প্রধান মেনু খুলুন

বুধ

সূর্য্যের চারিদিকে যে-সব গ্রহ ঘুরিতেছে, তাহাদের মধ্যে বুধই সূর্য্যের খুব কাছে আছে। এজন্য বুধের কথাই আগে বলিব। বুধ আবার সকল গ্রহের চেয়ে আকারেও ছোট। সে যেন সূর্য্যের ছোট ছেলে, তাই সূর্য্য তাহাকে কাছ-ছাড়া হইতে দেয় না। বুধকে ইংরাজিতে মার্‌কারি (Mercury) বলে।

 আমাদের দেশের প্রধান পণ্ডিতেরা বুধ গ্রহকে বেশ ভাল করিয়া জানিতেন এবং তাহার গতিবিধিও হিসাব করিয়া বাহির করিয়াছিলেন। পুরাণে লেখা আছে, বুধ গ্রহটি আমাদের চাঁদেরি একটি পুত্র।

 যাহা হউক, বুধ সূর্য্যের খুব কাছে থাকে বলিয়া তাহাকে দেখা বড় কঠিন। সূর্য্যের আলোর সীমার মধ্যে তাহার বসতি, এজন্য ইচ্ছা করিলে যখন-তখন তোমরা বুধকে দেখিতে পাইবে না;—জ্যোতিষীরাও যখন ইচ্ছা উহাকে দেখিতে পান না। গ্রহেরা যে পথে সূর্য্যকে ঘুরিয়া আসে, তাহা ঠিক্ গোল নয়, গোল অথচ একটু লম্বা অর্থাৎ কতকটা পাথীর ডিমের আকৃতির মত। এই রকম ডিমের মত পথে ঘুরিতে ঘুরিতে বুধ কখনো কখনো সূর্য্যের আলো হইতে একটু দূরে আসিয়া পড়ে। এই সময়েই পূর্ব্ব বা পশ্চিম আকাশের গায়ে ভোর রাত্রে এবং সন্ধ্যায় বুধকে দেখা যায়।

 বুধকে খুব ছোট গ্রহ বলিলাম, কিন্তু তাই বলিয়া ভাবিও না, ইহা আমাদের চাঁদের চেয়ে ছোট। চাঁদের উপরে সুড়ঙ্গ কাটিয়া তাহার ঠিক্ মাঝখানে যাইতে হইলে সুড়ঙ্গটিকে প্রায় এক হাজার মাইল গভীর করিতে হয়। তোমরা যদি বুধের উপরে যাও এবং তাহার দেহের ঠিক মাঝে যাইবার জন্য কূয়ো খুঁড়িতে আরম্ভ কর, তাহা হইলে কূয়োটিকে দেড় হাজার মাইল গভীর করিতে হয়! ভাবিয়া দেখ, ইহা চাঁদের চেয়ে কত বড়।

 আর একটা হিসাবের কথা বলি। পৃথিবী কত বড় তাহা তোমরা জান। এখন যদি কেহ বুধকে ভাঙিয়া একটা পৃথিবী গড়িবার চেষ্টা করে, তাহা হইলে একুশটা বুধকে না ভাঙিলে একটা পৃথিবী গড়া যাইবে না। সূর্য্য কি প্রকাণ্ড জিনিস, তাহা তোমরা শুনিয়াছ। তোমরা যদি সূর্য্যের সহিত বুধের তুলনা করিতে যাও, তাহা হইলে একটা হাতীর সঙ্গে একটা মশার তুলনা করা হয়। এক হাত ফাঁক-ওয়ালা একটা মাঝারি জালাকে যদি সূর্য্য বলিয়া মনে করা যায়, তাহা হইলে বুধ হইয়া দাঁড়ায় একটি সরিসার আধখানার সমান। সূর্য্যের সন্তানগুলির মধ্যে বুধ কত ছোট একবার ভাবিয়া দেখ।

