরূপে প্রভূত উন্নতি লাভ করিয়া আসিয়াছে, রাজা বা জন সমাজের হস্তে পরাজিত বলিয়া উৎপীড়ন সহ করে নাই । ইহার সহিত ইংরেজ রবীন্দ্র-রচনাবলী چ م ئ\ উপনিবেশগুলির ব্যবহার তুলনা করিয়া দেখিলে পূর্বদেশের এবং পশ্চিমদেশের সাম্যবাদের প্রভেদটা আলোচনা করিবার স্বযোগ হইবে । সম্প্রতি দক্ষিণ-আফ্রিকায় বিলাতি উপনিবেশীদের একটি সভা বসিয়াছিল, তাহার বিবরণ হয় তো অনেকে স্টেটসম্যান-পত্রে পড়িয়া থাকিবেন । র্তাহারা একবাক্যে সকলে স্থির করিয়াছেন যে, এশিয়ার লোকদিগকে র্তাহারা কোনো প্রকারেই আশ্রয় দিবেন না। ব্যবসায় অথবা বাসের জন্য তাহাদিগকে ঘরভাড়া দেওয়া হইবে না, যদি কেহ দেয় তাহার প্রতি বিশেষরূপ অসন্তোষ প্রকাশ করিতে হইবে । বর্তমানে যে-সকল বাড়ি এশিয়ার লোকদিগকে ভাড়া দেওয়া হইয়াছে, মেয়াদ উত্তীর্ণ হইলেই তাহা ছাড়াইয়। লওয়া হইবে । যে-সকস হোস ঐশিয়দিগকে কোনো প্রকারে সাহায্য করে, খুচরা ব্যবসায়ী ও পাইকেরগণ যাহাতে তাহাদের সঙ্গে ব্যবসা বন্ধ করে, তাহার চেষ্টা করিতে হইবে । যাহাতে এই নিয়মগুলি পালিত হয় এবং যাহাতে সভ্যগণ ঐশিয় দোকানদার বা মহাজনদের কাছ হইতে কিছু না কেনে বা তাহাদিগকে কোনোপ্রকার সাহায্য না করে, সেজন্য একটা Vigilance Association বা চৌকিদার-দল বাধিতে হইবে । সভায় বক্তৃতাকালে একজন সভ্য প্রশ্ন করিয়াছিলেন যে, আমাদের শহরের মধ্যে ঐশিয় ব্যবসায়ীদিগকে যেমন করিয়া অাডড গাড়িতে দেওয়া হইয়াছে, এমন কি ইংলণ্ডের কোনো শহরে দেওয়া সম্ভব হইত। ইহার উত্তরে এক ব্যক্তি কহিল, না, সেখানে তাহাদিগকে ‘লিঞ্চ” করা হইত। শ্রোতাদের মধ্যে একজন বলিয়াছিল, এখানেও কুলিদিগকে “লিঞ্চ’ করাই শ্রেয়। এশিয়ার প্রতি যুরোপের মনোভাবের এই যে-সকল লক্ষণ দেখা যাইতেছে, ইহা লইয়া আমরা যেন অবোধের মতো উত্তেজিত হইতে না থাকি। এগুলি স্তব্ধভাবে বিচার করিবার দেখিবার বিষয় । যাহা স্বভাবতই ঘটিতেছে, যাহা বাস্তবিক সত্য, তাহ লইয়া রাগারগি করিয়া কোনো ফল দেখি না । কিন্তু তাহার সঙ্গে যদি ঘর করিতে হয়, তবে প্রকৃত অবস্থাটা ভুল বুঝিলে কাজ চলিবে না । ইহা স্পষ্ট দেখা যায় যে, এশিয়াকে যুরোপ কেবলমাত্র পৃথক বলিয়া জ্ঞান করে না, তাহাকে হেয় বলিয়াই छोंcन । এ-সম্বন্ধে যুরোপের সঙ্গে আমাদের একটা প্রভেদ আছে । আমরা যাহাকে হেয় জ্ঞানও করি, নিজের গণ্ডির মধ্যে তাহার যে গৌরব আছে, সেটুকু আমরা অস্বীকার করি না। সে তাহার নিজের মণ্ডলীতে স্বাধীন ; তাহার ধর্ম, তাহার আচার, তাহার বিধিব্যবস্থার মধ্যে তাহার স্বতন্ত্র সার্থকতা আছে ; আমার মণ্ডলী আমার পক্ষে যেমন তাহার মণ্ডলী তাহার পক্ষে ঠিক সেইরূপ— এ-কথা আমরা কখনো ভুলি না। এইজন্য আত্মশক্তি \و e \C( যে-সকল জাতিকে আমরা অনার্য বলিয়া ঘৃণাও করি, নিজের শ্রেষ্ঠতার অভিমানে আমরা তাহাদিগকে বিলুপ্ত করিবার চেষ্টা করি না। এই কারণে, আমাদের সমাজের মাঝখানেই হাড়ি-ডোম-চণ্ডাল স্বস্থানে আপন প্রাধান্ত রক্ষা করিয়াই চিরদিন ৰজায় ज्रो८छ् । পশুদিগকে আমরা নিকৃষ্ট জীব বলিয়াই জানি, কিন্তু তৰু বলিয়াছি, “আমরাও আছি, তাহারাও থাক” ; বলিয়াছি, “প্রাণিহত্যা করিয়া আহার করাটা প্রবৃত্তিরেষা ভূতানাং, নিবৃত্তিস্তু মহাফল’—সেটা একটা প্রবৃত্তি, কিন্তু নিবৃত্তিটাই ভালো।” যুরোপ বলে, “জন্তুকে খাইবার অধিকার ঈশ্বর আমাদিগকে দান করিয়াছেন।” যুরোপের শ্রেষ্ঠতার অভিমান ইতরকে যে কেবল ঘৃণা করে, তাহা নহে, তাহাকে নষ্ট করিবার বেলা ঈশ্বরকে নিজের দলভুক্ত করিতে কুষ্ঠিত হয় না। যুরোপের শ্রেষ্ঠতা নিজেকে জাহির করা এবং বজায় রাখাকেই চরম কর্তব্য বলিয়া জানে। অন্তকে রক্ষা করা যদি তাহার সঙ্গে সম্পূর্ণ খাপ খাইয়া যায়, তবেই অন্তের পক্ষে বাচোয়া, যে-অংশে লেশমাত্র খাপ না খাইবে সে-অংশে দয়ামায়া বাছবিচার নাই। হাতের কাছে ইহার যে দুই-একটা প্রমাণ আছে তাহারই উল্লেখ করিতেছি । বাঙালি যে একদিন এমন জাহাজ তৈরি করিতে পারিত যাহা দেখিয়া ইংরেজ ঈর্ষা অনুভব করিয়াছে, আজ বাঙালির ছেলে তাহা স্বপ্নেও জানেনা । ইংরেজ যে কেমন করিয়া এই জাহাজ-নির্মাণের বিদ্যা বিশেষ চেষ্টায় বাংলাদেশ হইতে বিলুপ্ত করিয়া দিয়াছে তাহা শ্ৰীযুক্ত সখারাম গণেশ দেউস্কর মহাশয়ের ‘দেশের কথা’ নামক বইখানি পড়িলে সকলে জানিতে পারিবেন। একটা জাতিকে, যে-কোনো দিকেই হউক, একেবারে অক্ষম পঙ্গু করিয়া দিতে এই সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতাবাদী কোনো সংকোচ অনুভব করে নাই । ইংরেজ আজ সমস্ত ভারতবর্ষকে বলপূর্বক নিরস্ত্র করিয়া দিয়াছে, অথচ ইহার নিদারুণতা তাহারা অস্তরের মধ্যে একবার অনুভব করে নাই । ভারতবর্ষ একটি ছোটো দেশ নহে, একটি মহাদেশবিশেষ । এই বৃহৎ দেশের সমস্ত অধিবাসীকে চিরদিনের জন্য পুরুষানুক্রমে অস্ত্ৰধারণে অনভ্যস্ত, আত্মরক্ষায় অসমর্থ করিয়া তোলা বে কতবড়ো অধম, যাহার এককালে মৃত্যুভয়হীন বীরজাতি ছিল, তাহাদিগকে সামান্য একটা হিংস্র পশুর নিকট শঙ্কিত নিরুপায় করিয়া রাখা যে কিরূপ বীভৎস অন্যায়, সে-চিন্তা ইহাদিগকে কিছুমাত্র পীড়া দেয় না। এখানে ধর্মের দোহাই একেবারেই নিষ্ফল— কারণ, জগতে অ্যাংলোস্তাক্সন জাতির মাহাত্ম্যকে বিস্তৃত ও স্বরক্ষিত করাই ইহারা রবীন্দ্র-রচনাবলী 8 ہ و \ চরম ধর্ষ জানে, সেজন্ত ভারতবাসীকে যদি অস্ত্রত্যাগ করিয়া এই পৃথিবীতলে চিরদিনের মতে নিজীব নিঃসহায় পৌরুষবিহীন হইতে হয়, তবে সে-পক্ষে তাহাজের কোনো দয়া মায়া নাই । অ্যাংলোস্তাক্সন যে শক্তিকে সকলের চেয়ে পূজা করে, ভারতবর্ষ হইতে সেই শক্তিকে প্রত্যহ সে অপহরণ করিয়া এ-দেশকে উত্তরোত্তর নিজের কাছে অধিকতর হেয় করিয়া তুলিতেছে, আমাদিগকে ভীরু বলিয়া অবজ্ঞা করিতেছে– অথচ একবার চিন্তা করিয়া দেখে না, এই ভীরুতাকে জন্ম দিয়া তাহাদের দলবদ্ধ ভীরুতা পশ্চাতে দাড়াইয়া আছে । অতএব অনেক দিন হইতে ইহা দেখা যাইতেছে যে, অ্যাংলোস্যাকসন মহিমাকে সম্পূর্ণ নিরুপদ্রব করিবার পক্ষে দূরতম ব্যাঘাতটি যদি আমাদের দেশের পক্ষে মহত্তম দ্বমূল্য বস্তুও হয়, তবে তাহাকে দলিয়া সমভূম করিয়া দিতে ইহার বিচারমাত্র করে না । এই সত্যটি ক্রমে ক্রমে ভিতরে ভিতরে আমাদের কাছেও স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে বলিয়াই আজ গবর্মেন্টের প্রত্যেক নড়াচড়ায় আমাদের হৃৎকম্প উপস্থিত হইতেছে, তাহারা মুখের কথায় যতই আশ্বাস দিতেছেন আমাদের সন্দেহ ততই বাড়িয়া উঠিতেছে । কিন্তু আমাদের পক্ষে অদ্ভূত ব্যাপার এই যে, আমাদের সন্দেহেরও অস্ত নাই, আমাদের নির্ভরেরও সীমা নাই । বিশ্বাসও করিব না, প্রার্থনাও করিব । যদি জিজ্ঞাসা করা যায় এমন করিয়া সময় নষ্ট করিতেছ কেন, তবে উত্তর পাইবে, এক দলের দয়া না যদি হয় তো আর-এক দলের দয়া হইতে পারে। প্রাতঃকালে যদি অনুগ্রহ না পাওয়া যায় তো, ষথেষ্ট অপেক্ষা করিয়া বসিয়া থাকিলে সন্ধ্যাকালে অনুগ্রহ পাওয়া যাইতে পারে। রাজা তো আমাদের একটি নয়, এইজন্য বারবার সহস্রবার তাড়া খাইলেও আমাদের আশা কোনোক্রমেই মরিতে চায় না— এমনি আমাদের भूeकिल छ्हेग्नां८छ् । কথাটা ঠিক। আমাদের একজন রাজা নহে। পৃথিবীর ইতিহাসে ভারতবর্ষের ভাগ্যে একটা অপূর্ব ব্যাপার ঘটিয়াছে। একটি বিদেশী জাতি আমাদের উপরে রাজত্ব করিতেছে, একজন বিদেশী রাজা নহে । একটি দূরবর্তী সমগ্র জাতির কতৃৰ্ত্তভার আমাদিগকে বহন করিতে হইতেছে । ভিক্ষাবৃত্তির পক্ষে এই অবস্থাটাই কি এত অনুকুল । প্রবাদ আছে যে, ভাগের মা গঙ্গা পায় না, ভাগের কুপোন্তই কি মাছের মুড়ে এবং জুধের সর পায় । অবিশ্বাস করিবার একটা শক্তি মানুষের পক্ষে অবশ্যপ্ৰয়োজনীয় । ইহা কেবল একটা নেতিভাবক গুণ নহে, ইহা কতৃভাবক । মনুষ্যত্বকে রক্ষা করিতে হইলে এই অবিশ্বাসের ক্ষমতাকে নিজের শক্তির দ্বারা খাড়া করিয়া রাখিতে হয় । যিনি বিজ্ঞান চৰ্চায় প্ৰবৃত্ত, তঁহাকে অনেক জনশ্ৰীতি, অনেক প্ৰমাণহীন প্ৰচলিত ধারণাকে অবিশ্বাসের জোরে খেদাইয়া রাখিতে হয়, নহিলে তাহার বিজ্ঞান পণ্ড হইয়া যায় । যিনি কৰ্ম করিতে চান, অবিশ্বাসের নিড়ানির দ্বারা তঁহাকে কৰ্মক্ষেত্ৰ নিষ্কণ্টক রাখিতে হয় । এই যে অবিশ্বাস, ইহা অন্যের উপরে অবজ্ঞা বা ঈৰ্ষাবশত নহে, নিজের বুদ্ধিবৃত্তির প্রতি, নিজের কৰ্তব্যসাধনার প্রতি সন্মানবশত । অামাদের দেশে ইংরেজ-রাজনীতিতে অবিশ্বাস যে কিরুপ প্ৰবল সতৰ্কতার সঙ্গে কাজ করিতেছে এবং সেই অবিশ্বাস যে কিরুপ নিৰ্মমভাবে আপনার লক্ষ্যসাধন করিতেছে, তাহা পূর্বেই বলিয়াছি । উচ্চ ধৰ্মনীতির নহে, কিন্তু সাধারণ রাজনীতির দিক দিয়া দেখিলে এই কঠিন অটল অবিশ্বাসের জন্য ইংরেজকে দোষ দেওয়া যায় না । ঐক্যের যে কী শক্তি, কী মাহাত্ম্য, তাহা ইংরেজ আমাদের চেয়ে ভালো করিয়াই জানে। ইংরেজ জানে, ঐক্যের অনুভূতির মধ্যে কেবল একটা শক্তিমাত্ৰ নহে, পরন্তু এমন একটা আনন্দ অাছে যে সেই অনুভূতির আবেগে মানুষ সমস্ত দুঃখ ও ক্ষতি তুচ্ছ করিয়া অসাধ্যসাধনে প্ৰবৃত্ত হয় । ইংরেজ আমাদের চেয়ে ভালো করিয়াই জানে যে ক্ষমতা-অনুভূতির স্মৃতি মানুষকে কিরুপ একটা প্রেরণা দান করে । উচ্চ অধিকার লাভ করিয়া রক্ষা করিতে পারিলে সেইখানেই তাহা অামাদিগকে থাকিতে দেয় না—উচ্চতর অধিকারলাভের জন্য আমাদের সমস্ত প্ৰকৃতি উন্মুখ হইয়া উঠে । আমাদের শক্তি নাই, আমরা পারি না, এই ভয়ংকর মোহ । যে ব্যক্তি মোেহই সকলের চেয়ে ক্ষমতা প্ৰয়োগের অধিকার পায় নাই, সে আপনার শক্তির স্বাদ জানে না ; সে নিজেই নিজের পরম শত্ৰু । সে জানে যে আমি অক্ষম, এবং এইরুপ জানাই তাহার দারুণ দুৰ্বলতার কারণ । এরুপ অবস্থায় ইংরেজ যে আমাদের মধ্যে ঐক্যবন্ধনে পোলিটি কাল হিসাবে আনন্দবোধ করিবে না, অামাদের হাতে উচ্চ অধিকার দিয়া অামাদের ক্ষমতার অনুভূতিকে উত্তরোত্তর সবল করিয়া তুলিবার জন্য আগ্ৰহ অনুভব করিবে না। এ-কথা বুঝিতে অধিক মননশক্তির প্রয়োজন হয় না । অামাদের দেশে যে-সকল পোলিটিকাল প্ৰাৰ্থনা-সভা স্থাপিত হইয়াছে তাহারা যদি ভিক্ষুকের রীতিতেই ভিক্ষা করিত তাহা হইলেও হয়তো মাঝে মাঝে দরখাস্ত মঞ্জর হইত— কিন্তু তাহারা গৰ্জন করিয়া ভিক্ষা করে, তাহারা দেশবিদেশের লোক একত্ৰ করিয়া ভিক্ষা করে, তাহারা ভিক্ষাবৃত্তিকে একটা শক্তি করিয়া তুলিতে চেষ্টা করে, সুতরাং এই শক্তিকে প্ৰশ্ৰয় দিতে ৩০- ৭৭ রবীন্দ্র-রচনাবলী . وہ وف ইংরেজ রাজ সাহস করে না । ইহার প্রার্থনা পূরণ করিলেই ইহার শক্তির স্পৰ্ধাকে লালন করা হয় – এইজন্য ইংরেজ-রাজনীতি আড়ম্বরসহকারে ইহার প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করিয়া ইহার গর্বকে খর্ব করিয়া রাখিতে চান । এমন অবস্থায় এই সকল পোলিটিকাল সভা কৃতকার্যতার বল লাভ করিতে পারে না ; একত্র হইবার যে শক্তি তাহা ক্ষণকালের জন্য পায় বটে, কিন্তু সেই শক্তিকে একটা যথার্থ সার্থকতার দিকে প্রয়োগ করিবার যে ক্ষতি, তাহা পায় না। স্বতরাং নিফল চেষ্টায় প্রবৃত্ত শক্তি, ডিম্ব হইতে অকালে জাত অরুণের মতো পঙ্গু হইয়াই থাকে— সে কেবল রথেই জোড়া থাকিবার উমেদার হইয়া থাকে, তাহার নিজের উড়িবার কোনো উদ্যম থাকে না । কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ভারতবর্ষের পলিটিক্সে অবিশ্বাসনীতি রাজার তরফে অত্যন্ত স্থদুঢ়, অথচ আমাদের তরফে তাহ একান্ত শিথিল । আমরা একই কালে অবিশ্বাস প্রকাশ করি, কিন্তু বিশ্বাসের বন্ধন ছেদন করি না । ইহাকেই বলে ওরিয়েন্টাল,— এইখানেই পাশ্চাত্ত্যদের সঙ্গে আমাদের প্রভেদ । যুরোপ কায়মনোবাক্যে অবিশ্বাস করিতে জানে— আর, ষোলো-আনা অবিশ্বাসকে জাগাইয়া রাখিবার যে কঠিন শক্তি তাহা আমাদের নাই, আমরা ভুলিয়া নিশ্চিস্ত হইতে চাই, আমরা কোনোক্রমে বিশ্বাস করিতে পারিলে বাচি । যাহা অনাবশ্যক তাহাকেও রক্ষা করিবার, যাহা অপ্রদ্ধেয় তাহাকেও গ্রহণ করিবার, যাহা প্রতিকুল তাহাকেও অঙ্গীভূত করিবার জন্য আমরা চিরদিন প্রস্তুত হইয়া আছি । যুরোপ যাহা কিছু পাইয়াছে তাহ বিরোধ করিয়াই পাইয়াছে, আমাদের স্বাহকিছু সম্পত্তি তাহা বিশ্বাসের ধন । এখন বিরোধপরায়ণ জাতির সহিত বিশ্বাসপরায়ণ জাতির বোঝাপড়া মুশকিল হইয়াছে । স্বভাববিদ্রোহী স্বভাববিশ্বাসীকে শ্রদ্ধাই করে না । যাহাই হউক, চিরন্তন প্রকৃতিবশত আমাদের ব্যবহারে যাহাই প্রকাশ পাউক, ইংরেজ রাজা