উপসংহার।

কি শিখিলাম!

 ছয়টি দর্শন যাহা বলেন তাহার স্থূল সম্মত আলোচনা করা গেল। কিন্তু হঠাৎ প্রথমটা যেন একটু ধাঁধাঁ লাগে। প্রত্যেকের সঙ্গেই প্রত্যেকের মতভেদ। যখন এত বড় বড় ঋষিদের মধ্যে এই প্রকার ভেদ তখন ক্ষুদ্র বুদ্ধি আমাদের কি উপায় হইবে; আমরা কাহার পথ অনুসরণ করিলে মুক্তি পাইব; এই প্রকার চিন্তা আমাদিগের চিত্তকে আন্দোলিত করিতে থাকে। কিন্তু বিশেষ ভাবে চিন্তা করিতে করিতে পরে এ সমস্ত বিষয় ক্রমে ক্রমে আমাদের বোধ গম্য হয়।

 প্রথমেই আমাদের ইহা ধরিয়া লইতে হইবে যে মানুষ যত বড়ই হউন না কেন তাহার বুদ্ধি ও ভাষা কখনও অতীন্দ্রিয় বিষয়কে সুস্পষ্টরূপে ব্যক্ত করিতে পারিবে না; এমন কি যিনি সকল তত্ত্বের মূল পর্য্যন্ত পৌঁছিতে পারিয়াছেন, তিনিও তদ্বিষয়ে বিশেষ কিছু প্রকাশ করিতে পারেন না। অতএব ধার্য্য হইল যে আমাদের বিচার যতই কেন সূক্ষ্ম হউক না, সমস্তই পরিবর্ত্তনশীল মন দ্বারা সম্পাদিত হয়, এবং তজ্জন্যই অতি সূক্ষ্মতত্ত্ব বিষয়ে এত প্রকার মতভেদ দেখিতে পাওয়া যায়।

 তবে এই পরিবর্ত্তনশীল জগতের মধ্যেও অনেক বিষয়ে ঐক্য দেখা যায়; সেই গুলিকে অখণ্ডনীয় প্রাকৃতিক বিধান বলা হয়। এতদ্বিষয়ে আলোচনা করা অনেক পরিমাণে সহজ, কারণ এ সমস্ত ব্যাপার লইয়া পরীক্ষা চলে; এবং যে মত যত অধিক প্রামাণ্য তাহা তত অধিক রূপে গ্রাহ্য করা হইয়া থাকে। কিন্তু যেখানে পরীক্ষা চলে না তদ্বিষয় সম্বন্ধে মতামত যে কোন্‌টি ভাল তাহা বিচার করা যেরূপ অসম্ভব, আবার সেই বিষয় সম্বন্ধে মতামতের সংখ্যাও সেইরূপ বহু হইয়া উঠে।