 এত ছোট বলিয়াই বোধ হয় সূর্য্য বুধকে এত কাছে কাছে রাখিয়াছে। সূর্য্যের হয় ত ভয় হয়, বুঝি তাহার ছোট ছেলেটি হারাইয়া যায়। সত্যই, বুধ যদি বৃহস্পতি শনি প্রভৃতি তাহার বড় বড় ভাইদের কাছে বেড়াইতে যাইত, তবে তাহার রক্ষা ছিল না। পৃথিবী যেমন চাঁদকে কাছে রাখিয়া নিজের চারিদিকে ঘুরাইয়া লইয়া বেড়াইতেছে, উহারাও হয় ত ছোট ভাই বুধকে ঐ রকমে চিরকালের জন্য ঘুরাইয়া মারিত।

 বুধ সূর্য্যের কাছে আছে; তাই বলিয়া মনে করিও না, সে দশ ক্রোশ বা একশত ক্রোশ তফাতে আছে। বুধ সূর্য্য হইতে তিন কোটি ষাট্ লক্ষ মাইল দূরে রহিয়াছে। গ্রহ-নক্ষত্রদের দূরত্বের হিসাবে এই দূরত্ব অতি অল্প, সেই জন্যই বুধকে সূর্য্যের কাছে বলিলাম। কিন্তু আমাদের হিসাবে ঐ দূরত্ব অতি প্রকাণ্ড। যদি তুমি বুধে গিয়া একখানা রেলের গাড়ীতে চাপিয়া সূর্য্য দেখিতে বাহির হও, এবং গাড়ীখানা যদি ঘণ্টায় পঞ্চাশ মাইল করিয়া দৌড়ায়, তাহা হইলে প্রায় তিরাশী বৎসর পরে তুমি সূর্য্যে গিয়া উপস্থিত হইবে। অর্থাৎ যদি বারো বৎসর বয়সে গাড়ীতে চাপিতে পার, তবে পঁচানব্বুই বৎসর বয়সে তুমি সূর্য্যে পৌঁছিবে। তোমার এখনকার কালো চুলগুলি তখন পাকিয়া শাদা হইয়া যাইবে এবং এমন সুন্দর দাঁতগুলিও পড়িয়া যাইবে।

 পৃথিবীর যেমন একটি উপগ্রহ অর্থাৎ চাঁদ আছে, বুধের সেরকম একটিও চাঁদ নাই। বুধ নিজেই চাঁদের মত ছোট জিনিস,—ইহার আবার চাঁদ থাকিবে কেমন করিয়া?

 পৃথিবী বুধের চেয়ে কত বড় তাহা তোমাদিগকে আগে বলিয়াছি। জ্যোতিষীরা কি রকমে দূরের গ্রহদিগের দূরত্ব আয়তন ও ওজন ঠিক্ করেন, তোমরা বোধ হয় তাহা জান না। এখন সে-সব হিসাবপত্রের কথা তোমাদিগকে বলিলে, তোমরা তাহার একটুও বুঝিবে না। জ্যোতিষীরা কি রকমে বুধের ওজন ঠিক্ করিয়াছিলেন, এখানে কেবল তাহারি একটু বলিব।

 তোমরা ধূমকেতু দেখিয়াছ কি? প্রকাণ্ড লেজ-ওয়ালা ধূমকেতু কখনো পূর্ব্ব কখনো পশ্চিম আকাশে দেখা দেয়। ইংরাজি ১৯১০ সালের বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে এই রকম একটা প্রকাণ্ড ধূমকেতু দেখা গিয়াছিল। তোমাদের মনে আছে কি? ধূমকেতু-সম্বন্ধে সকল কথা পরে বলিব। এখন এইটুকু জানিয়া রাখ যে, ইহাদের মধ্যে কতকগুলি পৃথিবী, বুধ প্রভৃতি গ্রহদের মত এক একটা নির্দ্দিষ্ট সময়ে সূর্য্যকে ঘুরিয়া আসে। এই রকমই একটা ধুমকেতু আছে,—তাহার নাম এন্‌কি। এন্‌কি (Encke) নামে একজন জ্যোতিষী ইহাকে খুঁজিয়া বাহির করিয়াছিলেন বলিয়া ইহার ঐ নাম দেওয়া হইয়াছে। এই ধূমকেতুটি সূর্য্যের খুব কাছে থাকিয়া তিন বৎসর তিন মাসে সূর্য্যকে ঘুরিয়া আসে। রেলের গাড়ী ষ্টেশনে পৌঁছিতে দেরি করে, তুমিও কখনো কখনো ইস্কুলে যাইতে দেরি কর। কিন্তু আকাশের গ্রহনক্ষত্রেরা দেরি কাহাকে বলে জানে না। যাহার যেমন সময় ঠিক্ করা আছে, তাহারা সেই সময় অনুসারে চলিবেই চলিবে। ঘড়ি শ্লো ফাষ্ট্ যায়, কিন্তু উহাদের শ্লো ফাষ্ট্ নাই।

