কাব্যগ্রন্থ (প্রথম খণ্ড)/প্রভাত-সঙ্গীত/প্রভাত-উৎসব

প্রভাত-উৎসব

হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি!
জগত আসি সেথা করিছে কেলাকুলি।
ধরায় আছে যত মানুষ শত শত,
আসিছে প্রাণে মোর হাসিছে গলাগলি।

এসেছে সখা-সখী, বসিয়া চোখোচোখী,
দাঁড়ায়ে মুখোমুখী হাসিছে শিশুগুলি।
এসেছে ভাই বোন্ পুলকে-ভরা মন,
ডাকিছে “ভাই ভাই” আঁখিতে আঁখি তুলি
সখারা এল ছুটে, নয়নে তারা ফুটে,
পরাণে কথা উঠে, বচন গেল ভুলি।
সখীরা হাতে হাতে ভ্রমিছে সাথে সাথে
দোলায় চড়ি তারা করিছে দোলাদুলি।
শিশুরে লয়ে কোলে জননী এল চলে
বুকেতে চেপে ধরে বলিছে “ঘুমো ঘুমো”
আনত ছনয়ানে চাহিয়া মুখপানে
বাছার চাঁদমুখে খেতেছে শত চুমো।

পুলকে পূরে প্রাণ শিহরে কলেবর,
প্রেমের ডাক শুনি এসেছে চরাচর।
এসেছে রবি শশী এসেছে কোটি তারা
ঘুমের শিয়রেতে জাগিয়া থাকে যারা।
পরাণ পূরে গেল, হরষে হল তোর,
জগতে কেহ নাই, সবাই প্রাণে মোর।
প্রভাত হল যেই কি জানি হল একি!
আকাশপানে চাই, কি জানি কারে দেখি।
প্রভাতবায়ু বহে কি জানি কি যে কহে,
মরম-মাঝে মোর কি জানি কি যে হয়।
এসহে এস কাছে সখাহে এস কাছে—
এসহে ভাই এস, বসহে প্রাণ-ময়!
পূরব-মেঘ-মুখে পড়েছে রবি-রেখা,
অরুণ-রথ-চূড়া আধেক যায় দেখা।
তরুণ আলো দেখে পাখীর কলরব,
মধুর আহা কিবা মধুর মধু সব!
মধুর মধু আলো, মধুর মধু বায়,
মধুর মধু গানে তটিনী বহে যায়;
যেদিকে আঁখি চায় সেদিকে চেয়ে থাকে,
যাহারি দেখা পায় তারেই কাছে ডাকে;
নয়ন ডুবে যায় শিশির-আঁখি-ধারে,
হৃদয় ডুবে যায় হরষ-পারাবারে।

আয়রে আয় বায়ু যা রে যা প্রাণ নিয়ে,
জগত মাঝারেতে দেরে তা প্রসারিয়ে।
ভ্রমিবি বনে বনে যাইবি দিশে দিশে,
সাগরপারে গিয়ে পূরবে যাবি মিশে;
লইবি পথ হতে পাখীর কলতান,
যূথীর মৃদু শ্বাস মালতাঁ-মৃদুবাস,
অমনি তারি সাথে যা রে যা নিয়ে প্রাণ।

পাখীর গীতধার ফুলের বাস-ভার
ছড়াবি পথে পথে হরষে হয়ে ভোর,
অমনি তারি সাথে ছড়াবি প্রাণ মোর।
ধরারে ঘিরি ঘিরি কেবলি যাবি বয়ে;
ধরার চারিদিকে প্রাণেরে ছড়াইয়ে।
.
পেয়েছি এত প্রাণ যতই করি দান
কিছুতে যেন আর ফুরাতে নারি তারে!
আয়রে মেঘ, আয় বারেক নেমে আয়,
কোমল কোলে তুলে আমারে নিয়ে যা রে।
কনক পাল তুলে বাতাসে দুলে দুলে।
ভাসিতে গেছে সাধ আকাশ-পারাবারে।

আকাশ, এস এস, ডাকিছ বুঝি ভাই,
গেছি ত তোরি বুকে আমি ত হেথা নাই।

প্রভাত-আলো-সাথে ছড়ায় প্রাণ মোর,
আমার প্রাণ দিয়ে ভরিব প্রাণ তোর।

ওঠ হে ওঠ রবি, আমারে তুলে লও,
অরুণ-তরী তব পূরবে ছেড়ে দাও।
আকাশ-পারাবার বুঝি হে পার হবে—
আমারে লও তবে—আমারে লও তবে।

জগত আসে প্রাণে, জগতে যায় প্রাণ,
জগতে প্রাণে মিলি গাহিছে এ কি গান।
কে তুমি মহাজ্ঞানী, কে তুমি মহারাজ,
গরবে হেলা করি হেসো না তুমি আজ।
বারেক চেয়ে দেখ আমার মুখপানে,
উঠেছে মাথা মোর মেঘের মাঝখানে।
আপনি আসি ঊষা শিয়রে বসি ধীরে
অরুণকর দিয়ে মুকুট দেন শিরে।
নিজের গলা হতে কিরণমালা খুলি
দিতেছে রবি-দেব আমার গলে তুলি।
ধূলির ধূলি আমি রয়েছি ধূলিপরে,
জেনেছি ভাই বলে জগত চরাচরে।