 এই নিমিত্তই আমরা দেখিতে পাইতেছি যে সমস্ত দর্শনকারগণ একটা বিশেষ স্থানে যাইয়াই যত গোলে পড়িয়াছেন। সাংখ্যকার প্রকৃতি ও পুরুষ তত্ত্ব আবিষ্কার করিলেন এবং তাহদের সংযোগে জগৎ সৃষ্টি ইহা সাব্যস্থ করিলেন; কিন্তু মধ্য হইতে একটা অদৃষ্ট নামক তত্ত্ব আনিয়া বলিলেন যে ইহাই প্রকৃতি ও পুরুষের সংযোগ ঘটায়। পতঞ্জলি কপিলের সমস্ত কথা স্বীকার করিলেন, কিন্তু অদৃষ্ট যে সৃষ্টির মূল কারণ তাহা স্বীকার না করিয়া জড় অদৃষ্টের পরিচালক ঈশ্বর তত্ত্ব কল্পনা করিলেন। গোতম অতি সতর্কতার সহিত এক অভিনব পন্থায় বিচার করিয়া সকল তত্ত্বের মূল ঈশ্বর তত্ত্ব স্বীকার করিলেন। কিন্তু ইঁহার ঈশ্বর ও পতঞ্জলির ঈশ্বরে এক মহা প্রভেদ আছে; পতঞ্জলির ঈশ্বর অদৃষ্টের পরিচালক পুরুষবিশেষ মাত্র, কিন্তু গোতমের ঈশ্বর পরিদৃশ্যমান জগতের কর্ত্তা। গোতমের সহিত কণাদের বিশেষ অনৈক্য নাই, তবে সৃষ্টির উপাদান কারণ সম্বন্ধে ইনি আর একটু সূক্ষ্ম বিচার করিয়াছেন। জৈমিনি অতীন্দ্রিয় বিষয়টা বিচারের মধ্যে আনিতে একেবারে অনিচ্ছুক; সেই জন্য তিনি একটা সোজা কর্ম্মরূপ ধারা দেখাইয়াছেন, যেটা তাঁহার মতে অনাদি, অনন্ত, শত সহস্র পরিবর্ত্তনের মধ্যেও সদা একভাবে প্রবাহিত। ইনি জীব জগতের আদি ও পরিণাম কিছুই কল্পনা করিতে প্রস্তুত নহেন। বেদব্যাস জীব জগতের আদি, মধ্য ও অন্ত সমস্তের মধ্যেই এক অদ্বৈত ব্রহ্মতত্ত্ব দেদীপ্যমান রহিয়াছে দেখিলেন। কিন্তু যাঁহারা বেদান্তবাদ স্বীকার করিলেন তাঁহাদের মধ্যে বেদব্যাসের অর্থ লইয়া নানারূপ মতভেদ হইল। অপর কোনও দর্শন সম্বন্ধে এত মতভেদ নাই। বেদান্ত সম্বন্ধীয় সমস্ত মতের মধ্যে রামানুজ ও শঙ্করের মতই সর্ব্ব প্রধান। উভয়েই অদ্বৈত ব্রহ্ম স্বীকার করিলেন, কিন্তু সৃষ্টি তত্ত্ব লইয়া তাঁহাদের মতভেদ হইল। রামানুজ বলিলেন সৃষ্টি ব্রহ্মেচ্ছা, আর শঙ্কর বলিলেন সৃষ্টিটা একটা মায়া—ভেল্কি।

 এখন বুঝিলাম যে অতীন্দ্রিয় বিষয়ক বোধটা আমাদের চিরপরিবর্ত্তনশীল প্রাকৃতিক মন বুদ্ধি সংযুক্ত দেহের ক্ষমতাতীত। আর এই মায়িক অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত যে এক সনাতন সত্ত্বা আছে পারমার্থিক তত্ত্ব কেবল তাহারই বিষয় এবং তাহাই। এই টুকু মাত্র আমাদের বিচার লব্ধ ফল, এই স্থানেই ছয়টি দর্শনের আলোকরশ্মি একত্র কেন্দ্রীভূত।

 এই স্থানে আসিলে আমাদের মধ্যে আবার একটা বিষম মতদ্বৈধ উপস্থিত হয়। এই মত ভেদের জন্য আমরা পৃথিবীতে দুই শ্রেণীর লোক দেখি। এক প্রকার লোক প্রত্যক্ষবাদ অবলম্বন পূর্ব্বক নানাবিধ জাগতিক কর্ত্তব্য স্থির করিয়া তদাচরণে তৎপর; তাঁহারা মনুষ্যের ঐহিক উন্নতির জন্য কত কত বিষয় উদ্ভাবন করিতেছেন এবং নানারূপ কর্ম্মক্ষেত্র প্রতিষ্ঠিত করিতেছেন। অপর একপ্রকার লোক জীব জগতকে মায়িক বলিয়া তৎসম্বন্ধীয় সমস্তরূপ কর্ম্ম হইতে বিরত হইয়া সনাতন সৎস্বরূপে উপস্থিত হইতে চেষ্টা করিতেছেন। আবার এই দুই ভাবের সংমিশ্রণে নানাবিধ ভাবের উৎপত্তি হইয়াছে। সাংসারিক লোকে প্রত্যক্ষ জগতের মমস্ত কর্ম্মই করে এবং অপরোক্ষ আত্মার পরকালের উপায়ও চিন্তা করে, অপর পক্ষে বিরক্ত নির্ব্বাণপ্রয়াসী ও দেহযাত্রার জন্য নানারূপ জাগতিক ক্রিয়ার অনুষ্ঠান করেন। এই প্রকার মিশ্রভাব যে কতরূপ হয় তাহার সীমা নাই;যতগুলি লোক ততরূপ প্রকারের ভাব হওয়াও অসম্ভব নহে।