স্বভাবতই যে আমাদের ঐক্যের সহায় নহেন, আমাদের ক্ষমতালাভের অমুকুল নহেন, এ-কথা আমাদের মনকে অধিকার করিয়াছে। সেইজন্তই য়ুনিভার্সিটি সংশোধন, বঙ্গব্যবচ্ছেদ প্রভৃতি গবর্মেন্টের ব্যবস্থাগুলিকে আমাদের শক্তি খর্ব করিবার সংকল্প বলিয়া কল্পনা করিয়াছি । এমনতরো সন্দিগ্ধ অবস্থার স্বাভাবিক গতি হওয়া উচিত— আমাদের স্বদেশহিতকর সমস্ত চেষ্টাকে নিজের দিকে ফিরাইয়া আনা । আমাদের অবিশ্বাসের মধ্যে এইটুকুই আমাদের লাভের বিষয়। পরের নিকট আমাদের সমস্ত প্রত্যাশাকে বদ্ধ করিয়া রাখিলে কেবল ষে ফল পাওয়া যায় না, তাহা নহে, তাহাতে আমাদের ঈশ্বরপ্রদত্ত আত্মশক্তি ولا e Q আত্মশক্তির মাহাত্ম্য চিরদিনের জন্য নষ্ট হইয়া যায়। এইটেই আমাদিগকে বিশেষ করিয়া মনে রাখিতে হইবে । ইংরেজ আমাদের প্রার্থনাপূরণ করিবে না, অতএৰ আমরা তাহাদের কাছে যাইব না, এ স্ববুদ্ধিটা লজ্জাকর । বস্তুত এই কথাই আমাদের মনে রাখিতে হইবে— অধিকাংশ স্থলেই প্রার্থনাপূরণটাই আমাদের লোকসান। নিজের চেষ্টার দ্বারা যতটুকু ফল পাই তাহাতে ফলও পাওয়া যায়, শক্তিও পাওয়া যায়, সোনাও পাওয়া যায়, সঙ্গে সঙ্গে পরশপাথরও পাওয়া যায়। পরের দ্বার রুদ্ধ হইয়াছে বলিয়াই ভিক্ষাবৃত্তি হইতে যদি নিরস্ত হইতে হয়, পৌরুষবশত, মচুন্যত্ববশত, নিজের প্রতি, নিজের অন্তর্যামী পুরুষের প্রতি সম্মানবশত যদি না হয়, তবে এই ভিক্ষাবৈরাগ্যের প্রতি আমি কোনো ভরসা রাখি না । বস্তুত, ইংরেজের উপর রাগ করিয়া নিজের দেশের উপর হঠাৎ অত্যন্ত মনোযোগ দিতে আরম্ভ করা কেমন— যেমন স্বামীর উপরে অভিমান করিয়া সবেগে বাপের বাড়ি যাওয়া । সে-বেগের হ্রাস হইতে বেশিক্ষণ লাগে না, আবার দ্বিগুণ আগ্রহে সেই শ্বশুরবাড়িতেই ফিরিতে হয় । দেশের প্রতি আমাদের যে-সকল কর্তব্য আজ আমরা স্থির করিয়াছি, সে যদি দেশের প্রতি প্রীতির উপরেই প্রতিষ্ঠিত হয় তবেই তাহার গৌরব এবং স্থায়িত্ব ; ইংরেজের প্রতি রাগের উপরে যদি তাহার নির্ভর হয় তবে তাহার উপরে ভরসা রাখা বড়ো কঠিন। ডাক্তার অসম্ভব ভিজিট বাড়াইয়াছে বলিয়া তাহার উপরে রাগ করিয়া যদি শরীর ভালো করিতে চেষ্টা করি, তাহাতে ক্ষতি নাই, কিন্তু শরীরের প্রতি মমতা করিয়া যদি এ-কাজে প্রবৃত্ত হই, তবেই কাজটা যথার্থভাবে সম্পন্ন হইবার এবং উৎসাহ স্থায়িভাবে রক্ষিত হইবার সম্ভাবনা থাকে। তবে কিনা, যেমন ঘড়ির কল কোনো একটা আকস্মিক বাধায় বদ্ধ হইয়া থাকিলে তাহাকে প্রথমে একটা নাড়া দেওয়া যায়, তাহার পরেই সে আর দ্বিতীয় বাকানির অপেক্ষা না করিয়া নিজের দমেই নিজে চলিতে থাকে— তেমনি স্বদেশের প্রতি কর্তব্যপরতাও হয়তো আমাদের সমাজে একটা বড়ো রকমের ঝাকানির অপেক্ষায় ছিল— হয়তো স্বদেশের প্রতি স্বভাবসিদ্ধ প্রীতি এই ঝাকানির পর হইতে নিজের আভ্যন্তরিক শক্তিতেই আবার কিছুকাল সহজে চলিতে থাকিবে । অতএব এই ঝাকানিটা যাহাতে আমাদের মনের উপরে বেশ রীতিমতো লাগে, সে-পক্ষেও আমাদিগকে সচেষ্ট হইতে হইবে। যদি সাময়িক আন্দোলনের সাহায্যে আমাদের নিত্য জীবনীক্রিয়া সজাগ হইয়া উঠে, তবে এই স্থযোগটা ছাড়িয়া দেওয়া কিছু নয় । এখন তবে কথা এই যে, আমাদের দেশে বঙ্গব্যবচ্ছেদের আক্ষেপে আমরা যথাসম্ভব বিলাতি জিনিস কেনা বন্ধ করিয়া দেশী জিনিস কিনিবার জন্য যে সংকল্প রবীন্দ্র-রচনাবলী مow وات: করিয়াছি, সেই সংকল্পটিকে স্তব্ধভাবে, গভীরভাবে স্থায়ী মঙ্গলের উপরে স্থাপিত । করিতে হুইবে । আমি আমাদের এই বর্তমান উদযোগটির সম্বন্ধে যদি আনন্দ অনুভব করি, তবে তাহার কারণ এ নয় যে, তাহাতে ইংরেজের ক্ষতি হইবে, তাহার কারণ সম্পূর্ণভাবে এও নহে যে, তাহাতে আমাদের দেশী ব্যবসায়ীদের লাভ হইবে— এ সমস্ত লাভক্ষতি নানা বাহিরের অবস্থার উপরে নির্ভর করে— সে সমস্ত সূক্ষ্মভাবে বিচার করিয়া দেখা আমার ক্ষমতায় নাই । আমি আমাদের অস্তরের লাভের দিকটা দেখিতেছি । আমি দেখিতেছি, আমরা যদি সর্বদা সচেষ্ট হইয়া দেশী জিনিস ব্যবহার করিতে প্রবৃত্ত হই, যে-জিনিসটা দেশী নহে তাহার ব্যবহারে বাধ্য হইতে হইলে যদি কষ্ট অনুভব করিতে থাকি, দেশী জিনিস ব্যবহারের গতিকে যদি কতকটা পরিমাণে আরাম ও আড়ম্বর হইতে বঞ্চিত হইতে হয় যদি সেজন্য মাঝে মাঝে স্বদলের উপহাস ও নিন্দা সহ্য করিতে প্রস্তুত হই, তবে স্বদেশ আমাদের হৃদয়কে অধিকার করিতে পারিবে । এই উপলক্ষে আমাদের চিত্ত সর্বদা স্বদেশের অভিমুখ হইয়া থাকিবে । আমরা ত্যাগের দ্বারা দুঃখস্বীকারের দ্বারা আপন দেশকে যথার্থভাবে আপনার করিয়া লইব । আমাদের আরাম, বিলাস, আত্মস্থখতৃপ্তি আমাদিগকে প্রত্যহ স্বদেশ হইতে দূরে লইয়া যাইতেছিল, প্রত্যহ আমাদিগকে পরবশ করিয়া লোকহিতব্রতের জন্য অক্ষম করিতেছিল— আজ আমরা সকলে মিলিয়া যদি নিজের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় দেশের দিকে তাকাইয়া ঐশ্বর্ষের আড়ম্বর ও আরামের অভ্যাস কিছু পরিমাণও পরিত্যাগ করিতে পারি, তবে সেই ত্যাগের ঐক্য দ্বারা আমরা পরস্পর নিকটবতী হইয়া দেশকে বলিষ্ঠ করিতে পারিব । দেশী জিনিস ব্যবহার করার ইহাই যথার্থ সার্থকতা— ইহা দেশের পূজা, ইহা একটি মহান সংকল্পের নিকটে আত্মনিবেদন । এইরূপে কোনো-একটা কর্মের দ্বারা, কাঠিন্তের দ্বারা, ত্যাগের দ্বারা আত্মনিবেদনের জন্য আমাদের অন্তঃকরণ নিশ্চয়ই অপেক্ষা করিয়া আছে— আমরা কেবলমাত্র সভা ডাকিয়া, কথা কহিয়া, আবেদন করিয়া নিশ্চয়ই তৃপ্তিলাভ করি নাই । কখনো ভ্ৰমেও মনে করি নাই, ইহার দ্বারাই আমাদের জীবন সার্থক হইতেছে— ইহার দ্বারা আমরা নিজের একটা শক্তি উপলব্ধি করিতে পারি নাই ; ইহা আমাদের চিত্তকে, আমাদের পূজার ব্যগ্রতাকে, আমাদের মুখদুঃখনিরপেক্ষ ফলাফলবিচারবিহীন আত্মদানের ব্যাকুলতাকে দুনিবার বেগে বাহিরে আকর্ষণ করিয়া আনিতে পারে নাই । কি আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তির প্রকৃতিতে, কি জাতির প্রকৃতিতে কোনো-একটি মহা-আহবানে আপনাকে নিঃশেষে বাহিরে নিবেদন করিবার জন্য আত্মশক্তি Sలeసె প্রতীক্ষা অস্তরের অস্তরে বাস করিতেছে— সেখানে আমাদের দৃষ্টি পড়ে বা না পড়ে, তাহার নির্বাণহীন প্রদীপ জলিতেছেই । যখন কোনো