 কিন্তু বহুদিন আগে হঠাৎ একটা ভাবনার কথা হইয়াছিল। যেদিন এন্‌কির ধূমকেতুকে দেখিবার কথা ছিল, সে দিন এন্‌কি দেখা দিল না। পণ্ডিতদের মহা ভাবনা হইল। সব মিথ্যা হইতে পারে, কিন্তু হিসাব ত মিথ্যা হইবার নয়! হিসাবে ভুল আছে ভাবিয়া তাঁহারা অঙ্ক কষিতে লাগিলেন। দশ হইতে দুই বাদ দিলে আট বাকি থাকে, তোমরা অঙ্ক কষিয়া ইহা ঠিক করিতে পার। এখন যদি একদিন হঠাৎ দেখা যায় যে, দশ পয়সা হইতে দুই পয়সা খরচ করিলে ছয় পয়সা বাকি থাকে, তাহা হইলে তোমরা অবাক্ হইয়া যাও না কি? তোমরা তখন নিশ্চয়ই ভাবিতে থাক যে, হিসাবে ভুল হইয়াছে। জ্যোতিষীরা এন্‌কিকে আসিতে না দেখিয়া, এই রকম অবাক্ হইয়াই ভাবিয়াছিলেন, হয় ত হিসাবে ভুল আছে। কিন্তু ভুল ধরা পড়িল না।

 পণ্ডিতমহলে মহা তর্ক-বিতর্ক চলিতে লাগিল। কেহ বলিতে লাগিলেন, এন্‌কিকে সূর্য্য টানিয়া পুড়াইয়া ফেলিয়াছে; কেহ বলিলেন, ঘুরিবার পথে যখন সে শনির সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিল, তখন শনিই তাহাকে আট্‌কাইয়া রাখিয়াছে।

 জ্যোতিষীরা মহা মুস্কিলে পড়িলেন; আকাশে এন্‌কির খোঁজ করিতে তাঁহাদের রাত্রির পর রাত্রি অনিদ্রায় কাটিয়া যাইতে লাগিল। হঠাৎ এক রাত্রিতে এন্‌কি দেখা দিল। তাঁহাদের ভাবনা দূর হইল বটে, কিন্তু এন্‌কি পথের মাঝে কেন এত দেরি করিল, তাহা ঠিক্ করিবার জন্য তাঁহাদিগকে হিসাবে বসিতে হইল। রেলের গাড়ী যখন ষ্টেশনে পৌঁছিতে দেরি করে, তখন ষ্টেশন-মাষ্টার বুঝিয়া লন, পথে তাহার কল বিগ্‌ড়াইয়া গিয়াছে, না হয় তাহাকে কোনো মাঝ-ষ্টেশনে আটক্ থাকিতে হইয়াছে। কিন্তু এন্‌কির কল ত বিগ্‌ড়াইবার নয়,—স্থির হইল, পথে তাহাকে কেহ আট্‌কাইয়া রাখিয়াছিল।

