প্রধান মেনু খুলুন



চোখের বালি । \כ-2כ কিন্তু রাজলক্ষ্মী ভংগনা করিয়া বলিতেন, “মহিন ডাকিতেছে, সে বুঝি আর কানে তুলিতে নাই ? বেশি আদর পাইলে শেষকালে এমনই ঘটিয়া থাকে। যাও, তোমার আর তরকারিতে হাত দিতে হইবে না।” আবার সেই প্লেট পেনসিল-চারুপাঠ লইয়া মিথ্যা খেলা। ভালোবাসার অমূলক অভিযোগ লইয়া পরস্পরকে অপরাধী করা। উভয়ের মধ্যে কাহার প্রেমের ওজন বেশি, তাহা লইয়া বিনা যুক্তিমূলে তুমুল তর্কবিতর্ক। বর্ষার দিনকে রাত্রি করা এবং জ্যোৎস্নারাত্রিকে দিন করিয়া তোলা । শ্রান্তি এবং অবসাদকে গায়ের জোরে দূর করিয়া দেওয়া। পরস্পরকে এমনি করিয়া অভ্যাস করা যে, সঙ্গ যখন অসাড় চিত্তে আনন্দ দিতেছে না তখনো ক্ষণকালের জন্য মিলনপাশ হইতে মুক্তি ভয়াবহ মনে হয়— সম্ভোগমুখ ভস্মাচ্ছন্ন, অথচ কর্মস্তিরে যাইতেও পা ওঠে না । ভোগমুখের এই ভয়ংকর অভিশাপ যে, সুখ অধিক দিন থাকে না কিন্তু বন্ধন দুচ্ছেদ্য হইয়া উঠে । এমন সময় বিনোদিনী একদিন আসিয়া আশার গলা জড়াইয়া ধরিয়া কহিল, “ভাই, তোমার সৌভাগ্য চিরকাল অক্ষয় হোক, কিন্তু আমি দুঃখিনী বলিয়া কি আমার দিকে একবার তাকাইতে নাই ।” আত্মীয়গৃহে বাল্যকাল হইতে পরের মতো লালিত হইয়াছিল বলিয়া লোকসাধারণের নিকট আশার একপ্রকার আস্তরিক কুষ্ঠিত ভাব ছিল। ভয় হইত, পাছে কেহ প্রত্যাখ্যান করে । বিনোদিনী যখন তাহার জোড়া ভুরু ও তীক্ষ দৃষ্টি, তাহার নিখুত মুখ ও নিটোল যৌবন লইয়া উপস্থিত হইল তখন আশা অগ্রসর হইয়া তাহার পরিচয় লইতে সাহস করিল না । আশা দেখিল, শাশুড়ি রাজলক্ষ্মীর নিকট বিনোদিনীর কোনোপ্রকার সংকোচ নাই । রাজলক্ষ্মীও যেন আশাকে বিশেষ করিয়া দেখাইয়া দেখাইয়া বিনোদিনীকে বহুমান দিতেছেন, সময়ে অসময়ে আশাকে বিশেষ করিয়া শুনাইয়া শুনাইয়া বিনোদিনীর প্রশংসাবাক্যে উচ্ছসিত হইয়া উঠিতেছেন। আশা দেখিল, বিনোদিনী সর্বপ্রকার গৃহকর্মে স্বনিপুণ— প্রভুত্ব যেন তাহার পক্ষে নিতান্ত সহজ, স্বভাবসিদ্ধ —দাসদাসৗদিগকে কর্মে নিয়োগ করিতে, ভৎসনা করিতে ও আদেশ করিতে সে লেশমাত্র কুষ্ঠিত নহে। এই সমস্ত দেখিয়া আশা বিনোদিনীর কাছে নিজেকে নিতান্ত ক্ষুদ্র মনে করিল। সেই সর্বগুণশালিনী বিনোদিনী যখন অগ্রসর হইয়া আশার প্রণয় প্রার্থনা করিল তখন স'কোচের বাধায় ঠেকিয়াই বালিকার আনন্দ আরো চার গুণ উছলিয়া পড়িল । জাদুকরের মায়াতরুর মতো তাহাদের প্রণয়বীজ একদিনেই অঙ্কুরিত পল্পবিত 8 o 壘 চোখের বালি ও পুম্পিত হইয়া উঠিল । আশা কহিল, “এলো ভাই, তোমার সঙ্গে একটা-কিছু পাতাই।” বিনোদিনী হাসিয়া কহিল, “কী পাতাইবে।” আশা গঙ্গাজল বকুলফুল প্রভৃতি অনেকগুলি ভালো ভালো জিনিসের নাম করিল। বিনোদিনী কহিল, “ও-সব পুরানো হইয়া গেছে ; আদরের নামের আর আদর নাই ।” আশা কহিল, “তোমার কোনটা পছন্দ ।” বিনোদিনী হাসিয়া কহিল, “চোখের বালি ।” শ্রুতিমধুর নামের দিকেই আশার ঝোক ছিল, কিন্তু বিনোদিনীর পরামর্শে আদরের গালিটিই গ্রহণ করিল। বিনোদিনীর গলা ধরিয়া বলিল, “চোখের বালি।” বলিয়া হাসিয়া লুটাইয়া পড়িল । > > আশার পক্ষে সঙ্গিনীর বড়ো দরকার হইয়াছিল। ভালোবাসার উৎসবও কেবলমাত্র দুটি লোকের দ্বারা সম্পন্ন হয় না— মুখালাপের মিষ্টান্ন বিতরণের জন্য বাজে লোকের দরকার হয় । ক্ষুধিতহৃদয়া বিনোদিনীও নববধূর নবপ্রেমের ইতিহাস মাতালের জালাময় মদের মতো কান পাতিয়া পান করিতে লাগিল । তাহার মস্তিষ্ক মাতিয়া শরীরের রক্ত জলিয়া উঠিল । নিস্তব্ধ মধ্যাহ্নে মা যখন ঘুমাইতেছেন, দাসদাসীরা এক তলার বিশ্রামশালায় অদৃশু, মহেন্দ্র বিহারীর তাড়নায় ক্ষণকালের জন্য কলেজে গেছে এবং রৌদ্রতপ্ত নীলিমার শেষ প্রান্ত হইতে চিলের তীব্র কণ্ঠ অতিক্ষীণ স্বরে কদাচিৎ শুনা যাইতেছে, তখন নির্জন শয়নগৃহে নীচের বিছানার বালিশের উপর আশা তাহার খোলা চুল ছড়াইয়া শুইত এবং বিনোদিনী বুকের নীচে বালিশ টানিয়া উপুড় হইয়া শুইয়া গুন-গুন-গুঞ্জরিত কাহিনীর মধ্যে আবিষ্ট হইয়া রহিত, তার কর্ণমূল আরক্ত হইয়া উঠিত, নিশ্বাস বেগে প্রবাহিত হইতে থাকিত । বিনোদিনী প্রশ্ন করিয়া করিয়া তুচ্ছতম কথাটি পর্যন্ত বাহির করিত, এক কথা বারবার করিয়া শুনিত, ঘটনা নিঃশেষ হইয়া গেলে কল্পনার অবতারণা করিত— কহিত, “আচ্ছ ভাই, যদি এমন হইত তে কী হইত, যদি আমন হইত তো কী