বৃহৎ আকর্ষণে আমরা আপনাদের আরামের, আপনাদের স্বার্থের গহবর ছাড়িয়া আপনাকে যেন আপনার বাহিরে প্রবলভাবে সমর্পণ করিতে পারি, তখন আমাদের ভয় থাকে না, দ্বিধা থাকে না, তখনই আমরা আমাদের অন্তর্নিহিত অদ্ভুত শক্তিকে উপলব্ধি করিতে পারি— নিজেকে আর দীনহীন দুর্বল বলিয়া মনে হয় না। এইরূপে নিজের অস্তরের শক্তিকে এবং সেই শক্তির যোগে বৃহৎ বাহিরের শক্তিকে প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করাই আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের এবং জাতিগত সত্তার একমাত্র চরিতার্থতা । নিশ্চয় জানি, এই বিপুল সার্থকতার জন্য আমরা সকলেই অপেক্ষা করিয়া আছি। ইহারই অভাবে আমাদের সমস্ত দেশকে বিষাদে আচ্ছন্ন ও অবসাদে ভারাক্রান্ত করিয়া রাখিয়াছে । ইহারই অভাবে আমাদের মজ্জাগত দৌর্বল্য যায় না, আমাদের পরস্পরের মধ্যে অনৈক্য ঘোচে না, আমাদের আত্মাভিমানের চপলত কিছুতেই দূর হয় না । ইহারই অভাবে আমরা দুঃখ বহন করিতে, বিলাস ত্যাগ করিতে, ক্ষতি স্বীকার করিতে অসম্মত । ইহারই অভাবে আমরা প্রাণটাকে ভয়মুগ্ধ শিশুর ধাত্রীর মতো একান্ত আগ্রহে অঁাকড়িয়া ধরিয়া আছি, মৃত্যুকে নিঃশঙ্ক বীর্যের সহিত বরণ করিতে পারিতেছি না। যিনি আমাদের দেশের দেবতা, যিনি আমাদের পিতামহদের সহিত আমাদিগকে এক সূত্রে বাধিয়াছেন, যিনি আমাদের সন্তানের মধ্যে আমাদের সাধনাকে সিদ্ধিদান করিবার পথ মুক্ত করিতেছেন, যিনি আমাদের এই সূর্যালোকদীপ্ত নীলাকাশের নিম্নে যুগে যুগে সকলকে একত্র করিয়া এক বিশেষ বাণীর দ্বারা আমাদের সকলের চিত্তকে এক বিশেষ ভাবে উদবোধিত করিতেছেন, আমাদের চিরপরিচিত ছায়ালোকবিচিত্র অরণ্য-প্রান্তর-শস্তক্ষেত্র যাহার বিশেষ মূর্তিকে পুরুষানুক্রমে আমাদের চক্ষের সম্মুখে প্রকাশমান করিয়া রাখিয়াছে, আমাদের পুণ্যনদীসকল যাহার পাদোদকরূপে আমাদের গৃহের দ্বারে দ্বারে প্রবাহিত হইয়া ৰাইতেছে, যিনি জাতিনিবিশেষে হিন্দু-মুসলমান-খ্রীস্টানকে এক মহাযজ্ঞে আহবান করিয়া পাশে পাশে বসাইয়া সকলেরই অল্পের থালায় স্বহস্তে পরিবেশন করিয়া আসিতেছেন, দেশের অন্তর্বামী সেই দেবতাকে, আমাদের সেই চিরন্তন অধিপতিকে এখনো আমরা সহজে প্রত্যক্ষ করিতে পারি নাই । যদি অকস্মাং কোনো বৃহৎ ঘটনায়, কোনো মহান আবেগের ঝড়ে পর্দা একবার একটু উড়িয়া যায় তবে এই দেবাধিষ্ঠিত দেশের মধ্যে হঠাৎ দেখিতে পাইব, আমরা কেহই স্বতন্ত্র নহি, বিচ্ছিন্ন নহি– দেখিতে পাইব, যিনি যুগযুগান্তর হইতে আমাদিগকে এই সমুদ্রবিধৌত হিমাদ্রি-অধিরাজিত উদার e রবীন্দ্র-রচনাবলী نمون দেশের মধ্যে এক ধনধান্য, এক স্থখদুঃখ এক বিরাট প্রকৃতির মাঝখানে রাখিয়া নিরস্তর এক করিয়া তুলিতেছেন, সেই দেশের দেবতা দুর্জেয়, তাহাকে কোনোদিন কেহই অধীন করে নাই, তিনি ইংরেজি স্কুলের ছাত্র নহেন, তিনি ইংরেজ রাজার প্রজা নছেন, আমাদের বহুতর দুর্গতি র্তাহাকে স্পর্শও করিতে পারে নাই, তিনি প্রবল, তিনি চিরজাগ্ৰত— ইহার এই সহজমুক্ত স্বরূপ দেখিতে পাইলে তখনই আনন্দের প্রাচুর্ধবেগে আমরা অনায়াসেই পূজা করিব, ত্যাগ করিব, আত্মসমর্পণ করিব, কোনো উপদেশের অপেক্ষা থাকিবে না । তখন দুর্গম পথকে পরিহার করিব না, তখন পরের প্রসাদকেই জাতীয় উন্নতিলাভের চরম সম্বল মনে করাকে পরিহাস করিব এবং অপমানের মূল্যে আশু ফললাভের উদ্ধৃবৃত্তিকে অস্তরের সহিত অবজ্ঞা করিতে পারিব । আজ একটি আকস্মিক ঘটনায় সমস্ত বাঙালিকে একই বেদনায় আঘাত করাতে আমরা যেন ক্ষণকালের জন্যও আমাদের এই স্বদেশের অন্তর্যামী দেবতার আভাস পাইয়াছি । সেইজন্য, যাহারা কোনোদিন চিন্তা করিত না, তাহারা চিস্তা করিতেছে ; যাহারা পরিহাস করিত তাহারা স্তব্ধ হইয়াছে ; যাহারা কোনো মহান সংকল্পের দিকে তাকাইয়া কোনোরূপ ত্যাগস্বীকার করিতে জানিত না, তাহারাও যেন কিছু অসুবিধা ভোগ করিবার জন্য উদ্যম অনুভব করিতেছে এবং যাহারা প্রত্যেক কথাতেই পরের স্বারে ছুটিতে ব্যগ্র হইয়া উঠিত তাহারাও আজ কিঞ্চিৎ দ্বিধার সহিত নিজের শক্তি সন্ধান করিতেছে। একবার এই আশ্চর্য ব্যাপারটা ভালো করিয়া মনের মধ্যে অনুভব করিয়া দেখুন। ইতিপূর্বে রাজার কোনো অপ্রিয় ব্যবহারে বা কোনো অনভিমত আইনে আঘাত পাইয়া আমরা অনেকবার অনেক কলকৌশল, অনেক কোলাহল, অনেক সভাআহবান করিয়াছি ; কিন্তু আমাদের অন্ত:করণ বল পায় নাই, আমরা নিজের চেষ্টাকে নিজে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি নাই, এইজন্য সহস্ৰ অতু্যক্তি দ্বারাও রাজার প্রত্যয় আকর্ষণ করিতে পারি নাই, দেশেরও ঔদাসীন্য দূর করিতে পারি নাই । আজ আসন্ন বঙ্গবিভাগের উদযোগ বাঙালির পক্ষে পরম শোকের কারণ হইলেও এই শোক আমাদিগকে নিরুপায় অবসাদে অভিভূত করে নাই । বস্তুত, বেদনার মধ্যে আমরা একটা আনন্দই অনুভব করিতেছি । আনন্দের কারণ, এই বেদনার মধ্যে আমরা নিজেকে অনুভব করিতেছি— পরকে খুজিয়া বেড়াইতেছি না । আনন্দের কারণ, আমরা আভাস পাইয়াছি আমাদের নিজের একটা শক্তি আছে, সেই শক্তির প্রভাবে আজ আমরা ত্যাগ করিবার, দুঃখভোগ করিবার পরম অধিকার লাভ করিয়াছি । আজ আমাদের বালকেরাও বলিতেছে, "পরিত্যাগ করে, বিদেশের বেশভূষা, বিদেশের আত্মশক্তি や>> বিলাস পরিহার করো”— সে-কথা শুনিয়া বুদ্ধেরাও তাহাদিগকে ভৎসনা করিতেছে না, বিজ্ঞেরাও তাহাদিগকে পরিহাস করিতেছে না ; এই কথা নিঃসংকোচে বলিবার এবং এই কথা নিস্তব্ধ হইয়া শুনিবার বল আমার কোথা হইতে পাইলাম। স্থখেই হউক আর দুঃখেই হইক, সম্পদেই হউক আর বিপদেই হউক, হৃদয়ে হৃদয়ে যথার্থ ভাবে মিলন হইলেই যাহার আবির্ভাব আর মুহূর্তকাল গোপন থাকে না, তিনি আমাদিগকে বিপদের দিনে এই বল দিয়াছেন, দুঃখের দিনে এই আনন্দ দিয়াছেন । আজ দুর্যোগের রাত্রে ষে বিদ্যুতের আলোক চকিত হইতেছে সেই আলোকে যদি আমরা রাজপ্রাসাদের সচিবদেরই মুখমণ্ডল দেখিতে থাকিতাম, তবে আমাদের অস্তরের এই উদার উদ্যমটুকু কখনোই থাকিত না । এই আলোকে আমাদের দেবালয়ের দেবতাকে, আমাদের ঐক্যাধিষ্ঠাত্রী অভয়াকে দেখিতেছি— সেইজন্যই আজ আমাদের উৎসাহ এমন সজীব হইয়া উঠিল । সম্পদের দিনে নহে, কিন্তু সংকটের দিনেই বাংলাদেশ আপন