চিঠিপত্র (দশম খণ্ড, ১৯৬৭)/দীনেশচন্দ্র সেনকে লিখিত/৬

[মে ১৯০২]

ওঁ

প্রিয়বরেষু

 আপনার চিঠি পাইয়া আনন্দিত হইলাম এখন সাক্ষাৎকারের আনন্দ প্রত্যাশা করিয়া আছি। আমার পিতৃদেবের জন্মোৎসব উপলক্ষ্যে আমাকে ১লা জ্যৈষ্ঠ নাগাদ একবার কলিকাতায় যাইতে হইবে। ফিরিবার সময় আপনাকে সবলে আকর্ষণ করিয়া আনিলে কিরূপ হয়? আপনার ছেলেটিকে সস্নেহে গ্রহণ ও সযত্নে শিক্ষাদান করিব সে সম্বন্ধে আপনি চিন্তা করিবেন না— পনেরো দিনের মধ্যেই সে এখানে এমনি জমিয়া যাইবে যে বাড়ি যাইবার নাম করিবে না। এখান হইতে যে সকল ছাত্র ঘরে ফেরে তাহারা অশ্রুজল না ফেলিয়া যায় না। পত্রে আপনি যে কথার আভাসমাত্র দিয়া চুপ করিয়াছেন সে কথাটা আমার গোচর হইয়াছে। লেখাটি আমি পড়ি নাই— আমার দৃষ্টিপথে আনিতে নিষেধও করিয়াছি, কারণ, লেখকজাতির অভিমান অল্পেই আঘাত পায়— অথচ এরূপ আঘাতের মধ্যে লজ্জার কারণ আছে। নিজেকে সেই গ্লানিজনক অবস্থা হইতে রক্ষা করিবার জন্য আমি কথিত বা লিখিত গালিমন্দের কথা হইতে দূরে থাকিতে চেষ্টা করি। বিদ্বেষে কোনো সুখ নাই কোন শ্লাঘা নাই, এইজন্য বিদ্বেষ্টার প্রতিও যাহাতে বিদ্বেষ না আসে আমি তাহার জন্য বিশেষ যত্ন করিয়া থাকি। জীবনপ্রদীপের তেল ত খুব বেশি নয় সবই যদি রোষে দ্বেষে হূহুঃ শব্দে জ্বালাইয়া ফেলি তবে ভালবাসার কাজে এবং ভগবানের আরতির বেলায় কি করিব? বিশেষতঃ আমার ছুটি লইবার সময় হইয়া আসিয়াছে— এখন বাজে কলহে কাজের ক্ষতি করিলে বিপক্ষের কিছুই হয় না নিজেরই বিপক্ষতা করা হয়।

 অধ্যাপনা এবং “চোখের বালি”র উপসংহারেই আমার দিন কাটিয়া যাইতেছে। ইতিমধ্যে আপনার বইখানি আর একবার পড়িয়া ফেলিয়াছি এবং পুনর্ব্বার নূতন আনন্দ লাভ করিয়াছি। জ্যৈষ্ঠ মাসের বঙ্গদর্শনে যদি সমালোচনা না যায় তবে আপনি আমাকে হয়ো দিবেন।

 আপনি সর্ব্বপ্রকার উদ্বেগ হইতে উদ্ধার পান এই আমার প্রার্থনা। ইতি ২০শে বৈশাখ ১৩০৯

আপনার
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর