প্রধান মেনু খুলুন


গ্রহকণিকা

বড় গ্রহদের কথা বলিবার পূর্ব্বে মঙ্গল ও বৃহস্পতির প্রদক্ষিণ-পথের মধ্যে যে একটা প্রকাণ্ড শূন্য জায়গা আছে, তাহার কথা তোমাদিগকে একটু বলা দরকার। ছবি দেখিলে বুঝিবে এই জায়গাটা নিতান্ত অল্প নয়। মঙ্গলের বা পৃথিবীর মত একটা মাঝারি রকমের গ্রহ এই ফাঁকের মধ্যে থাকিয়া অনায়াসে সূর্য্যকে ঘুরিতে পারিত। সূর্য্যের অধিকারের মধ্যে তবে এমন একটা শূন্য জায়গা কেন থাকিয়া গেল?

 আমি তোমাদিগকে যে প্রশ্ন করিলাম, দুই শত তিন শত বৎসর আগে বড় বড় পণ্ডিতেরা পরস্পরকে এই প্রশ্নই জিজ্ঞাসা করিতেন। কেহ বলিতেন, ঐ ফাঁকে একটা কিছু কাছে, আমরা দূরে আছি বলিয়া তাহাকে দেখিতে পাই না। কেহ বলিতেন, বিধাতার উদ্দেশ্য বুঝা দায়,—কেন এমন একটা ফাঁকা জায়গা আছে তাহা স্থির করা আমাদের অসাধ্য। কিন্তু যাঁহারা গুণী লোক, তাঁহারা ভাবিতেন, ঐ জায়গায় একটা কাণ্ড-কারখানা কিছু আছেই আছে। তাই তাঁহারা অবকাশ পাইলেই দূরবীণ দিয়া সেখানকার খোঁজখবর লইতেন।

 গুণী লোকদের কথাই ঠিক হইয়াছিল। ইংরাজি ১৮০০ সালের ১লা জানুয়ারি পিয়াজি (Piazzi) নামে এক ইটালি দেশের জ্যোতিষী খুব বড় দূরবীণ দিয়া ঐ ফাঁকা জায়গাটা পর্য্যবেক্ষণ করিতেছিলেন। সেই সময়ে তাঁহার দূরবীণের মধ্যে একটি ছোট গ্রহের মত তারা ধরা পড়িয়াছিল। নক্ষত্রেরা আকাশে নিশ্চল থাকে কিন্তু গ্রহেরা সূর্য্যকে ঘুরিয়া আসিবার জন্য চলা-ফেরা করে। নূতন নক্ষত্রটি গ্রহদের মত নড়াচড়া করে কি না দেখিবার জন্য বড় বড় পণ্ডিতেরা পরীক্ষা আরম্ভ করিয়াছিলেন। ইহাতে তাহার স্থান-পরিবর্ত্তনও ধরা পড়িয়াছিল। কাজেই ছোট নক্ষত্রটিকে সকলেই গ্রহ বলিয়া স্বীকার করিয়াছিলেন এবং পরামর্শ করিয়া তাহাকে সিরিজ্ (Ceres) নামে ডাকিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন।

 এই ঘটনার দুই বৎসর পরে মঙ্গল ও বৃহস্পতির প্রদক্ষিণ-পথের মধ্যে আবার আর একটি ছোট গ্রহের আবিষ্কার হইয়াছিল। পরে পরে একই রকমের দুটি গ্রহের আবিষ্কার হইলে জ্যোতিষীরা ভাবিতে লাগিলেন, ঐ জায়গায় নিশ্চয়ই আরো অনেক গ্রহ আছে। যাঁহাদের বড় দূরবীণ ছিল, তাঁহারা সকলেই নূতন গ্রহের সন্ধান করিতে লাগিলেন। খুঁজিতে খুঁজিতে আবার দুটি গ্রহের আবিষ্কার হইল। এই রকমে সেই ফাঁকা জায়গাতে একে একে প্রায় ছয় শত ছোট গ্রহের সন্ধান পাওয়া গিয়াছে।