হৃদয়ের মধ্যে এই প্রাণ লাভ করিল। ইহাতেই বুঝিতে হইবে, ঈশ্বরের শক্তি যে কেবল সম্ভবের পথ দিয়াই কাজ করে, তাহা নহে ; ইহাতেই বুঝিতে হইবে, দুর্বলেরও বল আছে দরিদ্রেরও সম্পদ আছে এবং দুর্ভাগ্যকেই সৌভাগ্য করিয়া তুলিতে পারেন যিনি, সেই জাগ্রত পুরুষ কেবল আমাদের জাগরণের প্রতীক্ষায় নিস্তব্ধ আছেন । র্তাহার অনুশাসন এ নয় যে, “গবর্মেণ্ট তোমাদের মানচিত্রের মাঝখানে যে একটা কৃত্রিম রেখা টানিয়া দিতেছেন, তোমরা তাহাদিগকে বলিয়া কহিয়া কাদিয়া কাটিয়া, বিলাতি জিনিস কেনা রহিত করিয়া, বিলাতে টেলিগ্রাম ও দূত পাঠাইয়া তাহাদের অনুগ্রহে সেই রেখা মুছিয়া লণ্ড ।” তাহার অতুশাসন এই যে “বাংলার মাঝখানে যে-রাজাই যতগুলি রেখাই টানিয়া দিন, তোমাদিগকে এক থাকিতে হইবে— আবেদন-নিবেদনের জোরে নয়, নিজের শক্তিতে এক থাকিতে হইবে, নিজের প্রেমে এক থাকিতে হইবে । রাজার দ্বারা বঙ্গবিভাগ ঘটিতেও পারে, না-ও ঘটিতে পারে— তাহাতে অতিমাত্র বিষন্ন বা উল্লসিত হইয়ো না— তোমরা যে আজ একই আকাঙ্ক্ষা অনুভব করিতেছ, ইহাতেই আনন্দিত হও এবং সেই আকাজক্ষা তৃপ্তির জন্য সকলের মনে যে একই উদ্যম জন্মিয়াছে, ইহার দ্বারাই সার্থকতা লাভ করে !” অতএব, এখন কিছুদিনের জন্য কেবল মাত্র একটা হৃদয়ের আন্দোলন ভোগ করিয়া এই শুভ সুযোগকে নষ্ট করিয়া ফেলিলে চলিবে না। আপনাকে সংবরণ করিয়া, সংযত করিয়া এই আবেগকে নিত্য করিতে হইরে । আমাদের যে ঐক্যকে একটা আঘাতের সাহায্যে দেশের আদ্যস্তমধ্যে আমরা একসঙ্গে সকলে অনুভব করিয়াছি,— আমরা ब्रदौडज-ब्रछनांचलौ جدلاوا হিন্দু-মুসলমান, ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, স্ত্রীলোক ও পুরুষ সকলেই বাঙালি বলিয়া যে এক বাংলার বেদন অনুভব করিতে পারিয়াছি, আঘাতের কারণ দূর হইলেই বা বিশ্বত হইলেই সেই ঐক্যের চেতনা যদি দূর হইয়া যায় তবে আমাদের মতো দুর্ভাগা আর কেহ নাই। এখন হইতে আমাদের ঐক্যকে নানা উপলক্ষ্যে নানা আকারে স্বীকার ও সম্মান করিতে হইবে। এখন হইতে আমরা হিন্দু ও মুসলমান, শহরবাসী ও পল্লীবাসী, পূর্ব ও পশ্চিম, পরস্পরের দৃঢ়বদ্ধ করতলের বন্ধন প্রতিক্ষণে অনুভব করিতে থাকিব । বিচ্ছেদে প্রেমকে ঘনিষ্ঠ করে, বিচ্ছেদের ব্যবধানের মধ্য দিয়া যে প্রবল মিলন সংঘটিত হইতে থাকে তাহা সচেষ্ট, জাগ্রত, বৈদ্যুত শক্তিতে পরিপূর্ণ। ঈশ্বরের ইচ্ছায় যদি আমাদের বঙ্গভূমি রাজকীয় ব্যবস্থায় বিচ্ছিন্নই হয়, তবে সেই বিচ্ছেদবেদনার উত্তেজনায় আমাদিগকে সামাজিক সম্ভাবে আরো দৃঢ়রূপে মিলিত হইতে হইবে, আমাদিগকে নিজের চেষ্টায় ক্ষতিপূরণ করিতে হইবে, সেই চেষ্টার উদ্রেকই আমাদের পরম লাভ । কিন্তু, অনির্দিষ্টভাবে, সাধারণভাবে এ-কথা বলিলে চলিবে না। মিলন কেমন করিয়া ঘটিতে পারে । একত্রে মিলিয়া কাজ করিলেই মিলন ঘটে, তাহা ছাড়া যথার্থ মিলনের আর-কোনো উপায় নাই । দেশের কার্য বলিতে আর ভুল বুঝিলে চলিবে না— এখন সেদিন নাই,— আমি যাহা বলিতেছি তাহার অর্থ এই, সাধ্যমতো নিজেদের অভাব মোচন করা, নিজেদের কর্তব্য নিজে সাধন করা Q এই অভিপ্রায়টি মনে রাখিয়া দেশের কর্মশক্তিকে একটি বিশেষ কতৃ সভার মধ্যে বদ্ধ করিতে হইবে। অন্তত একজন হিন্দু ও একজন মুসলমানকে আমরা এই সভার অধিনায়ক করিব— তাহাদের নিকটে নিজেকে সম্পূর্ণ অধীন, সম্পূর্ণ নত করিয়া রাখিব, তাহাদিগকে কর দান করিব, র্তাহাদের আদেশ পালন করিব, নিবিচারে তাহাদের শাসন মানিয়া চলিব— তাহাদিগকে সম্মান করিয়া আমাদের দেশকে সম্মানিত করিব । আমি জানি, আমার এই প্রস্তাবকে আমাদের বিবেচক ব্যক্তিগণ অসম্ভব বলিয়া উড়াইয় দিবেন। যাহা নিতান্তই সহজ, যাহাতে দুঃখ নাই, ত্যাগ নাই, অথচ আড়ম্বর আছে, উদ্দীপনা আছে, তাহা ছাড়া আর-কিছুকেই আমাদের স্বাদেশিকগণ সাধ্য বলিয়া গণ্যই করেন না। কিন্তু সম্প্রতি নাকি বাংলায় একটা দেশব্যাপী ক্ষোভ জন্সিয়াছে, সেই জন্তই আমি বিরক্তি ও বিন্দ্রপ উদ্রেকের আশঙ্কা পরিত্যাগ করিয়া আমার প্রস্তাবটি সকলের সম্মুখে উপস্থিত করিতেছি এবং আশ্বস্ত করিবার জন্য একটা ঐতিহাসিক নজিরও এখানে উদ্ধৃত করিতেছি । আমি যে-বিবরণটি পাঠ করিতে আত্মশক্তি סי גטא উষ্ঠত হইয়াছি তাহ রুশীয় গবর্মেন্টের অধীনস্থ বাহলীক প্রদেশীয় । ইহা কিছুকাল পূর্বে স্টেটসম্যান পত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল । সেই বাহনীক প্রদেশে জঙ্গীয় আর্মানিগণ যে-চেষ্টায় প্রবৃত্ত হইয়াছে তাহা যে কেন আমাদের পক্ষে দৃষ্টাস্তস্বরূপ হইবে না, তাহা জানি না । সেখানে ‘সকার্ট্ৰভেলিষ্ট’ নামধারী একটি জর্জীয় ‘ন্যাশনালিস্ট সম্প্রদায় গঠিত হইয়াছে— ইহারা ‘কার্স প্রদেশে প্রত্যেক গ্রাম্য জিলায় স্বদেশীয় বিচারকদের দ্বারা গোপন বিচারশালা স্থাপন করিয়া রাজকীয় বিচারালয়কে নিম্প্রভ कब्रिब्र निम्नां८छ्न | The peasants aver that these secret courts work with much greater expedition, accuracy and fairness than the Crown Courts, and that the Judges have the invaluable characteristic of incorruptibility. The Drozhakisti, or Armenian Nationalist party, had previously established a similar system of justice in the rural districts of the province of Erwan and more than that, they had practically supplanted the whole of the government system of rural administration and were employing agricultural experts, teachers and physicians of their own choosing. It has long been a matter of notoriety that ever since the suppression of Armenian schools by the Russian minister of Education, Delyanoff, who by the way, was himself an Armenian, the Armenian population of the Caucasus has maintained clandestine national schools of its own. আমি কেবল এই বৃত্তাস্তটি উদাহরণস্বরূপে উদ্ধৃত করিয়াছি— অর্থাৎ, ইহার মধ্যে এইটুকুই দ্রষ্টব্য যে, স্বদেশের কর্মভার দেশের লোকের নিজেদের গ্রহণ করিবার চেষ্টা একটা পাগলামি নহে— বস্তুত, দেশের হিতেচ্ছ ব্যক্তিদের