 একটা বিষয়ে আর মতভেদ নাই—সেটা মৃত্যু। আমাদের দেহ ছিলও না, আর থাকিবেও না। দেহের কখন যে কি হইবে তাহাও আমরা জানি না; অতএব ইহাও সাব্যস্থ হইল যে প্রত্যক্ষ বিষয় সম্বন্ধেও মনুষ্যের জ্ঞান নিতান্ত সীমাবদ্ধ। এরূপ অবস্থায় প্রত্যক্ষ বা অপরোক্ষ কোনটাকেই নিন্দা করা সুযুক্তি নহে।

 অতএব আমাদের এরূপ ভাবে চলিতে হইবে, যাহাতে দুই কুল রক্ষা হয়। অবশ্য এ বিষয়ে নানা তর্ক উঠিতে পারে। কিন্তু কাহাকে ছাড়িব? যদি বুঝি একেবারে নির্ব্বাণ হইল আর দেহযাত্রার আবশ্যক নাই, তাহা হইলে আর কর্ম্মের আবশ্যকতা রহিল না। কিন্তু তাহাত একেবারে হয় না। অতএব যাবৎ নির্ব্বাণ আমাদিগকে কর্ম্ম করিতে হইবে এবং যোগও করিতে হইবে। তবে এই দুইটার জন্য যদি দুইটা পৃথক সময় স্থির করি তবে একটু অসুবিধা হইয়া উঠে, কারণ যোগবিহীন কর্ম্মের সংস্কারটা যোগাভ্যাসের সময় বড়ই উৎপাত করে এবং সমাধিটাকে এক প্রকার অসম্ভব করিয়া তুলে। অতএব আমাদিগকে যোগস্থ হইয়া কর্ম্ম করিতে হইবে। যেমন আমরা সর্ব্বাবস্থাতেই “আমি অমুক মানুষ” এই বোধের মধ্যে থাকি, সেইরূপ যেন “অহং ব্রহ্মাস্মি” ভালটাও সর্ব্বাবস্থাতে আনাদের মধ্যে দেদীপ্যমান থাকে। “আমি অমুক মানুষ” এই বোধটা যেরূপ স্বাভাবিক, “অহং ব্রহ্মাস্মি” ভাবটাকেও সেই প্রকার স্বাভাবিক করিয়া তুলিতে হইবে। অভ্যাসই ইহার সাধন।