 এগুলিকে ছোট গ্রহ বলিতেছি বলিয়া তোমরা বোধ হয় ত ভাবিতেছ ইহা বুধের মত বা চাঁদের মত ছোট। কিন্তু তাহা নয়। ইহারা এত ছোট যে কতকগুলি আকারে মঙ্গলের চাঁদের মত। ইহাদের মধ্যে যে দুই একটিকে বড় বলা হয়, তাহাদের মধ্যে কোনোটিরই বেড় দুই শত বা তিন শত মাইলের বেশি নয়। গ্রহদের মত এক একটা নির্দ্দিষ্ট রাস্তায় এবং বাঁধা সময়ে সূর্য্যকে ঘুরিয়া আসে বলিয়াই ইহাদিগকে গ্রহ বলা হয়; তাহা না হইলে এগুলিকে উল্কাপিণ্ড বা অপর কিছু নাম দেওয়া যাইত। এই জন্যই আমরা এই ছোট গ্রহদিগের নাম “গ্রহকণিকা” রাখিয়াছি।

 দুইপাশের দুটা বড় গ্রহের মাঝে গ্রহকণিকারা কি প্রকারে আসিল, ইহা বোধ হয় তোমরা এখন জানিতে চাহিতেছ। এ সম্বন্ধে কিন্তু নানা পণ্ডিতে নানা কথা বলেন। আমরা এখানে একজন বড় জ্যোতিষীর কথাই তোমাদিগকে বলিব।

 এই জ্যোতিষীটি বলেন, গ্রহকণিকাগুলি এখন ছিন্নভিন্ন হইয়া থাকিলেও সেগুলি জমাট বাঁধিয়া এককালে মাঝারি রকমের একটি গ্রহের আকারে ছিল। তার পরে হঠাৎ এক দিন তাহার ভিতরকার গরমে বা বৃহস্পতির টানে গ্রহটির সুগোল দেহ হাজার হাজার খণ্ডে ভাঙিয়া গিয়াছিল। আমাদের পৃথিবীতে কোনো জিনিস ভাঙিয়া মাটিতে পড়িলে, সেটি যেখানে পড়ে পৃথিবীর আকর্ষণে সেইখানেই থাকিয়া যায়। কিন্তু মহাশূন্যে কোনো জিনিস ভাঙিয়া ধূলা হইয়া গেলেও তাহার নিস্তার থাকে না,—ধূলাগুলিও গ্রহের মত ঘুরিতে থাকে। কাজেই সেই অজানা গ্রহের টুকরাগুলিও কোনো স্থানে স্থির হইয়া দাঁড়াইতে পারে নাই, ভাঙাচুরা অবস্থায় সূর্য্যকে ঘুরিতে আরম্ভ করিয়াছিল। গ্রহকণিকাগুলিকে কোনো ভাঙা গ্রহের টুক্‌রা বলিয়া জ্যোতিষীরা মনে করিতেছেন।

 এ পর্য্যন্ত যে ছয় শত গ্রহকণিকার সন্ধান পাওয়া গিয়াছে, একত্র করিলে তাহাদের আকার আমাদের চাঁদের অর্দ্ধেকেরও সমান হয় না। এজন্য জ্যোতিষীরা বলিতেছেন, আকাশের ঐ জায়গায় এখনো হাজার হাজার গ্রহকণিকা আছে। এগুলির মধ্যে যাহারা বড়, একে একে হয় ত তাহাদিগকে দেখা যাইবে; কিন্তু যাহারা নিতান্ত ছোট কোনো কালেই তাহাদের সন্ধান পাওয়া যাইবে না।

 একটা বড় গ্রহ ভাঙিয়াই যে গ্রহকণিকার সৃষ্টি হইয়াছে, তাহার দুই একটা লক্ষণও অল্পদিন হইল ধরা পড়িয়াছে। খেলা করিবার সময়ে যখন তোমার মার্ব্বেল্‌টা চারি পাঁচ খণ্ডে ভাঙিয়া যায়,—তখন সেই ভাঙা অংশগুলির আকার কি রকম হয় দেখিয়াছ কি? টুক্‌রাগুলির আকার কি কখনো গোল হয়? কখনই হয় না। কোনোটাকে তিনকোণা দেখায়, কোনোটা হয় ত লম্বা দেখায়, কিন্তু একটাকেও ঠিক্ গোলাকার দেখায় না। গ্রহকণিকাগুলির মধ্যে দুই একটি ছাড়া আর কোনটিকে আাকারে ঠিক্ গোল দেখা যায় নাই। কেহ লম্বা, কেহ তিনকোণা, কেহ চারকোণা এই রকমই দেখা গিয়াছে। কাজেই এগুলি যে, কোনো একটি বড় জিনিসের ভাঙা অংশ তাহা উহাদের রকম রকম চেহারা দেখিলেই বুঝা যায় না কি?