এইরূপ চেষ্টাই একমাত্র স্বাভাবিক । আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষিত লোকে যে গবমেন্টের চাকরিতে মাথা বিকাইয়া রাখিয়াছেন, ইহার শোচনীয়তা কি আমরা চিন্তা করিব না,— কেবল চাকরির পথ আরো প্রশস্ত করিয়া দিবার জন্য প্রার্থনা করিব ? চাকরির খাতিরে আমাদের দুর্বলতা কতদূর বাড়িতেছে তাহা কি আমরা জানি না। আমরা মনিবকে খুশি Վ3ա Գե রবীন্দ্র-রচনাবলী 8لاوائ করিবার জন্য গুপ্তচরের কাজ করিতেছি, মাতৃভূমির বিরুদ্ধে হাত তুলিতেছি এবং যেমনিব আমাদের প্রতি অশ্রদ্ধা করে তাহার পৌরুষক্ষয়কর অপমানজনক আদেশও প্রফুল্লমুখে পালন করিতেছি— এই চাকরি আরো বিস্তার করিতে হইবে ? দেশের শিক্ষিত-সম্প্রদায়ের বন্ধনকে আরো দৃঢ় করিতে হইবে ? আমরা যদি স্বদেশের কর্মভার নিজে গ্রহণ করিতাম তবে গবর্মেন্টের আপিস রাক্ষসের মতো আমাদের দেশের শিক্ষিত লোকদিগকে কি এমন নিঃশেষে গ্রাস করিত । আবেদনের দ্বারা সরকারের চাকরি নহে, পৌরুষের দ্বারা স্বদেশের কর্মক্ষেত্র বিস্তার করিতে হইবে । যাহাতে আমাদের ডাক্তার, আমাদের শিক্ষক, আমাদের এঞ্জিনিয়ারগণ দেশের অধীন থাকিয়া দেশের কাজেই আপনার যোগ্যতার ক্ষতিসাধন করিতে পারেন, আমাদিগকে তাহার ব্যবস্থা করিতেই হইবে । নতুবা আমাদের যে কী শক্তি আছে, তাহার পরিচয়ই আমরা পাইব না। তা ছাড়া, এ-কথা আমাদিগকে মনে রাখিতে হইবে যে, সেবার অভ্যাসের দ্বারাই প্রীতির উপচয় হয় ; যদি আমরা শিক্ষিতগণ এমন কোথাও কাজ করিতাম যেখানে ‘দেশের কাজ করিতেছি? এই ধারণা সর্বদা স্পষ্টরূপে জাগ্রত থাকিত, তবে ‘দেশকে ভালোবাসো’ এ-কথা নীতিশাস্ত্রের সাহায্যে উপদেশ দিতে হইত না । তবে একদিকে যোগ্যতার অভিমান করা, অন্যদিকে প্রত্যেক অভাবের জন্য পরের সাহায্যের প্রার্থী হওয়া— এমনতরো অদ্ভূত অশ্রদ্ধাকর আচরণে আমাদিগকে প্রবৃত্ত হইতে হইত না, দেশের শিক্ষা স্বাধীন হইত এবং শিক্ষিত-সমাজের শক্তি বন্ধনমুক্ত হইত। জর্জীয়গণ, আর্মানিগণ প্রবল জাতি নহে— ইহার যে-সকল কাজ প্রতিকুল অবস্থাতেও নিজে করিতেছে, আমরা কি সেই-সকল কাজেরই জন্য দরবার করিতে দৌড়াই না । কৃষিতত্ত্বপারদর্শীদের লইয়া আমরাও কি আমাদের দেশের কৃষির উন্নতিতে প্রবৃত্ত হইতে পারিতাম না । আমাদের ডাক্তার লইয়া আমাদের দেশের স্বাস্থ্যবিধানচেষ্টা কি আমাদের পক্ষে অসম্ভব । আমাদের পল্লীর শিক্ষাভার কি আমরা গ্রহণ করিতে পারি না । যাহাতে মামলা-মকদ্দমায় লোকের চরিত্র ও সম্বল নষ্ট না হইয়া সহজ বিচারপ্রণালীতে সালিস-নিষ্পত্তি দেশে চলে, তাহার ব্যবস্থা করা কি আমাদের সাধ্যাতীত । সমস্তই সম্ভব হয়, যদি আমাদের এই-সকল স্বদেশী চেষ্টাকে যথার্থভাবে প্রয়োগ করিবার জন্য একটা দল বাধিতে পারি। এই দল, এই কতৃসভা আমাদিগকে স্থাপন করিতেই হইবে— নতুবা বলিব, আজ আমরা যে একটা উত্তেজনা প্রকাশ করিতেছি, তাহা মাদকতা মাত্র, তাহার অবসানে অবসাদের পঙ্কশয্যায় লুণ্ঠন করিতে হইবে। আত্মশক্তি や〉● একটা কথা আমাদিগকে ভালো করিয়া বুঝিতে হইবে যে, পরের প্রদত্ত অধিকার আমাদের জাতীয় সম্পদরূপে গণ্য হইতে পারে না— বরঞ্চ তাহার বিপরীত। দৃষ্টাস্তস্বরূপে একবার পঞ্চায়েতবিধির কথা ভাবিয়া দেখুন। একসময় পঞ্চায়েত আমাদের দেশের জিনিস ছিল, এখন পঞ্চায়েত গবর্মেন্টের আপিসে-গড়া জিনিস হইতে চলিল । যদি ফল বিচার করা যায় তবে এই দুই পঞ্চায়েতের প্রকৃতি একেবারে পরস্পরের বিপরীত বলিয়াই প্রতীত হইবে । ষে-পঞ্চায়েতের ক্ষমতা গ্রামের লোকের স্বতঃপ্রদত্ত নহে, যাহা গবর্মেন্টের দত্ত, তাহ বাহিরের জিনিস হওয়াতেই গ্রামের বক্ষে একটা অশাস্তির মতো চাপিয়া বসিবে— তাহা ঈর্ষার স্বষ্টি করিবে— এই পঞ্চায়েতপদ লাভ করিবার জন্য অযোগ্য লোকে এমন-সকল চেষ্টায় প্রবৃত্ত হইবে যাহাতে বিরোধ জন্মিতে থাকিবে— পঞ্চায়েত ম্যাজিস্টেটবর্গকেই স্বপক্ষ এবং গ্রামকে অপর পক্ষ বলিয়া জানিবে এবং ম্যাজিস্টেটের নিকট বাহবা পাইবার জন্য গোপনে অথবা প্রকাশ্বে গ্রামের বিশ্বাসভঙ্গ করিবে— ইহারা গ্রামের লোক হইয়া গ্রামের চরের কাজ করিতে বাধ্য হইবে এবং যে পঞ্চায়েত এ-দেশে গ্রামের বলস্বরূপ ছিল সেই পঞ্চায়েতই গ্রামের দুর্বলতার কারণ হইবে । ভারতবর্ষের যে সকল গ্রামে এখনো গ্রাম্য পঞ্চায়েতের প্রভাব বর্তমান আছে, যে-পঞ্চায়েত কালক্রমে শিক্ষার বিস্তার ও অবস্থার পরিবর্তন-অনুসারে স্বভাবতই স্বাদেশিক পঞ্চায়েতে পরিণত হইতে পারিত, যে গ্রাম্যপঞ্চায়েতগণ একদিন স্বদেশের সাধারণ কার্যে পরস্পরের মধ্যে যোগ বাধিয়া দাড়াইবে এমন আশা করা যাইত— সেই সকল গ্রামের পঞ্চায়েতগণের মধ্যে একবার যদি গবর্মেন্টের বেনে জল প্রবেশ করে, তবে পঞ্চায়েতের পঞ্চায়েতত্ব চিরদিনের মতো ঘুচিল । দেশের জিনিস হইয়া তাহার যে-কাজ করিত, গবর্মেন্টের জিনিস হইয়া সম্পূর্ণ উলটারকম কাজ করিবে । ইহা হইতে আমাদিগকে বুঝিতে হইবে, দেশের হাত হইতে আমরা যে-ক্ষমতা পাই তাহার প্রকৃতি একরকম, আর পরের হাত হইতে যাহা পাই তাহার প্রকৃতি সম্পূর্ণ অন্যরকম হুইবেই। কারণ, মূল্য না দিয়া কোনো জিনিস আমরা পাইতেই পারি না । সুতরাং দেশের কাছ হইতে আমরা যাহা পাইব সেজন্য দেশের কাছেই আপনাকে বিকাইতে হইবে— পরের কাছ হইতে যাহা পাইব সেজন্য পরের কাছে না বিকাইয়া উপায় নাই। এইরূপ বিদ্যাশিক্ষার স্থযোগ যদি পরের কাছে মাগিয়া লইতে হয় তবে শিক্ষাকে পরের গোলামি করিতেই হইবে— যাহা স্বাভাবিক, তাহার জন্য আমরা বৃথা চীৎকার করিয়া মরি কেন । দৃষ্টান্তস্বরূপ আর-একটা কথা বলি। মহাজনের চাষিদের অধিক স্বদে কর্জ দিয়া রবীন্দ্র-রচনাবলী والاول 聯 তাহাদের সর্বনাশ করিতেছে, আমরা প্রার্থনা ছাড়া অন্য উপায় জানি না— অতএব গবমেণ্টকেই অথৰা বিদেশী মহাজনদিগকে যদি আমরা বলি যে, “তোমরা অল্প স্বদে আমাদের গ্রামে গ্রামে কৃষি-ব্যাঙ্ক স্থাপন করো, তবে নিজে খন্দের ভাকিয়া আনিয়া আমাদের দেশের চাষিদিগকে নিঃশেষে পরের হাতে বিকাইয়া দেওয়া হয় না ? যাহারা যথার্থই দেশের বল, দেশের সম্পদ, তাহাদের প্রত্যেকটিকে কি পরের হাতে এমনি করিয়া বাধা রাখিতে হইবে । আমরা ষে-পরিমাণেই দেশের কাজ পরকে দিয়া করাইব সেই