 যে পথে এন্‌কি সূর্য্যকে ঘুরিয়া বেড়ায়, তাহার কাছে কোনো গ্রহ বা উপগ্রহ ছিল কি না, পণ্ডিতেরা ম্যাপ খুলিয়া তাহা দেখিতে লাগিলেন। দেখা গেল, ঐ সময়ে বুধগ্রহ এন্‌কির পাশে ছিল। পণ্ডিতেরা হাঁফ্ ছাড়িয়া বাঁচিলেন,—সকলেই বুঝিলেন, ছোট ধূমকেতু এন্‌কিকে পথের মাঝে পাইয়া বুধগ্রহ তাহাকে টানাটানি করিয়া একটু মজা করিয়াছিল, তাই ধূমকেতুর ফিরিয়া আসিতে এত বিলম্ব!

 যাহা হউক এই টানাটানিতে এন্‌কির একটু কষ্ট হইলেও জ্যোতিষীদের খুব সুবিধা হইয়া গিয়াছিল। সে কত দিন দেরি করিয়াছিল তাহা জ্যোতিষীরা জানিতেন। কত জোরে টানিলে এই রকম দেরি হইতে পারে, তাঁহারা অঙ্ক কষিয়া তাহাও স্থির করিয়াছিলেন। তার পরে বুধের শরীরে কি পরিমাণ পদার্থ আছে, ইহা হইতেই স্থির হইয়াছিল। আমরা দেখিয়াছি, মোটা মানুষের গায়ের জোর ছিপ্‌ছিপে লোকের জোরের চেয়ে সব সময়ে বেশি হয় না। কুস্তিগীর পালোয়ানেরা মোটা নয়। খুব মোটা লোকেরা এই সব পালোয়ানদের সহিত লড়িতে গিয়া প্রায়ই হারিয়া যায়। কিন্তু গ্রহনক্ষত্রদের নিয়ম অন্য রকম; ইহাদের মধ্যে যে বেশি মোটা তাহার জোরও তেমনি বেশি। কাজেই কোনো গ্রহের টানের পরিমাণ জানিতে পারিলে, সে ওজনে কত তাহা ঠিক্ করা কঠিন হয় না।

 এই রকমেই জ্যোতিষীরা ঠিক্ করিয়াছেন—একুশটা বুধগ্রহ একটা পৃথিবীর সমান।

 এন্‌কির কথা বলিতে গিয়া অনেক সময় কাটিয়া গেল; এখন বুধগ্রহের অন্যান্য খবর তোমাদিগকে দিব।

 গ্রহমাত্রই সূর্য্যের চারিদিকে ঘুরিয়া বেড়ায়। আমাদের পৃথিবী একটি গ্রহ,—সূর্য্যকে একবার পাক দিয়া আসিতে ইহার তিনশত পঁইষট্টি দিন অর্থাৎ এক বৎসর সময় লাগে। একথা তোমাদিগকে আগেই বলিয়ছি। বুধও একটা গ্রহ, সে কত দিনে সূর্য্যকে প্রদক্ষিণ করে জান কি? জ্যোতিষীরা ঠিক্ করিয়াছেন, অষ্ট-আশী দিনে সে একবার সূর্য্যকে ঘুরিয়া আসে, তাহা হইলে বুঝা যাইতেছে, বুধে যদি প্রাণী থাকে, তবে তাহাদের এক বৎসর হয় অষ্ট-আশী দিনে। অর্থাৎ আমাদের এক বৎসর বুধের প্রায় চারি বৎসরের সমান। বুধের রাজ্যটা বড় মজার নয় কি? এখন যদি তোমার বয়স বারো বৎসর হয়, বুধের লোকেরা তোমার বয়স হিসাব করিয়া বলিবে আটচল্লিশ বৎসর!

 অষ্ট-আশী দিনে একবার সূর্য্যকে পাক্ দিয়া আসা বড় সোজা ব্যাপার নয়। বুধ পৃথিবীর চেয়ে সূর্য্যের কাছে আছে, এজন্য যে গোলাকার পথে সে সূর্য্যকে ঘুরিয়া আসে, তাহা পৃথিবীর পথের চেয়ে ছোট। কিন্তু তবুও অষ্ট-আশী দিনে সূর্য্যকে ঘুরিয়া আসিতে বুধকে খুব জোরে জোরে চলিতে হয়। এক বৎসরে সূর্য্যকে ঘুরিয়া আাসিতে পৃথিবী কত জোরে চলে, তোমরা বোধ হয় জান না। প্রতি সেকেণ্ডে উহাকে ঊনিশ মাইল করিয়া চলিতে হয়। ইহা কি ভয়ানক বেগ, মনে ভাবিয়া দেখ। তুমি প্রাণপণে দৌড়িয়া এক সেকেণ্ডে হয় ত দু’হাত কি তিন হাতের বেশি চলিতে পার না। কিন্তু পৃথিবী সেই একটুখানি সময়ে সূর্য্যকে ঘুরিবার জন্য দৌড়ায় ঊনিশ মাইল! বন্দুকের মুখ হইতে যে গুলি বাহির হয়, তাহা এত জোরে চলে যে, গুলি চোখে দেখা যায় না। পৃথিবী চলে বন্দুক বা কামানের গুলির চেয়েও জোরে। বুধের জোর আবার পৃথিবীর চেয়েও বেশি;—সে প্রতি সেকেণ্ডে প্রায় ত্রিশ মাইল রাস্তা চলে এবং এই রকমে চলিয়াই অষ্ট-আশী দিনে সূর্য্যকে ঘুরিয়া আসে। সূর্য্যের চারিদিকে যত ছোট বড় গ্রহ উপগ্রহ ঘুরিতেছে, তাহাদের মধ্যে কোনোটি এত বেগে চলে না। এই জন্যই গ্রীকেরা বুধের নাম দিয়াছিলেন (Mercury) অর্থাৎ “সূর্য্যের দূত।”

 অমাবস্যার পরে চাঁদ কেন এক-একটু বড় হইয়া শেষে পূর্ণিমায় সম্পূর্ণ গোল হইয়া পড়ে, তাহা তোমাদিগকে আগে বুঝাইয়াছি। বুধ ও শুক্রের সূর্য্য-প্রদক্ষিণ-পথ পৃথিবীর পথের ভিতরে আছে, এই জন্য বুধ ও শুক্র দুয়েরই চাঁদের মত ক্ষয় বৃদ্ধি দেখা যায়।

 বোধ হয় কথাটা বুঝিতে পারিলে না। এখানে একটা ছবি দিলাম, ছবি দেখিলেই বুঝিবে। ছবির মাঝে সূর্য্য স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া শুক্র ও বুধের কলার হ্রাসবৃদ্ধি আছে এবং তাহারি চারি পাশে বুধ ঘুরিতেছে। পৃথিবী আছে, ইহাদের ভ্রমণপথের বাহিরে। সূর্য্যের আলো উহার গায়ে লাগায় কি রকমে বুধের কলার হ্রাসবৃদ্ধি হইতেছে, তোমরা এখন ছবি দেখিলেই বুঝিবে।

 পৃথিবীর দিনরাত্রির পরিমাণ প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা, ইহা তোমরা জান। সে চব্বিশ ঘণ্টায় নিজের মেরুদণ্ডের চারিদিকে এক বার ঘুরপাক খায় বলিয়াই দিনরাত্রির পরিমাণ এই রকম হইয়াছে। প্রাচীন জ্যোতিষীদের জানা ছিল, বুধগ্রহও চব্বিশ ঘণ্টায় একবার ঘুরপাক যায়। কাজেই তাঁহারা বলিতেন, পৃথিবীতে যেমন চব্বিশ ঘণ্টায় দিন রাত্রি হয়, বুধেও তাহাই হয়। এখনকার জ্যোতিষীরা একথা স্বীকার করেন না। তাঁহারা খুব বড় দূরবীণ দিয়া বুধকে দেখিয়া বলিতেছেন, চাঁদ যেমন তাহার একটা পিঠই চিরকাল পৃথিবীর দিকে ফিরাইয়া রাখে, সেই রকমে বুধও তাহার দেহের একটা দিক্ সূর্য্যের দিকে ফিরাইয়া ঘুরিতেছে।

