আমার বাল্যকথা/গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর (মেজকাকা)

গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর (মেজকাকা)

 মেজকাকা মহাশয় সুরসিক, অমায়িক সৌখীন পুরুষ ছিলেন। যেন বিলাসিতা মূর্তিমান। তাঁর সখের বাগানটি ফলে, ফুলে সুশোভিত—আঙ্গুর, বাতাবী নেবু, পীচ প্রভৃতি বাছা বাছা ফল, আর চম্পা, চামেলী, মালতী, বেল, জুঁই, রজনীগন্ধা, গোলাপ, বকুল কত রকম সুগন্ধ ফুলের গাছ। একটি ছোট জাতের জুঁই ফুলের ব্যাড়া ছিল, রোজ বিকেলবেলা সেই সব জুঁই ফুল আমরা রাশি রাশি কুড়িয়ে আনতুম। যেমন কলাবিদ্যার প্রতি তেমনি বিজ্ঞানের দিকেও তাঁর আন্তরিক অনুরাগ ছিল। তিনি অনেক সময় বৈজ্ঞানিক Experiments নিয়ে আমোদ করতেন ও আমাদের ডেকে আমোদ দিতেন। রাসায়নিক বৈদ্যুতিক ক্রিয়ার প্রদর্শনের মধ্যে যা মনে আছে তা হচ্ছে Galvanic Battery-র প্রয়োগ, তাড়িতপ্রবাহযোগে আমার যে সর্বাঙ্গ কম্পমান হত সে সহজে ভোলবার নয়। সে সব বৈজ্ঞানিক ভেল্কীবাজীতে আমাদের খুবই আমোদ হত। যেমন বিজ্ঞানে তেমনি সাহিত্যক্ষেত্রেও মেজকাকার গতিবিধি ছিল। তিনি যে কতকগুলি সঙ্গীত রচনা করেছিলেন তার মধ্যে একটি শিখেছিলুম—সে এই:—

ললিত

দুখে গেল সুখনিশি প্রাণনাথ কৈ এল
সুখের শয়ন আজু নয়নজলে ভেসে গেল।
আকাশেরি শোভা তারা, আকাশে মিশাল তারা,
রমণীর দুখতারা সুখতারা প্রকাশিল।

 মেজকাকা “বাবুবিলাস” নামে একটি নাটক রচনা করেছিলেন, একবার তার অভিনয় হয়েছিল। তাঁর মোসাহেবের মধ্যে দীননাথ ঘোষাল বলে একটি চালাক চতুর লোক ছিল সেই ‘বাবু’ সেজেছিল। অভিনয় কি রকম ওতরাল বিশেষ কিছু বলতে পারি না। আমরা ত আর সে মজলিসে আসন পাইনি, উঁকি ঝুঁকি দিয়ে যা কিছু দেখা। ‘কামিনীকুমার’ বলে তার একখানি পদ্যোপাখ্যানেরও সেকালে বেশ আদর ছিল।

 মেজকাকার সব দিকেই চৌকষ বুদ্ধি ছিল। বিষয়কর্মে তাঁর যে দক্ষতা মহর্ষির আত্মজীবনী থেকে তার কতক পরিচয় পাওয়া যায়।

 উপরে দীননাথ ঘোষালের নাম উল্লেখ করেছি। তিনি আমাদের ভারী প্রিয় পাত্র ছিলেন, তাঁকে হাতের কাছে পেলে তাঁর কাছ থেকে রামায়ণ মহাভারতের গল্প আদায় না করে কিছুতেই ছাড়তুম না। তিনিও কথক ঠাকুরের মত গল্পের ঘটায় আমাদের মনোরঞ্জন করতেন। রামায়ণ ও মহাভারত ছেলেবেলায় এইরূপ মুখোমুখি শুনেই আমাদের এক রকম শেখা হয়ে গিয়েছিল।