পরিমাণেই আমরা নিজের শক্তিকেই বিকাইতে থাকিব, দেশকে স্বেচ্ছাকৃত অধীনতাপাশে উত্তরোত্তর অধিকতর বঁাধিতে থাকিব, এ-কথা বুঝাই কি এতই কঠিন। পরের প্রদত্ত ক্ষমতা আমাদের উপস্থিত সুবিধার কারণ যেমনই হউক তাহা আমাদের পক্ষে ছদ্মবেশী অভিসম্পাত, এ-কথা স্বীকার করিতে আমাদের যত বিলম্ব হইবে, আমাদের মোহজাল ততই দুশ্চেন্ত হইয়া উঠিতে থাকিবে । অতএব, আর দ্বিধা না করিয়া আমাদের গ্রামের স্বকীয় শাসনকার্য আমাদিগকে নিজের হাতে লইতেই হইবে। সরকারি পঞ্চায়েতের মুষ্টি আমাদের পল্লীর কণ্ঠে দৃঢ় হইবার পূর্বেই আমাদের নিজের পল্লী-পঞ্চায়েতকে জাগাইয়া তুলিতে হইবে । চাষিকে আমরাই রক্ষা করিব, তাহার সন্তানদিগকে আমরাই শিক্ষা দিব, কৃষির উন্নতি আমরাই সাধন করিব, গ্রামের স্বাস্থ্য আমরাই বিধান করিব এবং সর্বনেশে মামলার হাত হইতে আমাদের জমিদার ও প্রজাদিগকে আমরাই বঁাচাইব । এ-সম্বন্ধে রাজার সাহায্য লইবার কল্পনাও যেন আমাদের মাথায় না আসে— কারণ, এ-স্থলে সাহায্য লইবার অর্থই দুর্বলের স্বাধীন অধিকারের মধ্যে প্রবলকে ডাকিয়া আনিয়া বসানো । একবার বিবেচনা করিয়া দেখিবেন, বিদেশী শাসনকালে বাংলাদেশে যদি এমন কোনো জিনিসের স্বষ্টি হইয়া থাকে যাহা লইয়া বাঙালি যথার্থ গৌরব করিতে পারে, তাহা বাংলা সাহিত্য । তাহার একটা প্রধান কারণ, বাংলা সাহিত্য সরকারের নেমক থায় নাই। পূর্বে প্রত্যেক বাংলা বই সরকার তিনখানি করিয়া কিনিতেন, শুনিতে পাই এখন মূল্য দেওয়া বন্ধ করিয়াছেন। ভালোই করিয়াছেন। গবর্মেন্টের উপাধি-পুরস্কার-প্রসাদের প্রলোভন বাংলা সাহিত্যের মধ্যে প্রবেশ করিতে পারে নাই বলিয়াই, এই সাহিত্য বাঙালির স্বাধীন আনন্দ-উৎস হইতে উৎসারিত বলিয়াই, আমরা এই সাহিত্যের মধ্য হইতে এমন বল পাইতেছি । হয়তো গণনায় বাংলাভাষায় উচ্চশ্রেণীর গ্রন্থ-সংখ্যা অধিক না হইতে পারে, হয়তো বিষয়বৈচিত্র্যে এ-সাহিত্য অন্যান্ত সম্পংশালী সাহিত্যের সহিত তুলনীয় নহে, কিন্তু তৰু ইহাকে আমরা বর্তমান অসম্পূর্ণতা অতিক্রম করিয়া বড়ো করিয়া দেখিতে পাই— কারণ, আত্মশক্তি به لأوانا ইহা আমাদের নিজের শক্তি হইতে, নিজের অন্তরের মধ্য হইতে উদ্ভূত হইতেছে। এ ক্ষীণ হউক, দীন হউক, এ রাজার প্রশ্রয়ের প্রত্যাশী নহে,— আমাদেরই প্রাণ ইহাকে প্রাণ জোগাইতেছে। অপর পক্ষে, আমাদের স্কুল-বইগুলির প্রতি নৃানাধিক পরিমাণে অনেক দিন হইতেই সরকারের গুরুহস্তের ভার পড়িয়াছে, এই রাজপ্রসাদের প্রভাবে এই-বইগুলির কিরূপ শ্ৰী বাহির হইতেছে তাহা কাহারও অগোচর নাই । এই-যে স্বাধীন বাংলা সাহিত্য যাহার মধ্যে বাঙালি নিজের প্রকৃত শক্তি যথার্থভাবে অনুভব করিয়াছে, এই সাহিত্যই নাড়ীজালের মতো বাংলার পূর্ব-পশ্চিম, উত্তরদক্ষিণকে এক বন্ধনে বাধিয়াছে ; তাহার মধ্যে এক চেতনা, এক প্রাণ সঞ্চার করিয়া রাখিতেছে ; যদি আমাদের দেশে স্বদেশীসভাস্থাপন হয় তবে বাংলা সাহিত্যের অভাবমোচন, বাংলা সাহিত্যের পুষ্টিসাধন সভ্যগণের একটি বিশেষ কার্ষ হইবে । বাংলা ভাষা অবলম্বন করিয়া ইতিহাস, বিজ্ঞান, অর্থনীতি প্রভৃতি বিচিত্ৰ বিষয়ে দেশে জ্ঞান বিস্তারের চেষ্টা তাহাদিগকে করিতে হইবে । ইহা নিশ্চয় জানিতে হইবে যে, বাংলা সাহিত্য যত উন্নত সতেজ, যতই সম্পূর্ণ হইবে, ততই এই সাহিত্যই বাঙালি জাতিকে এক করিয়া ধারণ করিবার অনশ্বর আধার হইবে । বৈষ্ণবের গান, কৃত্তিবাসের রামায়ণ, কাশীরাম দাসের মহাভারত আজ পর্যস্ত এই কাজ করিয়া আসিয়াছে । আমি জানি, সমস্ত বাংলাদেশ এক মুহূর্তে একত্র হইয়া আপনার নায়ক নির্বাচনপূর্বক আপনার কাজে প্রবৃত্ত হইবে, এমন আশা করা যায় না। এখন আর বাদবিবাদ তর্কবিতর্ক না করিয়া আমরা যে-কয়জনেই উৎসাহ অনুভব করি, প্রয়োজন স্বীকার করি, সেই পাচ-দশজনেই মিলিয়া আমরা আপনাদের অধিনায়ক নির্বাচন করিব, র্তাহার নিয়োগক্রমে জীবনযাত্রা নিয়মিত করিব, কর্তব্য পালন করিব, এবং সাধ্যমতে আপনার পরিবার প্রতিবেশী ও পল্লীকে লইয়া সুখ-স্বাস্থ্য-শিক্ষাবিধান সম্বন্ধে একটি স্বকীয় শাসনজাল বিস্তার করিব । এই প্রত্যেক দলের নিজের পাঠশালা, পুস্তকালয়, ব্যায়ামাগার, ব্যবহার্য দ্রব্যাদির বিক্রয়ভাণ্ডার ( কো-অপারেটিভ স্টোর ) ঔষধালয়, সঞ্চয়-ব্যাঙ্ক, সালিস নিম্পত্তির সভা ও নির্দোষ আমোদের মিলনগৃহ থাকিবে । এমনি করিয়া যদি আপাতত খণ্ড খণ্ড ভাবে দেশের নানা স্থানে এইরূপ এক-একটি কতৃসভা স্থাপিত হইতে থাকে, তবে ক্রমে একদিন এই-সমস্ত খণ্ডসভাগুলিকে যোগসূত্রে এক করিয়া তুলিয়া একটি বিশ্ববঙ্গপ্রতিনিধিসভা প্রতিষ্ঠিত হইতে পারিবে । আমরা এই সময়ে এই উপলক্ষ্যে বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎকে বাংলার ঐক্যসাধনযজ্ঞে রবীন্দ্র-রচনাবলী عيان والا বিশেষভাবে আহবান করিতেছি । র্তাহারা পরের দিকে না তাকাইয়া, নিজেকে পরের কাছে প্রচার না করিয়া, নিজের সাধ্যমতো স্বদেশের পরিচয়লাভ ও তাহার জ্ঞানভাণ্ডার-পূরণ করিতেছেন । এই পরিষৎকে জেলায় জেলায় আপনার শাখাসভা স্থাপন করিতে হইবে, এবং পর্যায়ক্রমে এক-একটি জেলায় গিয়া পরিষদের বার্ষিক অধিবেশন সম্পন্ন করিতে হইবে। আমাদের চিন্তার ঐক্য, ভাবের ঐক্য, ভাষার ঐক্য, সাহিত্যের ঐক্য সম্বন্ধে সমস্ত দেশকে সচেতন করিবার, এই ভাষা ও সাহিত্য সম্বন্ধে আপন স্বাধীন কর্তব্য পালন করিবার ভার সাহিত্য-পরিষৎ গ্রহণ করিয়াছেন । এখন সময় উপস্থিত হইয়াছে— এখন সমস্ত দেশকে নিজের অনুকূল্যে আহবান করিবার জন্য র্তাহাদিগকে সচেষ্ট হইতে হইবে । যথন দেখা যাইতেছে, বাহির হইতে আমাদিগকে বিচ্ছিন্ন করিবার চেষ্টা নিয়ত সতর্ক রহিয়াছে, তখন তাহার প্রতিকারের জন্য নানারূপে কেবলই দল বাধিবার দিকে আমাদের সমস্ত চেষ্টাকে নিযুক্ত করিতে হইবে । 