 তাহা হইলে বুঝা যাইতেছে, বুধের একটা পিঠেই চিরকাল রৌদ্র পায় এবং বাকি অংশটা চিরকালের জন্য অন্ধকারে ডুবিয়া থাকে। কাজেই বলিতে হইতেছে, বুধে পৃথিবীর মত দিনরাত্রির পরিবর্ত্তন হয় না। উহার একটা দিকে চিরকালের জন্য রাত্রি এবং আর একটা দিকে চিরকালের জন্য দিন হইয়া আছে। বুধগ্রহে সকাল সন্ধ্যা নাই, সূর্য্যের উদয় অস্ত নাই, গ্রীষ্ম বর্ষা প্রভৃতি ঋতুর পরিবর্ত্তনও নাই। কি ভয়ানক স্থান!

 বুধ পৃথিবীর চেয়ে সূর্য্যের অনেক কাছে আছে, এজন্য সূর্য্যের তাপ ও আলো তাহাতে অত্যন্ত বেশি পড়ে। আমরা রাঁধা-বাড়া করিবার জন্য কাঠ কয়লা কত কি জ্বালিয়া আগুন করি। কিন্তু বুধে সূর্য্যের তাপই এত বেশি যে, তাহাতেই জল টগ্‌বগ্ করিয়া ফুটিতে পারে,—আগুন জ্বালার দরকারই হয় না। সেখানে সূর্য্যকে আকারেও খুব বড় দেখায়,—বুধগ্রহের সূর্য্য আমাদের সূর্য্যের প্রায় নয় গুণ বড়।

 যেখানে এত গরম এবং যেখানে দিন-রাত্রি, তিথি-মাস, ঋতু-সম্বৎসর কিছুই নাই, সেখানে যে জল নাই, বাতাস নাই, বৃষ্টি নাই এবং মানুষের বা পশুপক্ষীদের মত প্রাণীও নাই, একথা তোমাদিগকে বলাই বাহুল্য। বুধ চাঁদেরই মত জনপ্রাণিহীন শুষ্ক গ্রহ।

 জ্যোতিষীরা বুধের ফোটোগ্রাফ্-ছবি তুলিয়াছেন। ছবির স্থানে স্থানে ফাটা ফাটা দাগ দেখা যায়। জ্যোতিষীদের মতে ইহা বুধের উপরকার বড় বড় ফাটাল। হাজার হাজার বৎসর ক্রমাগত সূর্য্যের তাপ পাইয়া বুধের মাটি-পাথর সম্ভবতঃ ঐ রকমেই ফাটিয়া গিয়াছে। দূরবীণ দিয়া এই ফাটালগুলিকে চাঁদের সমুদ্রের মত স্পষ্ট দেখা যায়। এই জন্যই জ্যোতিষীরা বলেন, বুধে বাতাস বা অন্য কোনো বাষ্প নাই এবং মেঘও নাই,—থাকিলে উহার উপরকার ফাটালের দাগগুলিকে কখনই ঐ রকম সুস্পষ্ট দেখা যাইত না।

 বুধ সূর্য্যের এত কাছে আছে, কিন্তু তথাপি তাহাকে খুব উজ্জ্বল দেখায় না। উহার উজ্জ্বলতা আমাদের চাঁদেরই মত। বুধ কেন এত অনুজ্জ্বল তাহা বোধ হয় তোমরা বুঝিতে পারিয়াছ। কালো মাটি বা পাথরকে রৌদ্রে ফেলিয়া রাখিলে, তাহাকে কি কখনো উজ্জ্বল দেখায়? কিন্তু শাদা কাগজে বা কাচে রৌদ্র পড়িলে, তাহা চক্ চক্ করে। বুধের উপরটা সম্ভবতঃ কালো মাটি বা কালো পাথরের মত কোনো জিনিস দিয়া গড়া, তাই সে বেশি সূর্য্যের আলো পাইয়াও বিশেষ উজ্জ্বল হয় না।