 কি কর্ম্ম করা উচিত তৎসম্বন্ধে একটা সাধারণ ভাবে বিচার করা যাইতে পারে। অবশ্য সমস্ত কাম্য কর্ম্ম আমাদিগকে প্রথম হইতেই বিসর্জন করিতে হইবে, কারণ যে যে কর্ম্মেতে এই ক্ষণ বিধ্বংসী দেহের ও তৎসম্বন্ধীয় বিষয়ের সুখ সাধন হয় তাহা আমাদের তত্ত্বজ্ঞানের বিরোধী। বরং দ্বন্দ্বসহিষ্ণুতা অভ্যাস দ্বারা আমাদের দেহাভিমানটা দূর করিতে চেষ্টা করাই উচিত। সাধারণ হিতকর অথচ দেহের অহিতকর কর্ম্ম হইতে বিরত হওয়া এবং অনর্থক বাহাদুরী দেখাইবার জন্য দেহের পীড়াদায়ক কার্য্য করা উভয়ই তত্ত্বজ্ঞানের বিরোধী। প্রেম না থাকিলে কর্ম্ম করা চলে না; অতএব এই সহস্রশীর্ষা বিরাট পুরুষ জীব জগৎকে প্রেম করিতে হইলে এবং তাঁহার সেবায় নিজের দেহ, মন, প্রাণ উৎসর্গীকৃত করিতে হইবে। ব্যবহারিক ও পরিমার্থিকে গোল বাধাইও না। জগৎটাকে মায়া বলিয়া হাত পা গুটাইয়া বসিয়া থাকিও না। মায়াতে মায়াতেত মিল আছে; অতএব এই যে মায়িক জগৎ, তাহার সেবাতে তোমার মায়িক দেহ, মন, প্রাণকে লাগাইয়া দাও। তাহাতেত পরমার্থতত্ত্ব মিথ্যা হইবে না, পরন্তু এই নশ্বর দেহটা এই অনাদি বিরাটের সেবায় নিয়োজিত হইয়া ধন্য হইবে। ভেদ করিও না, জগতেও ব্রহ্মে ভেদ নাই—“একমেবা দ্বিতীয়ং”। এই সমস্ত কথা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতাতে ব্যক্ত করিয়াছেন; এই সমস্ত কথা বুঝাইবার জন্যই ভগবান শঙ্করের জন্ম। তিনি বৌদ্ধগণকে বুঝাইলেন যে পারমার্থিক তত্ত্ব এক, এবং তৎসম্বন্ধে তাঁহাদের মধ্যে কোনই মতভেদ নাই; কিন্তু ব্যবহারিক জগৎটা উপেক্ষার জিনিষ নহে, তাহা একটা মহা ব্যাপার; সেখানে কোনরূপ ফাঁকি চলে না। তাই তিনি কত স্তব স্তুতি রচনা করিলেন, কত ভাষ্য রচনা করিলেন, এবং ব্রাহ্মণ্যধর্ম্মের বিজয় নিশান তুলিয়া সমগ্র ভারতকে তাঁহার অধীনতা স্বীকার করাইলেন।

 কোন্ কর্ম্ম ভাল কোন্ কর্ম্ম মন্দ তৎসম্বন্ধে নিজের মনই সাক্ষ্য দিবে। ত্যাগের পথে চলিতে হইবে। ধন, মান, যশ, সুখ, দুঃখ, প্রাণ, ইহকাল পরকাল সমস্তই বিসর্জ্জন পূর্ব্বক লোকহিতকর কার্য্য করাই আমাদের অবশ্য কর্ত্তব্য। যেখানেই নিজের লাভের দিকে একটু টানে তাহাই পরিত্যজ্য; যেখানেই অপরের মঙ্গলের দিকে একটু টানে তাহাই কর্ত্তব্য। ভাবের ঘরে যেন কখনও চুরী করি না; প্রত্যেক কাজটা করিবার পূর্ব্বে এবং কোন কার্য্য হইতে বিরত হইবার পূর্ব্বে যেন হৃদয়টা ভালরূপে পরীক্ষা করিয়া দেখি যে এটা নিজের সুখের জন্য করিতেছি, না বিরাট পুরুষের সেবার জন্য। কোন কর্ম্ম করিলে যেন মনে অহঙ্কার আসে না, পরন্তু যেন বিরাট পুরুষের সেবাব্রত গ্রহণ পূর্ব্বক নিজের জীবনকে ধন্য মনে করি। আর যখনই দুঃখ দারিদ্র্য আমাদিগকে অভিভূত করিতে আসিতেছে দেখিব, যখনই দেখিব মৃত্যু তাহার ভীষণ বদন ব্যাদান করিয়া আমাদিগকে গ্রাস করিতে আসিতেছে তখনই যেন স্মরণ করি “অহং ব্রহ্মাস্মি”।

ওঁ তৎসৎ ওঁ