臀 যে-গুণে মানুষকে একত্র করে তাহার মধ্যে একটা প্রধান গুণ বাধ্যতা । কেবলই অন্যকে খাটো করিবার চেষ্টা, তাহার ক্রটি ধরা, নিজেকে কাহারও চেয়ে নূ্যন মনে না করা, নিজের একটা মত অনাদৃত হইলেই অথবা নিজের একটুখানি সুবিধার ব্যাঘাত হইলেই দল ছাড়িয়া আসিয়া তাহার বিরুদ্ধাচরণ করিবার প্রয়াস — এইগুলিই সেই শয়তানের প্রদত্ত বিষ যাহা মাকুষকে বিশ্লিষ্ট করিয়া দেয়, যজ্ঞ নষ্ট করে। ঐক্যরক্ষার জন্য আমাদিগকে অযোগ্যের কতৃত্বও স্বীকার করিতে হইবে – ইহাতে মহান সংকল্পের নিকট নত হওয়া হয়, অযোগ্যতার নিকট নহে । বাঙালিকে ক্ষুদ্র আত্মাভিমান দমন করিয়া নানারূপে বাধ্যতার চর্চা করিতে হইবে, নিজে প্রধান হইবার চেষ্টা মন হইতে সম্পূর্ণরূপে দূর করিয়া অন্যকে প্রধান করিবার চেষ্টা করিতে হইবে । সর্বদাই অন্যকে সন্দেহ করিয়া, অবিশ্বাস করিয়া, উপহাস করিয়া, তীক্ষ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় না দিয়া বরঞ্চ নম্রভাবে বিনা বাক্যব্যয়ে ঠকিবার জল্পও প্রস্তুত হইতে হইবে । সম্প্রতি এই কঠিন সাধনা আমাদের সম্মুখে রহিয়াছে— আপনাকে খর্ব করিয়া আপনাদিগকে বড়ো করিবার এই সাধনা, গর্বকে বিসর্জন দিয়া গৌরবকে আশ্রয় করিবার এই সাধনা— ইহা যখন আমাদের সিদ্ধ হইবে তখন আমরা সর্বপ্রকার কতৃত্বের যথার্থরূপে যোগ্য হইব। ইহাও নিশ্চিত, যথার্থ যোগ্যতাকে পৃথিবীতে কোনো শক্তিই প্রতিরোধ করিতে পারে না। আমরা যখন কতৃত্বের ক্ষমতা লাভ করিব তখন আমরা দাসত্ব করিব না— তা আমাদের প্রভু যত বড়োই প্রবল হউন। জল যখন জমিয়া কঠিন হয় তখন সে লোহার পাইপকেও ফাটাইয়া ফেলে । আত্মশক্তি _ \9)వి আজ আমরা জলের মতো তরল আছি, যন্ত্রীর ইচ্ছামতো যন্ত্রের তাড়নায় লোহার কলের মধ্যে শত শত শাখাপ্রশাখায় ধাবিত হইতেছি— জমাট বাধিবার শক্তি জন্মিলেই লোহার বঁাধনকে হার মানিতেই হইবে । আমাদের নিজের দিকে যদি সম্পূর্ণ ফিরিয়া দাড়াইতে পারি, তবে নৈরাপ্তের লেশমাত্র কারণ দেখি না। বাহিরের কিছুতে আমাদিগকে বিচ্ছিন্ন করিবে, এ-কথা আমরা কোনোমতেই স্বীকার করিব না। কৃত্রিম বিচ্ছেদ যখন মাঝখানে আসিয়া দাড়াইবে তখনই আমরা সচেতনভাবে অনুভব করিব যে, বাংলার পূর্ব-পশ্চিমকে চিরকাল একই জাহ্নবী তাহার বহু বাহুপাশে বাধিয়াছেন, একই ব্ৰহ্মপুত্র তাহার প্রসারিত আলিঙ্গনে গ্রহণ করিয়াছেন, এই পুর্ব-পশ্চিম হৃৎপিণ্ডের দক্ষিণ-বাম অংশের ন্যায়, একই পুরাতন রক্তস্রোতে সমস্ত বঙ্গদেশের শিরা-উপশিরায় প্রাণবিধান করিয়া আসিয়াছে ; এই পূর্ব-পশ্চিম, জননীর বাম-দক্ষিণ স্তনের ন্যায়, চিরদিন বাঙালির সস্তানকে পালন করিয়াছে । আমাদের কিছুতেই পৃথক করিতে পারে, এ-ভয় যদি আমাদের জন্মে, তবে সে-ভয়ের কারণ নিশ্চয়ই আমাদেরই মধ্যে আছে এবং তাহার প্রতিকার আমাদের নিজের চেষ্টা ছাড়া আর-কোনো কৃত্রিম উপায়ের দ্বারা হইতে পারে না। কতৃপক্ষ আমাদের একটা কিছু করিলেন বা না করিলেন বলিয়াই যদি আমাদের সকল দিকে সর্বনাশ হইয়া গেল বলিয়া আশঙ্কা করি, তবে কোনো কৌশললন্ধ সুযোগে কোনো প্রার্থনালব্ধ অনুগ্রহে আমাদিগকে অধিক দিন রক্ষা করিতে পারিবে না । ঈশ্বর আমাদের নিজের হাতে যাহা দিয়াছেন তাহার দিকে যদি তাকাইয়া দেখি, তবে দেখিব, তাহা যথেষ্ট এবং তাহাই যথার্থ। মাটির নিচে যদি বা তিনি আমাদের জন্য গুপ্তধন না দিয়া থাকেন, তবু আমাদের মাটির মধ্যে সেই শক্তিটুকু দিয়াছেন যাহাতে বিধিমতো কর্ষণ করিলে ফললাভ হইতে কখনোই বঞ্চিত হইব না। বাহির হইতে স্থবিধা এবং সম্মান যখন হাত বাড়াইলেই পাওয়া যাইবে না, তখনই ঘরের মধ্যে যে চিরসহিষ্ণু চিরন্তন প্রেম লক্ষ্মীছাড়াদের গৃহ প্রত্যাবর্তনের জন্য গোধূলির অন্ধকারে পথ তাকাইয়া আছে, তাহার মূল্য বুঝিব। তখন মাতৃভাষায় ভ্রাতৃগণের সহিত সুখদুঃখ-লাভক্ষতি আলোচনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিতে পারিব— এবং সেই শুভদিন যখন আসিবে তখনই ব্রিটিশ শাসনকে বলিব ধন্য— তখনই অনুভব করিব, বিদেশীর এই রাজত্ব বিধাতারই মঙ্গলবিধান । আমরা যাচিত ও অযাচিত যে-কোনো অনুগ্রহ পাইয়াছি তাহা যেন ক্রমে আমাদের অঞ্জলি হইতে স্থলিত হইয়া পড়ে এবং তাহা যেন স্বচেষ্টায় নিজে অর্জন করিয়া লইবার অবকাশ পাই । আমরা প্রশ্রয় চাহি না— প্রতিকূলতার দ্বারাই আমাদের শক্তির উদবোধন হইবে । আমাদের అను রবীন্দ্র-রচনাবলী নিত্রার সহায়তা কেহ করিয়ো না— আরাম আমাদের জন্য নহে, পরবশতার অহিফেনের মাত্রা প্রতিদিন আর বাড়িতে দিয়ে না— বিধাতার রুদ্রমূর্তিই আজ আমাদের পরিত্রাণ ! জগতে জড়কে সচেতন করিয়া তুলিবার এইমাত্র উপায় আছে— আঘাত, অপমান ও অভাব ; সমাদর নহে, সহায়তা নহে, স্বভিক্ষা নহে। ব্ৰত ধারণ কোনো স্ত্রীসমাজে জনৈক মহিল-কতৃক পঠিত আজ এই স্ত্রীসমাজে আমি যে উপদেশ দিতে উঠিয়াছি বা আমার কোনো নূতন কথা বলিবার আছে, এমন অভিমান আমার নাই । আমার কথা নূতন নহে বলিয়াই, কাহাকেও উপদেশ দিতে হইবে না বলিয়াই, আমি আজ সমস্ত সংকোচ পরিহার করিয়া আপনাদের সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়াছি। যে-কথাটি আজ দেশের অস্তরে অস্তরে সর্বত্র জাগ্রত হইয়াছে, তাহাকেই নারীসমাজের নিকট সুস্পষ্টরূপে গোচর করিয়া তুলিবার জন্যই আমাদের অন্তকার এই উদযোগ । আমাদের দেশে সম্প্রতি একটি বিশেষ সময় উপস্থিত হইয়াছে, তাহা আমর। সকলেই অনুভব করিতেছি । অল্পদিনের মধ্যে আমাদের দেশ আঘাতের পর আঘাত প্রাপ্ত হইয়াছে । হঠাৎ বুঝিতে পারিয়াছি যে, আমাদের যাত্রাপথের দিকৃপরিবর্তন করিতে হইবে । যে-সময়ে এইরূপ দেশব্যাপী আঘাতের তাড়না উপস্থিত হইয়াছে, যে-সময়ে আমাদের সকলেরই হৃদয় কিছু না কিছু চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে, সেই সময়কে যদি আমরা উপেক্ষা করি তবে বিধাতার প্রেরণাকে অবজ্ঞা করা হইবে । # ইহাকে দুৰ্যোগ বলিব কি। এই-যে দিগ দিগন্তে ঘন মেঘ করিয়া শ্রাবণের অন্ধকার ঘনাইয়া আসিল, এই-ষে বিদ্যুতের আলোক এবং বঞ্জের গর্জন আমাদের হৃৎপিণ্ডকে চকিত করিয়া তুলিতেছে, এই-যে জলধারাবর্ষণে পৃথিবী ভাসিয়া গেল— এই দুৰ্যোগকেই যাহারা স্থযোগ করিয়া তুলিয়াছে তাহারাই পৃথিবীর অন্ন জোগাইবে । এখনই স্কন্ধে হল লইয়া কৃষককে কোমর বাধিতে হইবে । এই সময়টুকু যদি অতিক্রম করিতে দেওয়া হয় তবে সমস্ত বৎসর দুভিক্ষ এবং হাহাকার । আমাদের দেশেও সম্প্রতি ঈশ্বর দুর্যোগের বেশে যে-স্থযোগকে প্রেরণ করিয়াছেন তাহাকে নষ্ট হইতে দিব না বলিয়াই আজ আমাদের সামান্ত শক্তিকেও যথাসম্ভব সচেষ্ট